Saturday, July 01, 2006

Boro rastar upor ekta truck by mahbub morshed

বড় রাস্তার উপরে একটা ট্রাক

আলো-অাঁধারি সম্পূর্ণটা কাটে নাই৷ সুরুচির ছেঁকে ফেলা চা-পাতি, ডেনিশ কনডেন্সড মিল্কের ছয়সাতটা এক সাইড খোলা কৌটা, কাপের ভাঙ্গা ডানা, গ্লাসের টুকরা, কাপ পিরিচ ধোয়া ময়লা পানি আর পরাটা ভাজার ছনাত্‍ আওয়াজের তিন হাত উপরে কেবল সূর্যের খানিক লালচে আভা৷ উল্টা দিকে মতলব বোডিং৷ মাঝে শিউলি ফুলের মতো বড় রাস্তা৷ বোডিং-এর সামনে তিনটা টাটা, একটা বেডফোড, দুইটা আশোক লেল্যান্ড৷ ড্রাইভার-হেলপার কে কোথায় শুয়েছে, সুরুচি (হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্ট) থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় না৷ প্রতিদিনের মতো ট্রাকের আড়ালে ঢাকা পড়েছে মতলব বোর্ডিং-এর বেঞ্চটি৷ রাতভর ড্রাইভর, হেলপারদেরকে টানাটানি করে এখন বোর্ডিং-বয় দু'জনের চোখে ঘুম৷ বেঞ্চে বসে ঢুলতে ঢুলতে সেখানেই কোনোরকমে কাত হয়েছে ওরা৷ ওদের বেড়ালের মতো চার ব্যাটারি টর্চ দু'টি মাটিতে দাঁড়িয়ে অদূরে হাঁটু ভেঙে বসে থাকা সোলেমানের দিকে তাকিয়ে আছে জুলজুল করে৷ রাস্তা পেরিয়ে সুরুচি থেকে দেখলেও বোঝা যায়, ঝিমাচ্ছে না বরং একটু রেস্ট নেয়ার জন্য এই বসা৷ সম্ভবত মশা অথবা খারাপ স্বপ্নে পৌনে এক ঘন্টা আগে তার ঘুম ভেঙে গেছে৷ তখন থেকে বেডফোর্ডের বডি ধোয়া এবং ওয়াটার ট্যাংক ভরাবার জন্য যতোবার সুরুচি টু বেডফোর্ড সে আপ-ডাউন করেছে ততোবারে বাবুর্চিদের কাছে তার একটা পরিচিতি তৈরি হয়ে যাবার কথা৷ শেষবার সে ছাই আনতে চুলার কাছেও গিয়েছে৷ আঙুলের মাথায় ছাই নিয়ে দাঁতে ঘষা দিয়েছে তিনবার৷ হাগা-মুতা সেরেছে মহাস্থান টিম্বার মার্টের পিছনে ঝোঁপ ঝোপ জায়গায়৷ অতদূর থেকেও বোঝা যায় এক্ষুনি আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াবে সে৷ একটা হাইও তুলতে পারে৷ সত্যই যখন সে উঠে দাঁড়াল তখন বোঝা যায় ভেতরে কোথায় যেন কুয়াশার মতো তাড়া৷ বোর্ডিং-এর ছাদ থেকে দেখলে বেডফোর্ডের বডিতে ত্রিপল বিছিয়ে এবং মশারি টাঙিয়ে শুয়ে থাকা সোলেমানের ওস্তাদকে দেখা যায়৷ তার শুয়ে থাকার মাঝেও এক ধরনের তাড়া আছে৷ গত রাতে তিনটার দিকে এখানে পৌঁছে বাকি সময়টুকুর জন্য বোডিং-এ ওঠে নাই তারা৷ তড়িত্‍ ব্যবস্থা করে দু'জনে ট্রাকেই শুয়ে পড়েছে৷ এখন সোলেমান যেভাবে কেবিনের পা-দানিতে পা ঠেকিয়ে বডিতে উঠে পড়েছে তাতে যে কেউ বুঝতে পারবে, সে এখন তার ওস্তাদকে ঘুম থেকে জাগাবে৷ এহ হে... রে...এ আইজ যে ওস্তাদক ঢুলানিতে শুতি থাকা বাচ্চা ছাওয়ার মতন নাগে৷ দ্যাখো কেনে কী পরিমাণ সাইড দিয়া শুতছে৷ চলতি রোডত ফির উল্টা খাসলত ওমার৷ যতয় বাপের বেটা হন সাইড নেই৷ ওস্তাদ দয়া করলে না একনা সাইড পাইমেন৷ পারে না কি হে সোলেমান, ওমাক কাটাবার পারে নাকি কেউ? আছে নাকি কেউ? তাও আছে বটে একজনা৷ চোরের ওপর বাটপার আছে, নাকি বাহে৷ সেই ব্যক্তি হইল তোমার এই সোলে- সোলেমান৷ সেই দিনের কথা চিন্তা কর- যে দিন নিজের বেডফোর্ডখান নিয়া সে ওস্তাদের পিছনত নাগছে৷ পাগলা কুত্তার মতোন হর্নে হাত চাপি খালি গিয়ার মারতেছে৷ একবার ব্যাক সাইড মিররে ওস্তাদ তাক দেখেও বোঝায়৷ যায় নাকি ওস্তাদ, সোলেমানক চিনা যায় আইজ৷ উল্টা দিক থাকি এইসমে একটা বাস আসতেছে, ধরো৷ 'চুতমারানি' বলে একনা সাইড দিয়া সোলেমান ফির গিয়ার মারছে৷ ৬৯ গজটাক দূরে মানুষের কনুইয়ের মতোন রাস্তার এখান খাড়া ভাঁজ৷ হর্নে কিন্তু সোলেমানের হাত চাপি ধরায় আছে৷ আর ওস্তাদ এইসমে স্টিয়ারিং ঘুরায় না৷ স্টিয়ারিং ঘুরায় না কেন হে মানুষটা৷ হুটহাট গিয়ার কমায় সে৷ আর ওস্তাদ? সোত যেংকা পাথরত ধাক্কা খায় সেংকা করি একটা গগন শিরীষের গাছত ধাক্কা খায়া চুপ মারে ওস্তাদের ট্রাক৷ স্টার্ট বন্ধ করি ওস্তাদ, ওস্তাদ ডাকতে ডাকতে তার দিকে ছুটে যায় সোলে৷ ওস্তাদ- ও ওস্তাদ! উঁ বলে একটু পাশ ফেরে ওস্তাদ৷ সেভাবে দশ সেকেন্ড থেকে বালিশের নিচে হাত চালায় ঘড়ির খোঁজে৷ বাম হাতের পিঠ দিয়ে চোখ ঘষে পাতা একটু খুলে সময় দেখে৷ টর টর করি দেখিস কী৷ এত বেলা হয়া গেল ডাকাইস নাই৷ নাকত তেল দিয়া নিন আলছিলু নাকি৷ খেকিয়ে ওঠে৷ তারপর ট্রাক থেকে নেমে যায়৷ বোর্ডিং-বয় দু'জনের ঘুম ভেঙে গেছে ততোক্ষণে৷ অযথাই ঘনঘন চোখে-নাকে বার বার আঙুল চালায় তারা৷ ওদের গা টাটানো হাসি দেখলে বোঝা যায় ওরা সোলেমানের এই অপদস্থ হওয়া গলা বাড়িয়ে খানিক দেখেছে৷ ওদের দিকে তাকিয়ে পরক্ষণে ওস্তাদের মশারি চাদর গুটিয়ে সাইড ব্যাগে পুরে দেয় সে৷ তারপর কেবিনে ছুঁড়ে দেয় ব্যাগটা৷ মিনমিনে শয়তান ছেলে দু'টা তখনো হাসছে৷ বেডিংওত না থাকলে ওমার হোল জ্বলবেয়৷ থাকে বা কায়, পাঁচ টাকার বোডিংওত বিশ টাকা নাইট৷ টাকা কি রাস্তার ধুলা নাকি হে? ট্রাকের চোদনে উড়ি বেড়ায়৷ রাইতে বোর্ডিংওত থাক ত খুব ভাল৷ ওস্তাদ ওস্তাদ করবে৷ ট্রাক দেখবে৷ চাইলে নিজের বইনটাকও আনি দেয়৷ না ওঠো ত ওস্তাদ বাঁয়ে রাখেন- ওস্তাদ পিছনে রাখেন৷ আরো ট্রাক দাঁড়াইবে৷ চুতমারানি! ট্রাকতো তোমার শেরাটন হোটলে থাকবার জন্যে কাতারে কাতারে দাঁড়াইবেয়৷ ছেলে দুইটার দিকে তাকিয়ে হৈ দেয় সোলেমান৷ কিন্তু ওরা এবার তাকে পাত্তা না দিয়ে বোর্ডিং ঘরের দিকে এগিয়ে যায়৷ সুরুচির দিক থেকে হেঁটে আসা ওস্তাদের নাদুস-নুদুস পা ফেলা, শব্দ করে নুতু ফেলা এবং কেবিনে উঠে আগরবাতি জ্বালানো দেখে সোলেমান কেন গাড়ির চাকারাও বুঝতে পারে রাস্তার উপর আর একটা দিন শুরু হতে যাচ্ছে এখন৷ লা-ইলাহা ইল্লা আস্তা সুবহানাকা ইনি্নকুনতু মিনায যোয়ালেমিন বলে ওস্তাদ যখন চাবি ঘুরিয়ে পিকাপ চেপে ধরে তখন ঘুমন্ত নেড়ি কুত্তার মতো কাঁই কাঁই শব্দ করে বিরক্তি প্রকাশ করে ইঞ্জিন৷ পরক্ষণেই লাত্থি খেয়ে এক ধাক্কায় রাস্তায় সওয়ার হয়৷ ফটাফট মহাস্থান, পুণ্ড্রবর্ধন পেরিয়ে রংপুর রোডের উপর দিয়ে রংপুরের বিপরীত দিকে ছুটে যায়৷ এখন বোর্ডিং-এর ছেলে দু'টা যদি রাস্তায় গলা বাড়িয়ে ট্রাকটাকে এক নজর দেখতে চায় ত আরেকটা দ্রতগামী ট্রাকে উঠে পড়া ছাড়া অন্য উপায় নেই৷ মাশাল্লা রাস্তা এলাও ফাঁকা৷ কোনো বাস কার নাই৷ তামরা সবায় টার্মিনালের কোলাত বসি দুধু খাইতেছে৷ রাস্তাত খালি দুই তিনটা রিকশা৷ হইলে কী, এমার জন্যে সোলেমানক ধুপধাপ করা লাগে বেশি৷ এ পাকে ফির ওস্তাদক দ্যাখো৷ স্টিয়ারিং দ্যাখো৷ স্পিডোমিটার, ফুয়েলমিটার হাবিজাবি যন্ত্রপাতির কাঁপন দ্যাখো, মনে কয় একশ তুলছে৷ এখন কেবিনে বসে সোলেমানের জায়গা থেকে দেখলে সামনের সাইকেল অলার প্রতি তার বিরক্তিটা স্পষ্ট বোঝা যায়৷ সাইকেল অলা সোলেমানের হৈ হৈ আর ধুপধাপ আওয়াজে রা করে না বরং রাস্তার বাঁয়ে যথেষ্ট জায়গা রেখে এগিয়ে যেতে থাকে৷ রাস্তা ঘেঁষা মানুষ বলেই এমন বিরক্ত করে এরা৷ চুতমারানি বলে এই নবাবজাদাকে ওভারটেক করে বিড়ি চায় ওস্তাদ৷ বিড়ি ধরানোর সময় ওস্তাদ যদি বায়ে তাকিয়ে একবার নজর করতো, বুঝতে পারতো তারও নেশা পেয়েছে৷ কিন্তু ওস্তাদের সামনে বিড়িতে অতিরক্তি একটা টানও দেয় না সোলে বরং ধরানোর জন্য যতোটুকু দরকার ততোটুকু টান দিয়ে ১১৪৩ এলফোর নাম্বারের হারাগাছে প্রস্তুত বিড়িটি ওস্তাদের দিকে এগিয়ে দেয়৷ এরপর কেবিনের দরজা খুলে বাহির থেকেই বন্ধ করে বডিতে উঠে পড়ে সে৷ খুব দ্রুত বিড়ি ধরায়৷ দ্রুততা সত্ত্বেও পিছনের ট্রাকে কলার উপর বসে থাকা লোক দু'জন তার নেশার তীব্রতা বুঝতে পারে না৷ মাথা ঘুরিয়ে সোলেমান বোঝে তীব্র বাতাসের তোড়ে এখনো এরা চোখ খোলা রাখতে শেখেনি৷ এ সময় ওস্তাদ একটা গিয়ার মারে আর সোলেমান কেবিন চাপড়ে তাকে উত্‍সাহিত করে করে বহুদূর এসে পড়ে৷ সে যদি এখন আবার কাঁচা কলা ট্রাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ওই ট্রাকের হেলপারদেরকে উপহাস করতে চায় তো ওই ট্রাককে অর্ধেক কলা নামিয়ে পাঁচ টন মাত্র কলা নিয়েই একশ কি. মি. /ঘন্টা বেগে ছুটে আসতে হয়৷ আর কাঁচা কলার ট্রাকের দিকে সে যদি মিনিটখানেক দেখে থাকে তাহলে বেডফোর্ডের পিছনের প্রাইভেট কারটাকে মোট দুই মিনিট হর্ন দিতে দিতে ওভারটেক করার সুযোগ খুঁজতে হয়৷ কিন্তু আর দেরি না করে ওস্তাদ প্রাইভেট বলে, কেবিনের উপরে একটা চাপড় মারে সে৷ এখন যদি কেউ পাশ কাটিয়ে যাওয়া প্রাইভেট কারটিতে না বসে বিপরীত দিক থেকে আসা ড্রাইভারের সিট হতে ওস্তাদের মুখ দেখতো তবে সহজে বুঝতে পারতো তার মুখে বিরক্ত একটা ভাব ফুটে উঠেছে৷ কিন্তু সোলেমানের মুখে এই সময় একধরনের প্রশান্তি খেলা করে৷ কারণ ট্রাকে এই একটা মাত্র বিষয়ে ওস্তাদ তার কথা ফেলতে পারে না৷ বিরক্তিটা কাটানোর জন্যই সম্ভবত খাপেখাপে মিলিয়ে তিনটা ট্রাক আর একটা বাসকে ওভারটেক করিল আইজ৷ এংকা করি আগতও গেইচে মাইলকে মাইল৷ কাইল হাত ছলকি গেল কেন তামার৷ সোলেমানের চউখ তখন তিরতির করি কাঁপতেছে, বুকের মধ্যে ধড়াস-ধড়াস৷ সোলে ওস্তাদের স্টিয়ারিং-এর পাকে দেখি আছে৷ তাজ্জব কথা, ওমার হাত একনা কাঁপিল না পর্যন্ত৷ খালি একবার কইলে, মানুষটা বোঝায় মরিল রে, সোলে৷ মরবারনেয় তা বাঁচপে নাকি হে? ডাইনের চাকাটা মাথার উপর দিয়া আসিল, আর মানুষটা বাঁচি থাকপে? বুকের ধড়াস-ধড়াস কমবার পর সোলেমান সামনত দ্যাখে দশমাইল মোড়৷ একটানে কেমন করি আইল কায় জানে৷ একটা বাঁশের গাড়িকে আড়াআড়ি রাস্তা পার হতে দেখে মুখ খিস্তি করে সোলে৷ যদি কেউ সোলেমানের ভাবনার সাথে মিলেমিশে দেখতে চায় তো এই দু'তিন মিনিটে ক্ষতি কিছুই হয় না তেমন, সেটি বুঝতে পারে৷ কিন্তু এমন পরিস্থিতে খিস্তি করাই তার জন্য সংগত, নইলে কেবিন থেকে ওস্তাদের বাড়ানো গলা দেখা যাবে- 'নিন আলু নাকি সোলেমান, আরে হে সোলে৷' নির্ঘাত বলে বসবে তত্‍ক্ষণাত্‍৷ এবার খিস্তি করার পরও ওস্তাদের বাড়ান গলা দেখা যায়- 'সিংড়ার হাট আইজ; দেখি যাইস৷' যারা নাটোর রোডের নিয়মিত যাত্রী নয় একথার সহজ অর্থটি তারা বুঝবে না৷ প্রতিটি ফাঁকা ট্রাকের ড্রাইভার এখানে যেমন এপাশ ওপাশ দেখে তেমনি ধানের ব্যাপারিরাও ট্রাকের খোঁজে উঁকি-ঝুকি মারতে থাকে সিংড়ার হাটের দিন৷ এমনও হয়, কখনো সিংড়া পৌঁছানোর আগেই ব্যাপারিরা রাস্তায় বিক্রেতাকে ধরে কেনাবেচা সেরে নেয়৷ তারপর ট্রাকে চালান করে দেয় নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা কী বগুড়াতেই৷ গত সন্ধ্যায় গোডাউন থেকে বেরিয়ে আজ সূর্য আকাশের কাঁখে উঠে বসেছে, এ পর্যন্ত কোন ট্রিপ মারা হয়নি তাদের৷ সোলেমানের ওস্তাদের পকেট গুনে আরো সহজে বলে দেয়া চলে এটা৷ নান্দীগ্রাম না আসতেই ব্যাপারিদের হাত উঠতে শুরু করে ট্রাক দেখে৷ পছন্দ মতো একজনের কাছে ট্রাক থামালে বডি থেকে নেমে দরদাম করতে যায় সোলে৷ পঞ্চাশ বস্তা ধান, নাটোর পর্যন্ত নয়শ টাকা ঠিক হলে ওস্তাদও নেমে পড়ে৷ কেবিন লক করে ব্যাপারিদেরকে ধান ওঠাতে বলে সোলে৷ তারপর হাত-মুখ ধুয়ে হোটেলের দিকে যেতে থাকা ওস্তাদের পিছু নেয়৷ এখন বেলা যথেষ্ট টানটান হলেও হোটেল থেকে যে কেউ বুঝতে পারে এদেরকে পরাটার সাথে ডিমের মামলেটও দিতে হবে৷ হোটেলের বয়রা ডিম এবং প্লেটের উপর পেপার, পেপারের উপর পরাটা সাজিয়ে আনলে তাদের দু'জনের খাওয়া শুরু হয়৷ এই নাস্তাটা কিন্তু এইখানে হবার কথা নোয়ায় বাহে৷ রংপুর পযন্ত একশ বস্তা আলুর একটা টিপ আছিল বীরগঞ্জ থাকি৷ কিন্তু সন্ধ্যা উত্‍রি যায়া বীরগঞ্চতে হইল একসিডেন৷ উয়ার পর যে গু-হাগা টান দিছে ওস্তাদ- ভাইও, পাবলিক খেপলে জান বাঁচে না৷ তা না হইলে রংপুর ট্রাক স্ট্যান্ডের পানাহার হোটেল এন রেস্টুরেন্টে রাইতে দেড়প্লেট বিরানি হইতে পারতো৷ কেরু এক বোতল আর সুগন্ধায় নধর (২৬) মালের সাথে সারারাইত চোদাচুদিও হইতে পারতো৷ কলেজ ইস্টুডেন৷ হোলনাইট তিনশ টাকা মাত্র৷ দেখো কোনঠাকার নাস্তা কোনটে হইল৷ রাস্তা খেদাইতে গেল সারা রাইতটা৷ নাস্তা শেষ হলে পান মুখে দিয়ে বিড়ি ধরায় ওস্তাদ৷ আরো আয়েশ করে বেঞ্চের উপর পা তুলে বসে৷ সোলেমান বেরিয়ে ট্রাকের দিকে যায়৷ এসব ক্ষেত্রে খাওয়া-দাওয়ার বিলটা ওস্তাদের পকেট থেকে যায়৷ আর সোলেমানকে যারা ঘনিষ্ঠভাবে চেনে তারা বলতে পারবে মাল ট্রিপ থেকে যে টাকা আসে সেদিকে কখনোই লোভ করে না সে৷ সিংড়ার হাটবারে নাটোর রোড পেরুনো সহজ কথা নয়৷ গরু মহিষের গাড়ি আর মানুষের ভিড়ে রাস্তা জমাট থাকে৷ খানিক ফাঁকা রাস্তা দেখে ওস্তাদ যদি একবার গিয়ার বাড়ায় তো সাতবার কমাতে হয়৷ কিন্তু না মানুষ না ট্রাক কেউ কারো প্রতি বিরক্ত নয়৷ এই হাটের জন্যই রাস্তা, রাস্তার জন্যই হাট৷ ধীরে সুস্থে হাট পেরুলেই শিশু, মেহগনি, কড়াইয়ের নিচে ছায়া ছায়া পথ৷ একটানে নাটোর পৌঁছানো যায় অনায়াসে৷ দুই চারবার হয়তো কেবিনের ওপরে চাপড় মারতে হয় নইলে সারা রাস্তায় চুল গামছা উড়িয়ে সোলেমানকে বিড়ি টানতে দেখা যায়৷ ট্রাকের বিপরীত দিকে ছুটে যাওয়া ধোঁয়া বডিতে বসা নাটোরের কুলি কামলারা স্পষ্ট দেখে৷ তাদের নেশা হলেও তারা বিড়ি খেতে পারে না৷ তারা হয়তো সোলেমানকে সমীহ করে না৷ কিন্তু ট্রাকের দুলুনির টাল সামলাতে দু'হাতই ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে তাদের বিড়ি খাওয়া হয় না৷ সেলেমান ওদের অবস্থা দেখে হাসে৷ রাস্তার পাশে পাশে শংকিত পায়ে চলা মেয়েদের দেখে হৈ দেয় মাঝে দু'একবার৷ এই ফাঁকে একটা বরুণ টিপে কী মাথা চুলকাতে চুলকাতে চোখে ধরা একটা স্কুলের মেয়েকে পিছন ফিরে অনেকদূর পর্যন্ত দেখে নেয়৷ হাত-পাও ছাড়ি দিয়া সোলেমানের মতোন খাড়া হন না কেন! ভয় নাই- এই দ্যাখো৷ ঈগলের মতন আকশত উঠি পাখা ছাড়ি দিয়া থামি থাক৷ এংকা করি একে জোকার পিরান একে রংগের ওড়না, কামিজ পিন্দা মাইয়া মানুষ, ইস্কুলের ইস্টুডেন দ্যাখেন না কেন! কারো দুধ দ্যাখো ডাব-ডাব, কেবল পাতলা একটা শাস পড়ছে কি পড়ে নাই৷ কারো ফির দ্যাখো বুক ফোটেয় নাই, বরাই বরাই৷ দ্যাখতে তো গোনা নাই! আছে নাকি? সোলেমানের ত বাড়িত পোষা বউও নাই৷ বউ যে আইজ হউক কাইল হউক হবাননেয় তাও নোয়ায়- স্টিয়ারিং হাতত আসলে তার পাছত ডাব-ডাব দুধঅলা শাবনূরের মতন একটা বউড় সোলেরও হইবে৷ নাকি পপির মতন, হে সোলেমান? ট্রাকের সামনে একটা ভ্যান লটপট করছে৷ গতি দেখলে বোঝা যায় বড় ছ্যাচড়া ড্রাইভার৷ চালাতে পারুক না পারুক সহজে সাইড দিতে চায় না৷ ওস্তাদ ডানে গেলে সেও ডানে যায়৷ বামে গেলে বামে৷ যারা ওস্তাদের সাথে লংরুটে একদিনও চলাফেরা করেনি তারা বুঝতে পারবে না ওস্তাদের রোখ চেপে গেছে৷ হর্নে হাত চেপে ধরেছে সে৷ হঠাত্‍ যখন সে লক্ষ করল সোলেমান এখনো নিরুত্তাপ তখন খেকিয়ে ওঠে; কেবিনের জানালা দিয়ে খনিক গলা বাড়িয়ে 'নিন আলু নাকি রে হারামজাদা?' বলে৷ চকিতে সচেতন হয়ে সোলেমান কেবিনে চাপড় মারতে থাকে আর ভ্যানের প্রায় গা ঘেষে ওভারটেক করে৷ না নিন আইসে নাই সোলে৷ তাইলে ভ্যান খেদাইল কেমন করি৷ নিন আইসে নাই- শাবনূরের রূপে ভুলা নাগছিল৷ সোলেমানেরও তো বউ নাগে নাকি ওস্তাদ! ডাব-ডাব৷ স্পিডোমিটার, ফুয়েলমিটার হাবিজাবি সুদ্ধায় চকচকা হওয়া নাগে৷ নাগে কি নাগে না? নাটোরে ধান আনলোড করা হলে সরাসরি ট্রাকস্ট্যান্ডের উদ্দেশে স্টিয়ারিং ঘুরে যায়৷ ড্রাইভার হেলপাররা আজ পর্যন্ত ট্রাকস্ট্যান্ডের মতো অন্য কোথাও এত নিরাপদ বোধ করেনি৷ ওস্তাদেরও রেস্ট নেবার ইচ্ছা আছে, ট্রিপে পাওয়া কাঁচা টাকা খরচের বাতিকও আছে৷ নাটোর স্ট্যান্ডে পৌনে এক ঘন্টা কেটে যাবার পর শ্রমিক সমিতির অফিসে যে লোকটি পেপার পড়ছে সে একটু চোখ তুললে ঝিম মেরে বসে থাকা ওস্তাদকে দেখতে পায়৷ আর নাক উঁচু না করেই যদি তার প্রশ্বাসকে সচেতন করে তবে বাংলামদে মেশানো স্পিরিটের গন্ধও অনায়াসে পেতে পারে৷... গলা বাড়িয়ে বেডফোর্ডের পিছনের চাকার দিকে তাকালে চাকার গায়ে হেলান দিয়ে থাকা প্রায় ঘুমন্ত সোলেমানকেও দেখবে৷ অবশ্য বাতাসের কারণে তার মুখ থেকে আসা স্পিরিটের গন্ধ পাওয়া সহজ হবে না৷ বেডফোর্ডটি তার থেকে আড়াআড়ি রয়েছে বলে পেপার পড়া লোকটি বুঝতে পারে না দৈনিক করোতোয়ায় বীরগঞ্জ সংবাদদাতা যে ট্রাকের নাম্বারটি এ পেপারে পাঠিয়েছে সেটি এদেরই৷ গতরাতে অ্যাকসিডেন্ট করার পর কেউ এমন নিশ্চিন্তে ঝিম মেরে থাকলে সন্দেহ না হওয়াই সংগত৷ কিন্তু স্ট্যান্ডে দু'জন না হোক অন্তত একজন নাম্বারটি লক্ষ করে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই তার গুতো খায় সোলেমান৷ পাবলিক গাড়ির নাম্বার সাংবাদিককে জানিয়েছে৷ সোলেমান নিরুপায়, কিছুই ভেবে পায় না৷ সে এখন করবে কী? ওস্তাদকে জানানো ছাড়া কোনো বুদ্ধি খেলে না তার মাথায়৷ 'পোড়া মবিল দিয়া নাম্বার প্লেটত একটা ঘষা দে৷' প্রায় অন্যমনস্কভাবে সব শুনতে শুনতে কথার মাঝে বলে বসে ওস্তাদ৷ ট্রাকটা হইল সোলেমানের ভাই৷ নাকি ভাইজান? তামারও তিয়াস নাগে৷ সেই জন্যেয় ওয়াটার ট্যাংকিত সকল-সন্ধ্যা দুপুর-বিকাল চপুরাইতে পানি ঢালে সোলে৷ আইজ তিয়াস বেশি নাকি হে ভাইজান? তাইলে একনা বাংলা দেই৷ বাংলার খালি বোতলটা ওয়াটার ট্যাংকের মুখে ধরে সে৷ দু'এক ফোঁটা তরল সেখানে পড়ে কি পড়ে না৷ কিন্তু বোতলটি বাষ্পে ভরে যায়৷ কেবিনের দরজা খোলার আওয়াজ হলে উপরে তাকায়৷ ওস্তাদ উঠে বসেছে৷ কভার নামিয়ে শব্দ করে সেঁটে দেয়৷ তারপর কবিরাজের হাতের সম্মোহিত পারদের মতন কেবিনে উঠে বসে৷ অভ্যাসবশত কেবিনের জানালা গলে বাম হাত বের করে ধুপ ধাপ চাপড়াতে থাকে চলন্ত ট্রাকের কেবিনে৷ পাকশি ব্রিজের নিচে ট্রাক-বাসের জ্যামে না পড়া পর্যন্ত একটানা ট্রাক ছোটায় তারা৷ মাঝে শুধু সোলেমান যখন লঞ্চের টোল দিতে নামে তখন খানিক সময় ব্রেক করেছিল ওস্তাদ৷ সোলেমান এই ফাঁকে যাত্রীবাহী বাসের হেলপারদের সাথে আড্ডা জুড়ে দেয়৷ লঞ্চের দোতলায় উঠলে হয়তো দেখা যেত পাঁচ টাকা বাজি ধরে তিন তাসের খেলায় দুইবার হেরে এক ফাঁকে লাজুক মতো একটা হাসিও হয়তো দিয়েছে সোলে৷ লঞ্চ ভেড়ামারার দিকে ভিড়বে এই সময়ের কিছু আগে একটা মহিলা আসে সোলেমানের কাছে৷ ওস্তাদ জেগে ওঠা পর্যন্ত এই মহিলাটির আবেদন নিবেদন মন দিয়ে শোনে সে৷ ওস্তাদ উঠলে তাকে দেখিয়ে দিয়ে বলে 'কি কবার ওমাক কন৷' মহিলা ওস্তাদের কাছে গিয়ে তার আবেদন নিবেদনের পুনরাবৃত্তি করলে ওস্তাদ খানিক ঠারেঠারে বলে, 'বেটিছাওয়াটার তখনে তোর যে দরদ উছলি পড়ে হে এ সোলেমান৷' মহিলা কুষ্টিয়া পর্যন্ত যাবে না৷ শহরের আগে মঙ্গলবাড়িয়া বাজারের পোয়া মাইলটাক আগে নামিয়ে দিলেই চলবে৷ বিনিময়ে সে কিছু দিতে পারবে না৷ দিতে যদি পারতোই তো ভেড়ামারা থেকে বাসে উঠত৷ তার এতো অনুনয় বিনয় এজন্যই৷ দুধঝোলা সাতভাতারি রাস্তাখাকি মাগিগুলার কথা ত সোলেমান আর ওস্তাদের থাকি কম জানে না৷ এনা ভাল করি বুকের পাকে দেখমেন কি ঘামের গন্ধতে থাকায় যায় না৷ কালা কালটি একেবারে৷ নাক-মুখ ছয় সাত দিন ধুইছে কি ধোয় নাই৷ তবু মহিলাকে কেবিনের ভেতর নেয়া হলো৷ এবার অন্তত কুষ্টিয়া পর্যন্ত সোলেমানকে চালাতে হবে৷ ওস্তাদের যে এখনো ঘুমের রেশ না কাটা ভাব৷ ওস্তাদের গা ছুঁয়ে ছালাম করে স্টিয়ারিং ধরে সোলেমান৷ পিকাপ চেপে ধরে ধীরে ধীরে গিয়ার মারে৷ একটি বাসের পিছনে পিছনে পদ্মারঘাট থেকে উঁচু বড় রাস্তায় উঠে পড়ে৷ পরপর তিনটি গিয়ার বদলে যুতমতো সামনে তাকায়৷ ওস্তাদ যদি তার দিকে সেই থেকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতো, বাইরে না তাকিয়ে, তবে বুঝতো এই ফাঁকে দু'বার তার এবং মহিলার দিকে তাকিয়েছে সে৷ মহিলা সম্ভবত সমীহবশত ওস্তাদের দিক থেকে সোলেমানের দিকে বেশি চেপেছে৷ এভাবে থাকলে সেকেন্ড গিয়ার বদলাবার ফাঁকে সে তার উরু ছুঁয়ে দিতে পারে৷ তা না করে 'একনা ওপাকে সারি যান৷' বলে সোলেমান৷ পৌনে এক ঘন্টা পরে মঙ্গলবাড়িয়া পৌঁছে বাজারের কিছু আগে ব্রেক করে৷ মহিলা নেমে গেলে কেবিন থেকে না নেমে স্টিয়ারিং-এর দিকে এগিয়ে যায় ওস্তাদ৷ কেবিন ঘুরে তার আগের জায়গায় ঘিরে আসে সোলে৷ মজমপুর বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে জিলা স্কুলের পশ্চিমে গাড়ি থামায় ওস্তাদ৷ ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া সড়কের একপাশে ডান চাকা উঁচুতে রেখে পার্ক করে৷ তারপর শ্রমিক সমিতির অফিস৷ ওস্তাদ যদি আধ ঘন্টা আগে এভাবেই (যেন কেউ নাই রুমে, এমন ভঙ্গিতে) প্রবেশ করতো তবে সহজেই বুঝতে পারতো সামনের চেয়ারে বসা সভাপতি তার অপেক্ষাতেই আছে৷ তার ট্রাকের মালিক খবরের কাগজ পড়ে হন্যে হয়ে টেলিফোন করে বেড়াচ্ছে সবখানে৷ রংপুর নাটোর করার পর আধ ঘন্টাখানেক আগে এখানে টেলিফোন করেছে৷ কুষ্টিয়ার পুলিশ সম্ভবত এখনো জানে না৷ জানেও হয়তো-বা কারণ ট্রাফিক পোলগুলোতে এতক্ষণে খবর হয়ে যাওয়ার কথা৷ 'নাটোরিই যকুন বুঝতি পারলেন অবস্থা এরাম তা সেজাগাই মিটা আলেন না ক্যা?' সভাপতি ভত্‍র্সনা করল সোলেমানের ওস্তাদকে৷ 'বে-জাগায় পুঅিশির হাত উটলি বুজতেন৷ ওমনি, সোলেমান, যা-দেকিনি টিরাকডারে আমার গোডাউনি রাকে আয়৷' একথা শোনার পরপরই সোলেমান যদি চাবি নিয়ে না বেরুতো, তবে শুনতো তাদের জন্য বিকল্প হিসেবে খুলনা পর্যন্ত আরেকটি মালের ট্রাকের ব্যবস্থা আছে৷ মালিকের সাথে বোঝাপড়া হয়ে এ ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে৷ বিপদ মুক্তির জন্য ট্রাকটিকে গোডাউনের ঘেরা চত্বরে রেখে এসে সোলেমান দেখে ওস্তাদের গোসল হয়ে গেছে৷ চুল ভেজা ভেজা৷ এখন শুধু তার গোসলটা হলে একত্রে মজমপুর হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্টে যেতে পারে তারা৷ খাওয়ার জন্য৷ খাবার সময় ওস্তাদের দিকে একবার তাকালে সহজে বোঝা যায় তার মন খচখচ করছে এখন৷ 'বীরগঞ্জের বিপদ যে কুষ্টিয়াতে আসি পিটটিবার ধরিল রে সোলে৷' সোলেমান সম্মতি সূচক 'হ' বলে আবার খাবারের দিকে বেশি বেশি নজর দিতে থাকে৷ যথাসময়ে কে একজন পিলার ভরা সাতটনী একটা টাটা এনে সমিতির অফিসের কাছে রেখে গেছে৷ এটাই এখন তাদের নতুন গাড়ি৷ সোলেমান ওস্তাদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে ওস্তাদ কিছুতে সহজ হতে পারছে না এখন পর্যন্ত৷ তাকে উত্‍সাহ দিতে আগ বাড়িয়ে তেল, মবিল, পানি দেখে সোলেমান৷ তার মনে হয়- এটা তার সত্‍ভাই৷ বেডফোর্ডের সাথে এর তুলনা চলে না৷ কোথায় ঘরের বউ আর কোথায় পরের ছউ৷ সোলেমান ও তার ওস্তাদ যখন টাটার কেবিনে উঠে বসেছে এবং ক্রমাগত ট্রাকটি বড় রাস্তার উপরে উঠে আসছে তখন কেউ যদি পশ্চিমাকাশে মাগরিবের ওয়াক্ত খুঁজত, তবে বুঝতো, প্রায় বিশ মিনিট আগে অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে৷ শহরের আলোর আড়ালে আড়ালে নিজেদের জায়গা খুঁজতে শুরু করেছে অন্ধকার৷ এক মিনিট আগে টাটার সামনে দু'টি, কেবিনের উপরে পাঁচটি, পিছনে দু'টি লাইট জ্বলে উঠেছে৷ কুষ্টিয়া থেকে চার মিনিট পর যদি কেউ হিসাব করতে বসে ত অনায়াসে বুঝতে পারবে টাটাটি ততোক্ষণে ঝিনাইদহ সড়ক ধরে চৌড়হাস পেরিয়ে গেছে৷

Wednesday, June 07, 2006

bonosai shilpo by mahbub morshed

বনসাই শিল্প
মাহবুব মোর্শেদ
শহরে, শহীদ বাবুরাম সড়কের ৩৩ নম্বর বাড়িতে বনসাই ব্যাপারটি প্রথম আমাদের মনোযোগ এড়িয়ে যায়৷ সেদিন ছিল রবিবার, সময়টা বছরের গ্রীষ্মকাল৷ 'অরিয়েন্টাল টকিজে'র অচল ভবনের পাশে মরা সাপের মতো পড়ে থাকা বাবুরাম সড়কের দেহে পা রেখে চতুর্থবারের মতো ওই রবিবার আমরা চমকে উঠেছিলাম৷ সন্ধ্যা-উত্তর গাঢ় অাঁধারিতে অতি সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে, তেত্রিশ সংখ্যাটি ৩ দিয়ে ১১ বার বিভাজ্য, এককথাই ভাবছিলাম৷ বাসবী দত্তও দরজা খুলে চমকে উঠেছিল৷ এভাবে চমকে দেয়া আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না৷ তবু সে চমকালে আমরা খুশি হয়ে উঠেছিলাম৷ সে হয়তো ভেবেছিল নিচতলাকে একতলা ভেবে আমরা তার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম৷ ভুল কিন্তু করিনি, একতলার অমিত্রাদির সাথে সেদিন কোনো কথা ছিল না৷ বাসবী দত্তের সাথে ছিল৷ বসবার ঘরে বসতে দিয়ে বাসবী 'তোদের জন্য চা করতে যাই৷ দাদাকে পাঠাচ্ছি, গল্প কর৷' বলেছিল৷ ওরা সম্ভবত এতক্ষণ ঠাকুরঘরে ছিল৷ দাদার পোশাক থেকে ধুপধুনোর ঘ্রাণ আসছিল, হয়তো এ কারণেই৷ কিন্তু তার সাথে কিছুতেই আলাপ জমে উঠছিল না৷ ঝুরঝুরে হয়ে পড়া চুনের সিলিং এর দিকে বারবার চোখ চলে যাচ্ছিলো আমাদের৷ এতে আরো অস্বস্তি বোধ করছিলেন তিনি৷ কিছু করার ছিল না৷ তাই দ্বিধা ভরে একবার ফ্যান বাড়াতে, একবার টেবিলের এটা ওটা সাজাতে যাচ্ছিলেন৷ একবার...৷ শেষে ঘরের কোনার দিকে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যেখান থেকে মানিপ্ল্যান্টের লতাগুলো উঠে জানালা ভরে তুলেছিল৷ তত্‍ক্ষণাত্‍ বিষয়ের প্রতি আমাদের মনযোগ ফিরে এসেছিল৷ স্বল্পায়তন ঘর জুড়ে থাকা গাছগুলো সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠেছিলাম সকলে৷ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বৈজ্ঞানিক নাম কী মানিপ্ল্যান্টের৷ এতেই আলাপ জমে উঠেছিল৷ আগ বাড়িয়ে তিনি মানিপ্ল্যান্ট নিয়ে অনেক কথা বলছিলেন৷ গাছটির দু'দিনে একটি পাতা বেরোয়, লতা বাড়তে বাড়তে কখনো অনেক বেশি হয়ে গেলে মূলগাছ বাঁচিয়ে সাবধানে ধারালো ব্লেড চালাতে হয়৷ ইত্যাদি ইত্যাদি৷ এইসময় চোখের নিচে কালসিটে দাগ, ঘামসিক্ত কপাল আর চা নিয়ে বাসবী এসে দাঁড়িয়েছিল৷ যেন প্রথম থেকে লতানো গাছপালার আসরে আছে সে এমন ভঙ্গিতে দাদার আলাপে মন দিয়েছিল, চা বাড়িয়ে দেবার পর৷ ওদের দারুচিনির গাছ ছিল একটা৷ চা থেকে দারুচিনির কাঁচাপাতার সৌরভ উঠছিল৷ অথচ চায়ের জন্য তাকে ধন্যবাদ দিলাম না, এতই মগ্ন ছিলাম৷ এমনকি ঘরের ফার্ন, ক্যাকটাস বনসাইগুলো নিয়েও কথা ওঠেনি৷ বনসাইগুলো দেখিনি এমন নয়৷ কিন্তু তাতে ভালমতো নজরে দেয়া যায়নি৷ কিন্তু ঐ ভাসাভাসা দেখাটাই মনে ছিল৷ পরে কেউ জিজ্ঞেস করলে মানিপ্ল্যান্টের বৈজ্ঞানিক নাম ভুলে যেতাম আমরা৷ এবং বিস্ময়করভাবে বনসাইয়ের ডিটেইলস মনে পড়তো৷ ঐ দিনটির কথাও ভুলিনি৷ বাসবী দত্তর সাথে সেদিনই আমাদের শেষ সাক্ষাত্‍৷ তখনো, এবং এর পরবতর্ী দুইমাসে আমরা বনসাই নামটি জানতে পারিনি৷ অনাগ্রহ নয়, ব্যস্ততা ছিল৷ অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের জন্য মূলশহর ছেড়ে ব্রহ্মপুত্রের পুরাতন খাতের পাশে উপশহরে চলে গিয়েছিলাম এসময়৷ তখন লোকজন ভাবতো, আমরা বোধহয় দূরের কোনো শহরে চলে গেছি৷ প্রকৃতপক্ষেই, তেমন ঘটতে পারতো৷ কারণ শহরে চাকুরির কোনো সুরাহা হচ্ছিল না৷ এ সময়, ৩৩ বাবুরাম সড়কে আমাদের প্রথম ও শেষ চিঠিটি পাঠিয়েছিলাম৷ শোনা যেত, একই শহরে লেখা এ ধরনের চিঠিগুলো নাকি রাজশাহী, ঢাকা ঘুরে শহরের প্রধান ডাকঘরে পৌঁছায়৷ দিনক্ষণের এই বোধ মনে রেখে আমরা ভাবছিলাম, অমিত্রাদির কথা, বাবুরাম সড়কে আমাদের ধারাবাহিক আড্ডার কথা এবং বনসাইয়ের নাম, পরিচয় এবং বনসাই করণের নিয়মাবলী জানতে চাওয়া আমাদের চিঠিখানা মঙ্গলবার দিন সকাল দশটা ত্রিশ মিনিটে দাদার হাত হয়ে বাসবী দত্তের হাতে পৌঁছে গেছে৷ এরপর ৭৬টি সকাল সাড়ে দশটা কেটে গেছে৷ তবু আমরা জানতে পারিনি বাসবী দত্ত চিঠিটি পেয়েছিল কি-না৷ কারণ, কোন উত্তর আমাদের হাতে আসেনি৷ ধীরে ধীরে বনসাই সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আমরা ভুলতে বসেছিলাম৷ 'দৈনিক কল্যাণে'র অফিসে সংবাদের পিছনে ছুটবার যে কাজ পেয়েছিলাম তাতে গাছ-গাছালি থেকে দূরে থাকাটাই শ্রেয় ছিল৷ লেটার প্রেসের কালিঝুলি, তালামারা টেলিফোন সেট এবং সরকারি বরাদ্দের নিউজপ্রিন্টের মাঝে বসে আমরা চারপৃষ্ঠার ডবল ডিমাই ভরাবার সংবাদ খুঁজতাম৷ এই সময় ফিলিপস ১র্৪র্ সাদা কালো টেলিভিশনে কোনো উপলক্ষ ছাড়াই বৃক্ষ সম্পর্কিত একটা অনুষ্ঠান দেখেছিলাম৷ অনুষ্ঠানে একজন বটানিস্ট বোঝাচ্ছিলেন সূর্যের আলোর প্রতি বৃক্ষের সাড়া দেবার পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে কি করে বৃক্ষের শাখাকে শৈল্পিক ভঙ্গিমায় বাঁকানো যায় অথবা শাখার স্থিতিস্থাপকতাকে কাজে লাগিয়ে ধাতব তার জড়িয়ে কি করে বৃক্ষশাখাকে ঢেউ খেলানো, অাঁকা-বাঁকা, গোলাকার ইত্যাদি শেপ দেয়া যায়৷ অনুষ্ঠানটি আবার বৃক্ষের প্রতি, বিশেষত বনসাইয়ের প্রতি আমাদের আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিল৷ এই সময় একদিন আমরা শুনেছিলাম একটি সাময়িক পত্রিকা নাকি বনসাই নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে৷ তখনো আমরা জানতাম না বনসাই কী৷ প্রতিদিন শেষরাতে পত্রিকা অফিস থেকে আমরা সাময়িক পত্রিকাগুলো হিপ পকেটে করে ফিরতাম সেগুলো থেকে কোনো ফিচার তৈরি করা যায় কিনা এই আশায়৷ সেভাবে বনসাই সংক্রান্ত পত্রিকাটিও এসেছিল৷ আমরা জানতে পেরেছিলাম, বনসাই আসলে কী? এবং ছাপানো ছবি দেখে দেখে জানালা বেয়ে লতিয়ে ওঠা মানিপ্ল্যান্টের কথা মনে পড়েছিল তত্‍ক্ষণাত্‍৷ ওই পত্রিকাতেই লেখা হয়েছিল বনসাই হলো শিল্প৷ এতে আমাদের পুরাতন কামভাব জেগে উঠেছিল৷ আমরা দৈনিকের কাজ করতে করতে ভাবতাম শিল্পের খুব কাছাকাছি মহলে আমাদের কাজ কারবার৷ তাই একটি প্রশ্নই মনে জেগেছিল 'কি করে?' এবং এরপরেই ভীতি এবং অনিশ্চয়তা আমাদের জীবন ও চিন্তাকে অধিকার করে ফেলেছিল৷ একদিন, মজনুশাহকে- 'ভাবেন বনসাই নাকি শিল্প৷' বলেছিলাম আমরা৷ মজনু আমাদের চাচাত ভাই, মামা অথবা বন্ধু৷ 'একটা গল্প বলি...' বলে একটা সত্য কাহিনী শুনিয়েছিলেন মজনু শাহ৷ খুব ধীরে গোপন খবরের সূত্র বলে দেবার মতো করে বলেছিলেন, ডাবল ডেকারে বসে৷ অথবা কোনো থাই রেস্টুরেন্টে৷ একটা মানুষ ঢাকা গিয়েছিল ব্যবসা করতে৷ মটরের পার্টসের ব্যবসা শুরু করে চালিয়েও ছিল তিনমাস৷ তো, তাকে হঠাত্‍ একদিন থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না আর৷ মাস গেল, বছর গেল৷ আত্মীয়-স্বজনরা তার আশা ছেড়েই দিয়েছে৷ এই সময় তাকে খুঁজে পাওয়া গেল৷ ফার্মগেটে, ওভারব্রিজের বামপাশে৷ আল্লা নবীর নাম৷ ... হাত পা নেই৷ চোখের কোটর খালি৷ স্মৃতি আছে কি নেই৷ ভিক্ষা করছে৷ মজনু শাহর মনে হয়েছিল লোকটি বনসাই৷ এখন অবশ্য আমাদের কেউ কেউ বলেন, মজনু শাহর সাথে আদৌ কোনো আলাপ ছিল না আমাদের, যেহেতু শহরে কোনো ডবল ডেকার চলে না, থাই রেস্টুরেন্টও নেই৷ কাহিনীটি সত্য-মিথ্যা যাই হোক, সে সময় আমাদের সাথে রাস্তা-ঘাটে অনেক খোড়া, নুলো ল্যাংড়াদের দেখা হতে থাকছিল৷ অথবা এমনও হতে পারে এদের প্রতিমুহূর্তে দেখে দেখে মজনু শাহর ঘটনাটি আমরা বানিয়ে নিয়েছিলাম৷ বানানো কথা হলেও এদের দেখে বনসাইয়ের পংঙ্গু, ল্যাংড়া, ঠেস দেয়া, তার জড়ানো গাছগুলোর ছবি মনে আসতো৷ আমরা ভাবতাম এর শিল্পমূল্য নির্ধারণ করা দরকার৷ কিন্তু শিল্পমূল্য নির্ধারণে ব্যর্থ হয়ে আমরা ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম৷ তখন ডাক্তাররা আমাদেরকে বনসাইয়ের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে বলেছিল৷ খুঁজে খুঁজে সেনানিবাসের কাছে নবীপাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম আমরা৷ সেনানিবাসের লোকেরা আর যাই করুক ফকির, ল্যাংড়া, নুলোদের কাছ থেকে দূরে থাকে, এই ভেবে৷ আমাদের ঘর হতে সৈন্যদের মার্চপাস্ট দেখা যেত৷ প্রতি সকালবেলা স্টপ, এ্যাবাউট টার্ন, হল্ট, এবং বুটের সম্মিলিত শব্দের সাহায্যে আমাদের ঘুম ভেঙে যেত৷ সৈন্যরা আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে বাজারে কিংবা এক টিকেটে দু'টি ইংরেজি সিনেমা চলতে থাকা প্রেক্ষাগৃহে যেত৷ জলপাই কালারটি আমাদের প্রিয় হয়ে উঠেছিল৷ পাখি চেনার মতো কষ্ট স্বীকার করে আমরা একই বর্ণের পোশাক পরা সৈনিকদের ভিন্ন ভিন্নভাবে মনে রাখতে চেষ্ট করছিলাম৷ সেনানিবাসের লোকজনও নানা সূত্রে জানতো আমরা 'দৈনিক কল্যাণে'র স্টাফ রিপোর্টার৷ একদিন ঘরের সামনে ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের জলপাই কালার টয়োটা থামলে আমরা দেখি মেজর খালেকুজ্জামান নেমে আসছেন৷ 'আমরা চাই আপনাদের সুকুমার প্রবণতাগুলোর বিকাশ ঘটুক৷' শক্ত হাত বাড়িয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন মেজর৷ তার কথামতো আমরা বিশাল বাউন্ডারির ভেতর শিশুদের লালন পালনের বিদ্যালয়ে সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটাতে গিয়েছিলাম৷ এখানে, শিশুদের মধ্যে সামরিক শৃংখলা প্রবল৷ কঞ্চি কাঁচা অবস্থাতেই বাঁকাতে হয় একথা মনে রেখে, ছোটবেলাতেই শিশুদের এখানে নিয়ে আসা হয়৷ তারপর মনের মাধুরি মিশিয়ে ছয়বছর ধরে গড়ে তোলা হয় পরিমিত আলোবাতাস ও নির্ধারিত তাপমাত্রায়৷ তাদের কথোপকথনের জন্য নির্বাচিত একহাজার শব্দ শেখানো হয়৷ এই শব্দের আওতার বাইরে তারা ভাব প্রকাশ করে না৷ এদের অন্তরের প্রধান, যৌথ সচেতনতা হলো- 'দেশপ্রেম'৷ যৌনতা সংক্রামক একমাত্র শব্দ হলো 'মার্চ এহেড'৷ শিশুরা আমাদের সামনে একই পোশাক সজ্জিত হয়ে মার্চ করলে আমরা অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম৷ 'অদ্ভুত!' বলেছিলাম আমরা৷ আমাদের পাশে দাঁড়ানো স্কুলের অধ্যক্ষ সস্নেহ হেসেছিলেন৷ 'তবু দেশের ভাগ্য যে প্রতিবছর শিশুদের সবচেয়ে মেধাবি অংশটিকে এখানে পাচ্ছি আমরা৷' স্বগতোক্তি করার মতো করে বলেছিলেন তিনি৷ মার্চপাস্ট দেখতে দেখতে, আমাদের চোখ একবার সারাবছর ধরে ফুটতে থাকা ফুলের গাছগুলোর দিকে চলে গিয়েছিল৷ আর একবার সমান করে কাটা ঘাসের দিকে৷ 'হঁ্যা ওই ঘাষ অথবা গাছের সাথে তুলনা করতে পারেন৷ একজন মালির সাথেই তুলনা চলতে পারে আমাদের৷' অধ্যক্ষ বলেছিলেন সাথে সাথে৷ আমাদের বুকের ওপর দিয়ে যেন গোখরা হেঁটে গেল এমনভাবে আমরা সামরিক বাহিনীর বন্ধুদের দিকে তাকিয়েছিলাম৷ আর মেজর জামান আমাদের চোখে মুখে রাষ্ট্রদ্রোহীভাব লক্ষ করে সাবধান থাকতে বলেছিলেন৷ তড়িঘড়ি আমরা ঘরে ফিরে ঘুমিয়েছিলাম৷ তাতে সংকট আরো বেড়ে গিয়েছিল৷ ঘুমের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম স্কুল প্রাঙ্গণের প্রাচীর দেয়া বিশাল অঙ্গনে কোনো শিশু নেই৷ ছয় বছর ধরে বেড়ে ওঠা বনসাই পড়ে আছে সারি সারি৷ এই দৃশ্য দেখার পর ঐ দিন দ্বিতীয়বার আমাদের বুকের ওপর দিয়ে সাপ হেঁটে গিয়েছিল, সাথে সাথে স্বল্পায়তন ঘুমটি ভেঙে গিয়েছিল৷ পরের দিন সামরিক বাহিনীর বন্ধুরা বলেছিল, আমাদের চোখ নাকি পুরোমাত্রায় রাষ্ট্রদ্রোহী বনে গেছে৷ এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাচ্ছিলাম বলে ঘর বদল করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না৷ নতুন যে-স্থানটিতে ঘরভাড়া নিয়েছিলাম সেটি স্পর্শকাতর ছিল না৷ অধ্যাপকদের বাসাবাড়ি ছিল সেখানে৷ গ্রুপ গ্রুপ কলেজ পড়ুয়ারা সারাদিন যাওয়া আসা করতো৷ সারাক্ষণ রমরমা একটা ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে এমন ভাবভঙ্গি ছিল এলাকাটার৷ বাসা নেয়ার ৪র্থ দিনে অধ্যাপক পাড়ার গোপিনাথ মোহান্ত সড়কে টাক মাথার এক অধ্যাপকের সাথে পরিচয়ও হয়ে গিয়েছিল৷ 'আসেন একদিন বিকালবেলা৷ চা খাবেন৷' বলেছিলেন তিনি৷ তার সঙ্গের লোকটির দিকেও তাকিয়েছিলাম৷ 'চায়ের দাওয়াত রইলো৷ বিকালে আসেন একদিন৷' তিনি পুনরাবৃত্তি করেছিলেন৷ সেদিন জানতে পারিনি, কিন্তু একদিন বিকালবেলা চা খেতে গিয়ে জেনেছিলাম তিনি হলেন ওই অধ্যাপকের ছাত্র৷ 'আপনাদের পেশাটা বুঝলেন, সার্বক্ষণিক নতুন কাজের৷ ক্লান্তিহীন কাজ৷ আমরা বড় বোরিং কাজ করি৷ খুব রিপিট করে৷ একুশ বছর ধরে একই সিলেবাস৷' বলে 'একটু আসছি' বলেছিলেন অধ্যাপক৷ এবং উঠে পাশের রুমে চলে গিয়েছিলেন৷ তখন ছাত্রটির কথা শুরু হয়েছিল- 'শিক্ষকতা পেশাটা আসলেই ভীষণ রিপিট করে, বুঝলেন, প্রতিদিন একই বিষয়ে কথা বলা কত বোরিং ভাবতে পারেন?' তখন শিক্ষকটি ফিরেছিলেন৷ এবং ছাত্রটিকে আমাদের জন্য নোনতা বিস্কুট আনতে বলেছিলেন৷ 'ছয় বছর ধরে আমার সাথে আছে ও৷ খুব ব্রিলিয়ান্ট৷ পদার্থ বিজ্ঞানে এ শহরে আমার পরে ওই আছে৷' নোনতা বিস্কুট আনতে গেলে ছাত্রটির প্রসঙ্গে বলছিলেন তিনি- 'আমার হাতের নির্মাণ৷ তিলে তিলে গড়ে তুলেছি৷ ছয়বছর ধরে বেড়ে ওঠা বৃক্ষ বলতে পারেন৷ প্রথম দিকে খুব গ্রাম্য একটা ভাব ছিল৷ রাশিফলে বিশ্বাস করতো৷ ওর উদ্ভট চিন্তাগুলো বাড়তে দেইনি আর৷ আমার দার্শনিকতা দিয়ে সিক্ত করেছি ওকে৷' এসব শোনার পর আমাদের পুরাতন বেদনাটা জেগে উঠেছিল৷ ম্যালামাইনের কাপে দেয়া চা বিস্বাদ লাগতে শুরু করেছিল৷ 'একটু কাজ আছে৷' বলে অর্ধেক চা খেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা৷ সঁ্যাতসঁ্যাতে সন্ধ্যাটা বেপাড়ার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেশ দেরীতে দৈনিকের অফিসে কাজ শুরু করেছিলাম সেদিন৷ পরদিনও আমাদেরকে খুব বিষণ্ন দেখাচ্ছিল৷ গোপিনাথ মোহান্ত সড়কের চৌরাস্তার মোড়ে অপরিচিত একজন লোক অন্তত তা-ই বলেছিলেন৷ 'চারিদিকে এত বনসাই৷' বলেছিলাম আমরা৷ 'তো কী? গোটা সংসারটাই একটা বনসাই তৈরির কারখানা৷' 'সংসার' শব্দটি উচ্চারণ করার সাথে সাথে আমরা তাকে দার্শনিক ভেবে নিয়েছিলাম৷ পরে অবশ্য তাকে সমাজতাত্তি্বক বলেও ভুল হয়েছিল৷ 'কি করে?' আমাদের স্বভাবসুলভ প্রশ্নটি করে বসেছিলাম৷ 'এতগুলো লজ আর বাইন্ডিংস৷ ভাবেন আপনারা, প্রথম আইনটি যখন তৈরি হলো, তখন মানুষের একটি সম্ভাবনা কিন্তু বাতিল হলো৷ আর ধীরে ধীরে অসংখ্য অনুশাসন, অসংখ্য আইন৷ মানুষের অসংখ্য সম্ভাবনা বাতিল৷ তারপর সোসাইটি৷ সোসাইটি হলো স্বল্পায়তন একটি পাত্র৷ মানুষ অনুশাসনের ছুরি চালিয়ে নিজেকে সোসাইটি নামের টবে নিয়ে বসালো৷ মডার্ন সোসাইটি চায় এই স্বল্পায়তন পাত্রে থেকে চূড়ান্ত বিকশিত মানুষ৷ চূড়ান্ত শব্দটিও কিন্তু নির্ধারণ করে দেবে ইওর সারাউন্ডিংস৷ বৃক্ষের বেলা যেমন ঘরের তাপ, আলো, বাতাস নির্ধারণ করে দেয় কতটুকু বাড়বে গাছটি৷' 'কী নাম আপনার?' প্রশ্ন করেছিলাম আমরা৷ তিনি মাছি তাড়াবার মতো করে এড়িয়ে গিয়েছিলেন৷ বলেছিলেন- 'প্রশ্ন হলো, বনসাই শিল্প কিনা, প্রশ্ন করতে গিয়ে প্রথমে সোসাইটিকে প্রশ্ন করছেন না কেন? যেটি আর সকলের কাছে শিল্প হিসাবে গণ্য সেটিকে আপনারা সন্দেহ করছেন৷ ভাবছেন না কেন আপনাদের শিল্পবোধের বিচু্যতি ঘটে গেছে৷' 'বনসাই আমাদেরকে ভীত করে তোলে৷' 'পারিবারিকভাবে জীবন থেকে দূরে থাকার ফল এটা৷ হীনম্মন্যতা৷' বলে নদীর দিকে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়েছিলেন তিনি৷ আর কোনোদিন তাকে অধ্যাপক কলোনিতে কিংবা গোপিনাথ মোহান্ত সড়কে দেখা যায়নি৷ কিছুদিন আমরা ভেবেছিলাম- তিনি অন্য কোনো শহর থেকে এসেছিলেন৷ পরে শুনেছিলাম শহরের স্থায়ী বাসিন্দা তিনি৷ বছরখানেক আগে কেউ কেউ নাকি তাকে দোকানে ক-২ ব্রান্ডের সিগারেট খুঁজতে দেখেছিল৷ বাজার হতে একসময় হঠাত্‍ করে ক-২ সিগারেট উধাও হয়ে গেলে তিনিও নাকি উধাও হয়ে পড়েছিলেন৷ অর্থনীতির প্রভাষক ছিলেন বলে শহরের তরুণরা তাকে ক-২ স্যার বলে ডাকত৷ ক-২ স্যারের কথামতো আমরা পারিবারিক জীবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম৷ প্রাথমিকভাবে মধ্যম আয়ের একটি পরিবারে আমাদের যাওয়া-আসা শুরু হয়েছিল৷ সেখানে, পারতপক্ষে আমরা শিল্প ও বৃক্ষ নিয়ে কোনো কথা তুলতাম না৷ এমনকি পেশা নিয়েও নয়৷ আমাদের সম্মিলিত চেতনার আতঙ্ক সরাতে ভিন্ন কোনো উপায় ছিল না৷ সময়ে অসময়ে আমরা থানাপাড়ার পারিবারিক জীবনে গিয়ে উপস্থিত হতাম৷ একদিন গিয়ে দেখা গেল গৃহকর্তা নেই৷ তার বিকল্প রূপেও কেউ আসলো না বসবার ঘরে৷ টিকটিকির মতো আধঘন্টা নিষ্কাম হয়ে বসে থাকলাম৷ হয়তো আরো পনেরো মিনিট কেটে গিয়েছিল৷ এসময় নারী কন্ঠে আমাদের উদ্দেশে বলা কথা শুনে চমকে গিয়েছিলাম৷ ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা বেজেছিল দেখেছিলাম৷ 'এত আসেন ক্যান আপনারা৷' খানিক রুক্ষ, বয়স্ক নারীকন্ঠ ভেসে আসছিল পর্দার ওপাশ থেকে৷ 'আমরা ল্যাংড়া, নুলো, বনসাই আর স্কুল কলেজ ভয় পাই৷' বলেছিলাম আমরা৷ 'বাড়িতে তিনটা সোমত্ত মেয়ে৷ ওদের চলাফেলায় অসুবিধা হয়৷' 'অসুবিধা কী? আমাদেরও তো পারিবারিক জীবন দরকার৷' পর্দার উদ্দেশে বলেছিলাম আমরা৷ ওপাশ থেকে বিরক্তি প্রকাশক শব্দ উঠেছিল তখন৷ কে যেন গৃহকর্তাকে বকা দিয়েছিল কটু শব্দে৷ 'মেয়ে তিনটাকে ছয় বছর ধরে গাছ বানাইছে৷ বিয়া দেওয়ার নাম নেই, আর ঘরে দ্যাখো ছেলেপেলেদের আনাগোনা৷' সমার্থক কথা ভেসে আসছিল থেকে থেকে৷ মেয়েদের পর্দা ঠিক নেই বলেও আক্ষেপ করছিলেন মহিলাটি৷ এই মেয়েগুলোও ছয় বছর ধরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা আর পরিমিত বাতাসে বেড়ে ওঠে বোধ হয়, ভাবছিলাম আমরা৷ তত্‍ক্ষণাত্‍ একতলার অমিত্রাদির কথা মনে পড়েছিল৷ মেয়েগুলোকে পর্দা মুড়িয়ে ছয়বছর রাখার পর কেমন ফ্যাকাসে বনসাইয়ের মতো লাগছিল তা দেখার প্রবল ইচ্ছা হচ্ছিলো৷ আবার প্রবল ভয়ও ছিল ভেতরে ভেতরে৷ তাই কাউকে না জানিয়ে সোজা শহীদ বাবুরাম সড়কে চলে এসেছিলাম, ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে৷ পারিবারিক জীবনেও বনসাই থেকে দূরে থাকতে না পেরে আমাদের মনে আবার অমিত্রাদিকে দেখার বাসনা জেগেছিল৷ এমনকি ল্যাংড়া, নুলো, শিশু, ছাত্র দেখলেও ভীত হবো না এমন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম৷ পরে গতানুগতিক শিল্পবোধে ভেসে যাবার প্রবল ইচ্ছা নিয়ে প্রচার করতে শুরু করেছিলাম- বনসাই হলো শিল্প৷ সে বৃক্ষের হোক বা মানুষের৷

Tuesday, March 28, 2006

লোলিতা রিলোডেড
মাহবুব মোর্শেদ

ঘটনাক্রমে এক ট্রেন যাত্রায় এই গল্পটা আমার কাছে চলে আসে, অথবা আমি গল্পটার দিকে এগিয়ে যাই৷ ঘোর বর্ষার রাত৷ চারদিকে ঘন মেঘের ডাক৷ বৃষ্টি নামবে নামবে এমন ভাব৷ ট্রেনে সিলেটের পথে হঠাত্‍ একটি পোড় খাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলাম৷ পোড় খাওয়া বলতে কী বোঝায় আমি শিওর না৷ কেননা, গল্প-উপন্যাসে পোড় খাওয়া বলতে সেই লোকদের বোঝায় যাদের অনেক ফ্রন্টে লড়াই করার অভিজ্ঞতা আছে৷ আমার কাছে সিনেমার অভিজ্ঞতাই লোক বিচারের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়৷ বিশেষ করে সেই লোকদের আমার পোড় খাওয়া মনে হয়, যাদের মুখভরা গুটি বসন্তের দাগ৷ মুখে এবং শরীরে মেদ কম৷ চোয়াল মুখের সঙ্গে সেঁটে বসা৷ অাঁতিপাতি করে লোকটার সাথে কথা বলার উপায় খুঁজতে থাকি আমি৷ কিন্তু যা হয়, আধুুনিক দুনিয়া৷ পাশাপাশি বসলেও হঠাত্‍ করে কথা বলা যায় না৷ এই সেই করতে করতে সময় এগিয়ে যায়৷ হঠাত্‍ একটা ক্রসিং-এ অচেনা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়ে৷ জানালার গ্লাস তুলে বাইরের দিকে তাকাই আমি৷ ঝমঝম বৃষ্টির ছাঁট আমাকে ভিজিয়ে দেবার জোগাড়৷ সঙ্গে সঙ্গে গ্লাস নামিয়ে দিলাম৷ আহ কী বর্ষা- ভদ্রলোক মন্তব্য করে বসেন৷ তার পরিতৃপ্তির আনন্দ খেয়াল করে আমি বিস্ময়ে তাকাই৷ তিনি এর একটা ব্যাখ্যা দেবার অবকাশ পান৷ আর তাতেই বুঝি, উনিও আমার সঙ্গে গল্প করার ছুতা খুঁজছিলেন৷ বর্ষা আমার প্রিয়৷ খুব প্রিয়৷ আমি গল্পের ছলে, অনেকটা গল্পেরই ছলে বলি, শীত পছন্দ আমার৷ হাড় কাঁপানো শীতের বাতাস৷ আমারও এককালে পছন্দ ছিল৷ এখন বয়স বেশি, শীত কম বয়সে সয়৷ এই বয়সে আর শীত আর ভালো লাগে না৷ শীত আসলে মরা মুরগীর মতো হযে যাই৷ অ্যাজমার টান শুরু হয়৷ অনেক চিকিত্‍সার পর শেষে ইনহেলারে এসে ঠেকেছি৷ বিধাতা শীত দিয়েছে, কিন্তু শীতের তেজ সহ্য করার আনন্দ আমাকে দেয়নি৷ কী জানি, হয়তো অনেক পাপেরই ফল..৷ তার কন্ঠস্বর ক্রমাগত স্বগোতক্তির পর্যায়ে পেঁৗছালে আর পাঠোদ্ধার করতে পারি না৷ আলাপ চালাবার স্বার্থে বলি, আর বর্ষা? তিনি একটু চমকে ওঠেন৷ কেন চমকান তা বুঝতে আমার দুই ঘন্টা লেগে যায়৷ সে কি এক বসায় বলা সম্ভব ব্রাদার? কী নেই বর্ষায়? বর্ষাই জীবনচক্র৷ প্রজনন ঋতু৷ কত কী৷ কোথায় যাবেন? সিলেট৷ আমিও সিলেটেই যাব৷ রাতে জার্নির সময় ঘুমাবার অভ্যাস আছে? না৷ তবে গল্প চলুক৷ সায় জানিয়ে দুজনেই চুপ করে থাকি৷ পরস্পরকে পরখ করতে থাকি৷ কতটা বিশ্বাস করা যায় সহযাত্রীকে এই মাপামাপি চলতে থাকে৷ গভীর রাতের লেনদেন বড় ভয়ঙ্কর৷ অপরিচিত লোকের সাথে তো দূরের কথা পরিচিতদের সাথেও গভীর রাতে বেশি কথা লেনদেন করতে নাই৷ মধ্যরাত স্বীকারোক্তির সময়৷ এই সময়ে জায়গামতো আঘাত পড়লে ভেতরের গোপন কোটর থেকে বেরিয়ে আসে ঘুম পাড়িয়ে রাখা তথ্যগুলো৷ তাকে অভয় দেবার জন্য আমি একটু এ্যাগ্রেসিভ ভূমিকা নেই৷ তার মনে যে প্রশ্নের উদয় হতে পারে আপনা থেকেই তার উত্তর দিতে শুরু করি৷ সিলেটে আমার এক বোন থাকে৷ অনেক দিন যাওয়া হয় না৷ পত্রিকার অফিসের চাকরি, ছুটিও কম তাই প্রথম সুযোগেই বেরিয়ে পড়েছি৷ একদিন থেকে আমার ফিরতে হবে৷ ইত্যাদি ইত্যাদি৷ সাংবাদিক? হ্যাঁ ওইরকমই৷ সংবাদপত্র নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ চলে৷ উনি ধীরে ধীরে কথা বলার স্বস্তি খুঁজে পান৷ জানালার ধারের সিটে বসার জন্য আমার সঙ্গে আসন বদলিয়ে নেন৷ জানালার গ্লাস তুলে বাইরে তাকান৷ তুমুল বৃষ্টি৷ অন্ধকার৷ তারই মধ্য দিয়ে বৃষ্টির সাদা ছাঁট হালকা-পলকা ট্রেনের আলোর ভেতর দিয়েও আভাস দিচ্ছে৷ সম্ভবত একটা দীর্ঘ ধানের ক্ষেত পার হচ্ছি তখন৷ চারাগুলো কেবল পুরুষ্ট হয়ে উঠছে এমন বিশাল ক্ষেত৷ উনি অর্থাত্‍ মি. আসাদুুল্লাহ জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে হাত ভিজিয়ে ভেতরে আনেন৷ বৃষ্টি এত পছন্দ আপনার? তো কী বললাম আপনাকে? আই অ্যাম মোর দ্যান সিরিয়াস৷ বলতে পারেন এই যে সিলেট যাচ্ছি এর মূল কারণও ওই বৃষ্টি৷ সিলেটে আমার মেয়ে থাকে৷ অবশ্য মেয়ে আর সে নয় আমার৷ তাকে মেয়ে বলা যায় না৷ বিস্ময়কর এই দুনিয়া! অমিয়ভূষণ মজুমদারের নাম শুনেছেন? নবোকভ? এবার আমার বিস্ময়ের পালা৷ এমন কি সম্ভব যে অমিয়ভূষণকে চেনে এমন দুজন একই সঙ্গে ট্রেন যাত্রা করছে এবং দৈবাত্‍ তাদের মধ্যে অমিয়ভূষণ নিয়েই আলোচনা শুরু হয়ে যায়৷ আমিও তাকে চমকে দেবার জন্য বললাম, অমিয়ভূষণের সঙ্গে নভোকভের সম্পর্ক খুঁজতে গেলে তো বিশ্বমিত্তিরের পৃথিবীর কথাই...৷ ইয়েস মাই ব্রাদার৷ সমঝদার পেয়ে তিনি আহ্লাদিত হন৷ বিশ্বমিত্তিরের পৃথিবী নাকি বিশ্বমিত্তিরের টালমাটাল পৃথিবী? ভাবি আমি, কী অসম্ভব এ পৃথিবীতে? আর কোন জিনিসইবা পড়ে আছে মানুষের জানার বাইরে? জটিল কাহিনীর আভাস পেয়ে আমি আর তার ব্যক্তিগত তথ্যের দিকে যাই না৷ তিনি নিজেকে যথাসম্ভব গোপন করতে পারুন এই-ই চাই৷ শুধু বলি, সে-ই! তাকে সময় দেই৷ যতটা সময় লাগে একজন মানুষের হৃদয় খুলে বসতে, ততটা সময় তিনি নেনও৷ মধ্যরাত্রির ট্রেন যাত্রার সুস্বপ্নের মতো তার ব্যক্তিগত কাহিনী কেন এক সহযাত্রীকে তিনি বলে ফেলেন তা আজও আমি বিস্মিত হয়ে ভাবি৷ হয়তো তার গোপন কুটুরিতে আমি দৈবাত্‍ কড়া নেড়ে ফেলেছিলাম অথবা ঘোর বর্ষায় তার গোপন কুটুরির দরজা আলগা হয়ে গিয়েছিল৷ তুমি বয়সে আমার অনেক ছোটই হবে৷ তুমি করেই বলি৷ কী বলো? বলতে শুরু করেন৷ আশপাশের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে৷ জানালা খোলা৷ ঠাণ্ডা বাতাস শিউরে ওঠার মতো বৃষ্টির ছাঁট বয়ে নিয়ে আসছে৷ তুমি অপরিচিত৷ তবু বড় দুর্বল মুহূর্তে তোমার সঙ্গে দেখা হলো৷ অমিয়ভূষণকে জানো, লোলিতা সিনেমা হিসাবে দেখেছ৷ একটা কথা বলি? তোমার কি মনে হয় বিশ্বমিত্তিরের পৃথিবী সম্ভব? কিংবা লোলিতা? নিজের মেয়ের সঙ্গে? ধরো৷ নাহ আমি ভাবতে পারি না৷ আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে৷ আমাকে দেখ৷ হ্যাভ য়ু্য অ্যানি এক্সপেরিয়েন্স অফ ইওর ওন? ইয়েস দ্যাট কাইন্ড অফ৷ উইথ ইওর ওন ডটার? দ্যাট কাইন্ড অফ৷ এমনিই এক বর্ষার বিকাল ছিল৷ ছিল আকাশ জোড়া বজ্র-বিদু্যতের কৌতুক৷ জীবনে তো কিছুই গোছাতে পারিনি৷ যা-ই গোছাতে গিয়েছি আরও এলামেলো হয়ে গেছে৷ ভেবেছি অকৃতদার বলে আমার কাজই ছন্নছাড়া জীবনটাকে আরও অগোছালো করে তোলা৷ বয়স অনেক হলো৷ পঞ্চান্নর এপারে পেঁৗছে ঝাপসা ঝাপসা অপর তীরের দিকে তাকিয়ে আর কিছু দেখতে পাই না৷ জীবনে কিছু লেখাপড়ার অভিজ্ঞতা ছাড়া উজ্জ্বল কিছুই ছিল না৷ বলার মতো একটা ঘটনাও ছিল না৷ সংসার করা হয়নি৷ এমনিই৷ কোনও কারণ ছাড়াই৷ সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেবার পর মোটামুটি স্বচ্ছলতায় দিন চলে যাচ্ছে৷ অ্যাজমা ছাড়া আর কোনও উপদ্রব নেই শরীরে৷ ডায়াবেটিস নেই, প্রেসার নরমাল৷ ব্যায়াম করি, সকাল-বিকাল হাঁটি৷ ব্যস৷ মাঝে মাঝে একটা নিরাপত্তাহীনতা পেয়ে বসে না, এমন নয়৷ যখন চলাফেরার অবস্থা থাকবে না তখনকার কথা ভেবে ভয় হয়৷ মৃতু্য হয়তো নিকটবর্তী৷ যদি এই বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকো তবে বুঝবে৷ এই বয়সে স্ত্রী, সম্পদ, ভোগের চেয়ে সন্তানের কামনা অনেক বড় হয়ে ওঠে৷ অবিবাহিতের সন্তান থাকবার সম্ভাবনা নাই৷ তবু সে আকাঙ্ক্ষাই ক্রমে বেড়ে যেতে থাকলো৷ নিকটাত্মীয়দের সকলেই দেশের বাইরে৷ তাদের কারও সন্তানকে নিজের বলে দত্তক নেব সে উপায় নেই৷ একটা বিকল্পই ছিল, কানাডা বা স্টেটস-এ চলে যাওয়া৷ ভাইয়ের ছেলেদের কাছে কাটিয়ে দিতে পারি বাকীটা সময়৷ কিন্তু ভেতর থেকে সায় আসে না৷ দেখিই না কী হয়, করতে করতে সময় কেটে যায়৷ হঠাত্‍ এমনি এক বর্ষার দিনে মাথায় একটা আইডিয়া খেলে যায়৷ নিকট বন্ধুদের একজনের তিন কন্যা৷ একজনের এক পুত্র৷ এক পুত্রের দিকে তাকিয়ে লাভ নেই৷ তাই তিন কন্যার পিতার দারস্থ হলাম৷ আমার কথা শুনে বন্ধু এবং বন্ধুর বউ হেসে খুন৷ বলে, এই শেষকালে তোর বাবা হওয়ার শখ হলো? ধর তোকে আঙ্কল না ডেকে বাবাই ডাকলো তাতেই কি সন্তানের সাধ মিটবে? আমি গোঁ ধরে বসে থাকলাম৷ পিতৃত্ব অধিকারের ব্যাপার৷ আমি চাই না তোদের মেয়ে আজ থেকেই আমাকে বাবা ডাকুক৷ আমার ঘর দেখা-শোনা করে আমাকে উদ্ধার করুক৷ বরং তোদের একটি মেয়ের পড়াশোনা কি হাত খরচ আমাকে চালাতে দাও৷ তোমার ঘরেই থাকুক সে৷ আমাকে আঙ্কল ডাকলেও ক্ষতি নেই৷ কিন্তু সে এই মেসেজটা বহন করতে শিখুুক যে তোমাদের পাশাপাশি আমার প্রতিও তার কিছু দায়িত্ব আছে৷ ব্যস৷ সহজ শর্ত৷ বন্ধু খানিকটা করুণায়, খানিকটা সহমর্মিতায় রাজি হলো৷ তিন মেয়েকে ডাকার পর এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো৷ মেয়েরা প্রস্তাব শুনে চুপ৷ বাবা-মার দিকে সন্দেহের দিকে তাকাচ্ছে৷ এই অবস্থায় আমার কান্না পেতে শুরু করলো৷ একটা অসহায়ত্ব পেয়ে বসলো৷ বেশিক্ষণ বসে থাকতে না পেরে উঠে আসলাম৷ কান্নার বেগ দমাতে না পেরে হু হু করে কেঁদে ফেললাম৷ রাতে বর্ষার ফোন৷ বন্ধুর কনিষ্ঠ মেয়ে৷ আমি যে বাষ্পরুদ্ধ হয়ে ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম তা নিয়ে সমবেদনা জানাতেই৷ আঙ্কল তুমি যদি ভাবতে চাও তো আজ থেকেই আমি তোমার মেয়ে৷ কিন্তু একটা শর্ত৷ এখনই তোমাকে বাবা ডাকতে পারবো না৷ কেন? হঠাত্‍ আসবে না৷ যেদিন মনে হবে তোমাকে বাবা ডাকা যায় সেদিনই ডাকবো৷ হৃদয় আমার প্রশান্তিতে ভরে যায়৷ জানতাম না বাবা হতে হলে কী করতে হয়৷ সংসারে একটা মেয়ের কী ভূমিকা৷ কিছুই জানতাম না৷ বায়োলজিক্যালি একজন ফাদার বলতে কী বোঝায় আমি এখনও জানি না৷ জানতে পারিনি৷ তবু জানার চেষ্টা করে গিয়েছি৷ দিনের পর দিন ওদের বাসায় গিয়ে পড়ে থেকেছি, আড্ডা দিয়েছি, ঘুমিয়েছি৷ বন্ধু বলতো এখনও বল, তোর যদি বিয়ে করে সন্তান পালনের সখ থাকে তবে তোর বিয়ের ব্যবস্থাই করি৷ চাইলে সন্তানসহ কোন ডিভোর্সি পাত্রীও দেখতে পারি৷ ওর মজা করার ব্যাপারগুলো আমি পাত্তা দিতাম না৷ আই ওয়ান্টেড টু প্রুফ মি অ্যাজ আ ইডিওজিক্যাল ফাদার৷ আই কেয়ারড ফর দ্য ফ্যামিলি, দ্য গার্ল৷ একজন ফ্যামিলি মেম্বারের মতোই থাকতাম৷ মেয়েরা দেরিতে ফিরলে ওদের বাবা-মা'র মতোই রাগ করতাম৷ টেনশনে মরে যেতাম৷ তবু দুই বছরেও বর্ষা আমাকে বাবা ডাকেনি৷ রাগ করলে বাবা-মা'র বুকে যেভাবে লাফিয়ে পড়ে সেভাবে লাফিয়েও পড়েনি৷ আমার সঙ্গেও অভিমান করতো, ভালোবাসতো, রাগ-আবদার করতো- কিন্তু খানিকটা দূরে থেকে৷ বর্ষার বাবা ততোটা স্বচ্ছল ছিল না৷ তাই ওর লেখাপড়ার খরচপত্রের ভার সানন্দে আমিই নিয়ে নিলাম৷ বর্ষার ব্যাপারটা তুই আমার ওপর ছেড়ে দে৷ অন্য দুইটা মেয়েকে তুই ভালভাবে গড়ে তোল৷ আমারই চেষ্টায় বর্ষা শাহজালাল ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেল৷ ভর্তি করালাম৷ মাসের প্রথমে ব্যাংকে করে টাকা পাঠাই, নিয়ম করে মোবাইলে খোঁজ নেই৷ ঈদে-ছুটিতে এলে আমার কাজকর্ম আর থাকে না৷ ওকে নিয়ে ঘুরতে বের হওয়া৷ এটা সেটা প্রয়োজনীয় জিনিশ-পত্র কিনে দেয়া৷ কত কী? মেয়েরা যে খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে ভীষণ কেয়ারফুল এটা বুঝতে পারি৷ ও ফিরে গেলে আবার জীবন একঘেয়ে হয়ে পড়ে৷ মৃতু্যভয় তাড়া করে৷ একা থাকলেই জোরে চিত্‍কার করতে ইচ্ছা করে৷ ফিরে যাই ওর বাবার কাছে৷ কাছে আফসোস করি, মেয়ে আমাকে আজও বাবা ডাকলো না৷ বন্ধু হাসে৷ বলে, এটা পুরোপুরি একটা বায়োলজিক্যাল ব্যাপার৷ সিনেমায় যেমন দেখানো হয় তেমন নয়৷ ইটস ভেরি টাফ টু ট্রিট আ ম্যান অ্যাজ ফাদার, হু ইজ নট দ্যাট৷ যদি ও অঝুঝ থাকতো, যদি আর্লি স্টেজ থেকে তোকেই বাবা বলে জানতো তবে হয়তো সম্ভব হতো৷ আমি তো তোকে নিষেধই করেছিলাম৷ এতদিন পর আমাকে দোষ দিস না৷ তোর ডিভোশন তো দেখছি, ইন অল ফ্যাক্ট আমি ওর আসল বাবা হয়েও চাই জীবনে একবার যেন তোকে বাবা বলে ডাকে ও৷ ওর বাবার চাওয়া পূর্ণ হয়েছিল৷ সে বাবা বলেছিল আমকে৷ পলিটিক্যাল গ্যাঞ্জামে সায়নেডাই হলে ওকে নিতে এসেছিলাম৷ থার্ড ইয়ারে তখন৷ রাতে পেঁৗছে দেখি ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় দাঁড়ানো৷ পুলিশ গিজগিজ করছে চারদিকে৷ বর্ষা দিব্যি একটা ছেলের পাহারায় দাঁড়িয়ে৷ আমাকে দেখে ছেলেটাকে টানতে টানতে নিয়ে এলো৷ বললো, এসো পরিচয় করিয়ে দি, আমার বাবা৷ আর ও হলো সুমন৷ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড৷ ফিরতে ফিরতে শুধুই ভাবছিলাম, হোয়ট দ্য ওয়ার্ড মিন, বেস্ট ফ্রেন্ড? আর য়ু্য ইন লাভ উইথ দ্য বয়, সুমন? অনেক ভেবে জিজ্ঞাসা করলাম৷ অন্য বাবাদের কী অনুভূতি আমি জানি না৷ আমার রীতিমতো সুমনের প্রতি ঈর্ষা জন্মাতে শুরু করলো৷ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বর্ষা চুপ করে গেল৷ বহু সময় চুপ থাকার পর আবার মুখ খুললাম, ডু য়ু্য ওয়ান্ট টু মেরি হিম? এটা কেমন কথা আঙ্কল, ভালোবাসলেই বিয়ে করতে হবে? দেন ইটস সাম কাইন্ড অব ফ্রেন্ডশিপ? এমভাবে কথা বলছো যেন তুমি আমার বাবা বা আঙ্কল নও৷ যেন.. যেন কী? যেন তুমি আমার প্রেমিক? হোয়াট! আমার পৃথিবী নড়তে শুরু করলো৷ কাঁপতে থাকলো ক্রমাগত৷ নিজের বাবা হলে হয়তো সঙ্গে সঙ্গে চড় কষাতে পারতাম৷ কিন্তু তাও পারলাম না৷ কাঁপতে থাকা পৃথিবী আর দুলতে থাকা ট্রেনের সাথে সাথে নিশ্চুপ থেকে শহরে ফিরলাম৷ ওকে বাসায় পোঁছে দিয়ে ঘরে ফিরলাম৷ দুইদিন গুম হয়ে, নিজের জীবনচিত্রের হাস্যকর অবস্থার দিকে তাকিয়ে হাসলাম৷ বর্ষর্ার বাবা ফোন করলো, বললাম, একটু ব্যস্ত আছি, এখনই যেতে পারছি না৷ তৃতীয় দিনে বর্ষা এলো৷ শাড়ি পরে৷ সেজে৷ হোয়াটস দিস আঙ্কল? হোয়াট ডিড ইট মিন৷ আঅ্যাম নট অ্যাজ ম্যাচিউরড অ্যাজ য়ু্য আর৷ য়ু্য সুড নট রিঅ্যাক্ট অ্যাজ সাচ৷ সুমনকে দেখে তুমি কেমন করে তাকিয়েছিলে মনে আছে? ইউ ওয়্যার জেলাস৷ আমি তো মিথ্যা বলিনি৷ তুমি তো আমাকে একটা চড় মেরে ভুল ধরিয়ে দিতে পারতে৷ কিন্তু সিন ক্রিয়েট করছো কেন? ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে থাকলো সে৷ আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম৷ সে ঠিক যেমন করে বাবার কোলে লাফিয়ে পড়ে তেমনি করে লাফিয়ে পড়লো আমার বাহুবন্ধনে৷ ওই প্রথম৷ আমি কী করবো? আমার কী করা উচিত? যদি তোমার কাছে সত্য বলি তো,আই সুড কনফেস, আই ফেল্ট হার বডি৷ ব্যাপারটাকে এড়াতেই আমি ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে দূরে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করি৷ ওতেও ভারসাম্যের সমস্যা হয়ে যায়৷ কপালে চুমু খাওয়া বলতে কী বোঝায়? স্নেহ? কিন্তু, বর্ষা আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়৷ আলতো করে আমার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়েই সরে যায়৷ ওই মুহূূর্তেই আমি বুঝে যাই আমি ওর বাবা হতে ব্যর্থ হয়েছি৷ কোথাও সূক্ষ্ম করে পেতে রাখা জালে আটকা পড়ে গিয়েছি৷ আমরা সীমারেখা ছিন্ন করেছি৷ বর্ষা চোখ নাচাতে থাকে৷ আমি বলেছিলাম না? কী বলেছিলি? বর্ষা ঠোঁট ওল্টায়৷ কিছুই বলে না৷ বিশ্বমিত্তিরের টালমাটাল পৃথিবী সামলাতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়৷ অভিনয় করে, আর যতটা সম্ভব এড়িয়ে এড়িয়েই থাকি৷ ভার্সিটি খোলার পর ও চলে গেলে হাফ ছেড়ে বাঁচি৷ এবার ফোনে যে বর্ষা কথা বলে সে আর আগের বর্ষা নয়৷ বদলে গেছে৷ এতদিনে আমার ওপর দাবি নিয়ে কথা বলে৷ আব্দার করে৷ চেঞ্জটা ধরা পড়ে সহসাই৷ হঠাত্‍ একদিন বলে, সিলেটে আসো৷ কেন? তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করছে৷ কীসের টানে, কেন জানি না ওর বাবা-মা'র কাছে গোপন করে আমি সিলেট যাই৷ বন্ধুদের কাছে এবার সিরিয়াসলি বাবা বলে পরিচয় করায়৷ জাফলং যাওয়া হয় একদিন৷ আবার নিজ দায়িত্বে আমাকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়৷ আমি ফিরে আসি৷ প্রতি মুহূর্তে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকি৷ বর্ষার পরবতর্ী নির্দেষের অপেক্ষায়৷ একে কি প্রেম বলে? আমার বয়স আর প্রেমের নয়৷ আর কেনইবা আমাকে সে পছন্দ করবে৷ একে কি পিতা-সন্তান সম্পর্ক বলে? এইটুকু বুঝি, সে আর হবার নয়৷ তবু ওর প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ কাজ করে৷ তুমি হয়তো যৌনতার কথাও ভাববে৷ সবই বললাম, এও বলি চুমুর বেশি এগোবার বয়স আমার নেই৷ এবার? আজ ওর জন্মদিন৷ সারপ্রাইজ দিতে চললেন? অনেকটাই৷ ও ভেবেছে আমি ভুলে গেছি৷ সকালে যখন দেখবে... মি. আসাদুজ্জামান সম্বিত ফিরে পাওয়ার ভঙ্গিতে চুপ করেন৷ যেন ভুলে একটা কথা বলে ফেলে পস্তাচ্ছেন৷ চোখ বন্ধ করে থাকেন কিছুক্ষণ৷ আমি আমার ক্ষুদ্র জীবন অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারি তার আরও কিছু বলার আছে৷ সে কথাটি না বললে তার পুরো গল্পটাই একটা জৈবিক তাড়নার দ্যোতনা পায়৷ সত্যি বলতে কি জানো, ওইটুকু যৌনতার কারণেই আমার দায়িত্বশীলতা হাজারগুণ বেড়ে গেছে৷ এখন আমি ওকে বিয়ে দেবার কথা ভাবি৷ এমনকি সুমনের মতো পুচকে ছোড়াকেও মেনে নিতে সায় পাই মন থেকে৷ দেন আঅ্যাম বিকামিং আ ফাদার অ্যাট লাস্ট, অ্যাম আই? রাতে না ঘুমাবার ক্লান্তি আমাকে বিমনা করে দেয়৷ আমি মনে মনে কিংবা শব্দ করে বলি, মে বি৷ ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ি৷ ভোরে ঘুম ভাঙে, ট্রেন সিলেট স্টেশনে দাঁড়ানো৷ পাশে মি. আসাদুজ্জমান নেই৷ জানালার বাইরে তাকালাম৷ ঝমঝম বৃষ্টি নেমেছে৷ তাকে খুুঁজে দেখার চেয়ে জানালা বন্ধ করে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করা ভাল৷ আর গল্পটা শোনার পর আমার নৈতিক দায়িত্ব হয়ে পড়ে তাকে হারিয়ে ফেলার চেষ্টা করা৷ আমি তাকে চিরতরেই হারিয়ে ফেলি৷#

Monday, March 27, 2006

অর্ডার অব থিংস
মাহবুব মোর্শেদ


ঘরের বিন্যাস

বাসায় ঢোকার দরজা দুটি৷ প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকলে সোজা ড্রয়িংরুম৷ দ্বিতীয় দরজা দিয়ে একটা ডানে টার্ন, তারপর ডাইনিং স্পেস৷ ডাইনিং স্পেসের পর কিটেন ও দ্বিতীয় বেডরুম৷ দ্বিতীয় বেডরুমের পর প্রথম মানে মাস্টার বেডরুম৷ মাস্টার বেডরুমের সঙ্গে অ্যাটাচড বাথরুম৷ এটা বাসার বাম দিকের বিন্যাস৷ ডান দিক, অর্থাত্‍ ড্রয়িংরুম হয়ে বাসায় ঢুকলে ওই ছয়কোনা রুমের দুটি দরজার ডানেরটি দিয়ে ঢুকলে প্রথমেই বাসার তৃতীয় বেডরুম- কখনো কেউ আতিথ্য গ্রহণ না করলেও এর নাম গেস্টরুম৷ গেস্টরুম থেকে বের হয়ে ডাইনিং স্পেস হয়ে প্রথম বেডরুমে ঢোকা যেতে পারে৷ দিক দুটোকে আলাদা বিবেচনায নিলে দুটো আলাদা চিত্র তৈরি হয়৷ প্রথম পথ অর্থাত্‍ ড্রয়িংরুমের দরজা দিয়ে ঢুকলে বাসাটির কৌণিক বিন্যাসগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে৷ ড্রয়িংরুমের ষড়ভূজ বিন্যাস দৃশ্যমানতার ভেতর আধিপত্য তৈরি করে৷ এখান থেকে তৃতীয় বেডরুমে মানে গেস্টরুমে ঢুকলে এর চৌকোনা বিন্যাসকে ষড়ভূজ বিন্যাসের চেয়ে দুর্বোধ্য মনে হয়৷ এবং এ ঘর থেকে ডাইনিং স্পেসে ঢুকলে কিচেন, দ্বিতীয় বাথরুম ও অন্যান্য রুমের বিন্যাসে তৈরি হওয়া- আঠারোটি কোন একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়৷ আঠারো কোনের এই বিন্যাস থেকে প্রথম বেডরুম পর্যন্ত প্যাসেজটিকে একটি গোলাকার গুহার মতো দেখায়৷ ঘর অন্ধকার থাকলে পথটি অগম্য মনে হতে পারে৷ আলো যদি শুধু প্রথম বেডরুমে জ্বলে তবে পুরো গুহাটি হালকা আলোয় একটি ফানেলের আকার ধারণ করে৷ আলো ডাইনিং স্পেসে জ্বললে ফানেলটি উল্টো করে রাখা মনে হতে পারে৷ এই আয়তাকার টানেল যা ক্ষেত্রবিশেষে গোলাকারও মনে হতে পারে তা-ই কার্যত ঘরগুলোর বিন্যাসের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট নির্ধারণ করে দেয়৷ বাসায় আলোর বিন্যাস দ্বিতীয় দরজা দিয়ে ঢুকলে প্রথমে বামে মেঝে থেকে তিন ফুট উঁচুতে তিনটি সুইচ৷ প্রথমটি ডাইনিং স্পেস সংলগ্ন বাথরুমের, দ্বিতীয়টি টানেলের প্রথমভাগের শুরুতে বেসিনের ওপর বসানো বাল্বের৷ তৃতীয়টি সিঁড়ি ঘরের৷ এখানে বাথরুম বা বেসিনের ওপরের আলো জ্বালিয়ে অনায়াসে দ্বিতীয় সুইচবোর্ডে যাওয়া চলে৷ এখান থেকে চারফুট দূরে বামের দেয়ালের আড়ালে পাঁচটি সুইচ৷ তৃতীয়টি ডাইনিং স্পেস আলোকিত করে৷ মূল টানেলের আলোর ব্যবস্থা টানেলের দ্বিতীয় অংশের শুরুতে, কিচেনের সুইচবোর্ডের উল্টো দেয়ালে৷ ডাইনিং স্পেসে আলো থাকলে প্যাসেজের আলোর প্রসঙ্গ নাও উঠতে পারে৷ অর্থাত্‍ টানেলে ছড়ানো আলোর রেখা ধরে সোজা প্রথম বেডরুমের সুইচবোর্ড পর্যন্ত পেঁৗছানো যায়৷ প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকলে সোজা পাঁচ ফুট হেঁটে ডানে টার্ন নিলে অর্ধচন্দ্রাকার ডিভানের বাম কোনায় পা ঠেকলে হাতের স্বাভাবিক উচ্চতায় পঞ্চম দেয়ালে সুইচবোর্ড৷ পাঁচটি সুইচের ডানেরটি ঘরের সাধারণ বাল্বের, চতুর্থটি ঝাড়বাতির, তৃতীয়টি ল্যাম্পসেডের, দ্বিতীয়টি ফ্যানের, প্রথমটি সকেটের৷ তৃতীয় বেডরুমের সুইচবোর্ড ঠিক উল্টোপিঠের দেয়ালে৷ অর্থাত্‍ এই অবস্থান থেকে দরজা ঠেলে দুইফুট পা বাড়ালে অগ্রবর্তী আরেকটি সুইচবোর্ড৷ যথারীতি সেখান থেকে প্যাসেজের মূল অংশের সুইচবোর্ড৷
আসবাবপত্র
প্রথম বিন্যাসে- ছোট তিনতলা জুতাদান৷ পাপোশ, চেয়ার, ডাইনিং টেবিল, ফ্রিজ, ওভেন ও টেবিল, দ্বিতীয় ফ্রিজ, সিঙ্ক, চুলা, বাসন-কোসনের র্যাক, বইয়ের আলমিরা, র্যাক, টেবিল, কম্পিউটার, বইয়ের তাক, স্টিলের আলমিরা, পাপোশ, ওয়্যারড্রোব, আলনা, টিভি, খাট, ড্রেসিং টেবিল, টুল, দোলনা চেয়ার.... দ্বিতীয় বিন্যাসে- পরপর তিনটি শখের হাড়ি, কার্পেট, সোফা, টব, ল্যম্পশেড, সোফা, টব, অর্ধচন্দ্রাকৃতি ডিভান, মিউজিক সিস্টেম, টেবিল, চেয়ার, খাট, ওয়্যারড্রোব.... এলোমেলো বিন্যাসে- কিচেনের ছোট ছাদ পুরো প্যাসেজে একটি ভীতিকর আবহ তৈরি করেছে সেখানে অগোছালো বিন্যাসে কুড়িটি ছোটবড় কার্টন, পুরাতন পেপারের দুটি গাদা৷ একটি ম্যাগাজিনের সতূপ৷
বসবাসরত প্রাণী
একটি ছোট ইঁদুর- কেবল গভীর রাতেই তার দেখা মেলে৷ ১৭টি তেলাপোকা, মশা হাজার তিনেক- নিধন সাপেক্ষে, চিনি জাতীয় কিছু থাকলে কালো পিঁপড়া তিনশ৷ মাছি ও টিকটিকি নেই৷ মানুষ একজন৷ আমার কথা বাসাটিতে আমি একা থাকি৷ একা থাকার জন্য একে প্রায় একটি সাম্রাজ্য মনে হতে পারে৷ আবার একটি বৃহত্‍ জঙ্গল মনে হওয়াও অস্বাভাবিক নয়৷ আমি রাতে বাসায় ফিরি৷ সকাল হলে বেরিয়ে যাই৷ ঠিক মনে করতে পারি না দিনের বেলা বাসাটিকে কেমন দেখায়৷ অফিসে বসে সরকারি বরাদ্দের বাড়িটির চেহারা আমি ঠিক মনে করতে পারি না৷ বন্ধুবান্ধবহীন অবিবাহিত জীবনে বাসাটি একসময় আমাকে অধিকার করে বসে৷ বাইরে থাকলে আমার শুধু ঘরে ফেরার কথা এবং ঘরে থাকলে বাইরে যাবার কথা মনে হয়৷ মাঝে মাঝে আমি সন্দেহ করি, এটা আসলে আমার পুলিশি চাকরির জীবনে কোনো বাসাই নয়৷ এটা বাইরে যাওয়া ও ঘরে ফেরার মাঝের একটা জটিল-বিন্যাসের সেতু৷ সাধারণত গভীর রাতে আমি বাসায় ফিরি৷ সিঁড়ি ঘরের হালকা আলো দেখে পথ চিনে পেঁৗছাই দুই দরজার সামনের একটা ফাঁকা স্থানে৷ দুই দরজাতেই তালা থাকে৷ দুটোর চাবিও থাকে আমার কাছে৷ ফলে, চাইলেই আমি বাম বা ডান দিক দিয়ে ঘরে ঢুকতে পারি৷ কিন্তু এই যে কোনো একটি দিক বেছে নেবার ওপর আমার পরবর্তী দিনটি কেমন যাবে তা নির্ভর করে৷ কেননা যে পথ দিয়ে আমি ঢুকবো আবশ্যিকভাবে সে পথ দিয়েই আমাকে বের হতে হবে৷ ফলে আমি সঠিক দরাজ দিয়ে প্রবেশ করছি কিনা এই ভাবনা খুব গুরুত্ববহ হলেও আমি কয়েক সেকেন্ডের একটা সুখবোধ করি৷ আমি এর নাম দিয়েছি নীতি-নির্ধারণী সুখ৷ এই ডিসিশন নিতে আমাকে অনেক কিছু সাটাসাট ভেবে নিতে হয়৷ ঘরের ভেতরটা আচানক আমার চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যায়৷ ভুল ডিসিশন নিলে আর তার জন্য পরের দিন কোনো দুর্ভোগ তৈরি হলে আমি ঘরের প্রবেশের দরজা বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়ার ওপর দোষ চাপাই৷ আমি এতটুকুই অদৃষ্টবাদী৷ কিন্তু বাসায় আমি যেভাবে পথ চলি তাকে আমাকে দৃষ্টবাদী বলারও কোনো সুযোগ নেই৷ বাসাটিতে আমার বসবাসের মেয়াদ ও বাসার সঙ্গে আমার আত্মিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে এতে ছড়ানো বস্তুগুলোর সঙ্গে আমার যে রিলেশন তৈরি হয়েছে তাতে আমি খানিকটা অন্ধের মতো পথ চলি৷ বাসার কোনো কিছু সহসা স্থান বদল করে না৷ ফলে, যে জায়গায় যে চেয়ার তা সে জায়গাতেই থাকে৷ সকালে যে বিছানা রেখে যাই, রাতে তা-ই ফিরে পাই৷ ফলে পুরো বাসায় ঘুরতে আমাকে যে চোখ খোলা রেখেই পা ফেলতে হয় তা ঠিক নয়৷ আমি আসলে এই অর্ডার অব থিংসের মধ্যে একধরনের অন্ধত্বের আনন্দ বোধ করি৷ পেশায় পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগে নিযুক্ত৷ তথাপি আমি পড়াশুনা করি৷ গভীর রাত অব্দি জাগি, অনিয়ম করি৷ স্ট্যাডি অর্থাত্‍ দ্বিতীয় বেডরুমে আমার অনেকটা সময় কাটে৷ বাসায় এই অবস্থানকে তুলনা করতে পারি- বোর্হেসের অন্ধত্বের সময়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে৷ সম্ভবত সেটা যুত্‍সইও৷ কিন্তু হঠাত্‍ এক রাতে আমি বিস্ময়ে- বিমুঢ় হয়ে পড়ি৷
একরাতের ঘটনা
মেটামরফসিস পড়ছিলাম৷ কখন কী ঘটেছে জানি না৷ কত সময় গিয়েছে তাও বলতে পারি না৷ হঠাত্‍ তন্দ্রা ভর করেছিল৷ হঠাত্‍ তন্দ্রা টুটলে আচানক জাগরণের ধাক্কায় স্তম্ভিত হয়ে পড়ি৷ বিছানায় শুয়ে বই পড়লে এমন হয়৷ হতে পারে৷ কিন্তু বসে পড়লে এমন ঘটে না৷ শুয়ে হালকা গোছের চিন্তাহীন বই আমি পড়তে পারি, কিন্তু ভারি কোনো কিছু পড়তে গেলে দিনের সব ক্লান্তি এসে একবারে শরীরে ভর করে৷ চেয়ারে বসেই পড়ছিলাম বলেই মনে আছে৷ তন্দ্রা থেকে জেগে একটু অবাক হলাম৷ স্বাভাবিকভাবে আমার টেবিলে উপুড় হয়ে বসে থাকার কথা৷ চোখ খুলে সোজা বইয়ের তাক দেখা যাবার কথা৷ কিন্তু তা দেখতে না পেয়ে একটা অচেনা শঙ্কা জাগে৷ তবে কি টেবিলে চিত্‍ হয়ে শুয়ে আছি? চিত্‍ হয়ে শুলে চোখে পড়বে ফ্যানঅলা ছাদ৷ কিন্তু তাও দেখা যাচ্ছে না৷ তবে কি উল্টো হয়ে শুয়েছি? তবে চোখ খুললে সোজা মেঝে দেখা যাবার কথা৷ না আপাতত কোনো মেঝে জাতীয় ব্যাপার চোখে পড়ছে না৷ তবে কি আমি স্ট্যাডি নয় প্রথম বা তৃতীয় বেডরুমে শুয়ে আছি? অথবা যা কখনোই ঘটে না, অন্য কারও বাসায় ঘুমিয়েছি? না, অফিস শেষ করে সোজা বাসায় ফিরেছি৷ খেয়ে পড়তে বসার আগের আর কোনো ঘটনা আমার মনে পড়ে না৷ তবে কি দুঃস্বপ্নের ভেতর জাগনা পেয়ে ভয় পাচ্ছি শুধু শুধু? আর একটা ব্যাপার, আমার মনে হচ্ছে আমি চিত্‍ হয়ে আছি, কিন্তু চিত্‍ হয়ে শুয়ে থাকার মতো আরাম লাগছে না৷ বরং উপুড় হয়ে আছি মনে হচ্ছে, ঠিক তাও না- হাত-পায়ের অাঁকশির সাহায্যে স্রেফ দেয়াল অাঁকড়ে ধরে আছি৷ এবার নিশ্চিত যে আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন৷ সেখান থেকে স্বপ্ন দেখছি এবং স্বপ্নে উল্টাপাল্টা ভাবছি৷ ব্যস নিশ্চিন্ত৷ কিন্তু নিশ্চিন্ত বললেও নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না, প্রথম ও প্রধান সমস্যা চেতনা৷ স্বপ্নের ভেতর এত সজাগ চেতনা কোনো দিনই আমি পাইনি৷ ফলে স্বপ্নটা হজম করতে একটু কষ্ট হচ্ছে৷ আড় চোখ চারদিকে তাকাই৷ উপরের দিকে অর্থাত্‍ নিচের দিকে তাকাতেই প্রাণ যাওয়ার অবস্থা হয় আমার৷ মহাশূন্যে ঝুলে আছি রীতিমতো৷ কোনো অবলম্বন ছাড়া, স্রেফ ঝুলে আছি৷ এ কেমন কথা? বৈজ্ঞানিকভাবে এটা সম্ভব নয়৷ তারপরও ঝুলে থাকা থেকে একটু সরে আসি৷ হঁ্যা, সরা যায়৷ দেহের ভর স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০০০ভাগ কমে এসেছে৷ পা দেয়াল আকৃষ্ট করে থাকতে পারছে৷ সবচেয়ে বড় কথা, আমি সামনে পিছনে তাকাতে পারছি, এমনকি নিজের দেহটাকেও দেখলাম একবার৷ আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল সেখানে, রীতিমতো টিকটিকির রূপ পেয়েছে দেহটা৷ মেটামরফসিস? নিমেষে আইডিয়াটা মাথায় ঝড় বইয়ে দেয়৷ কিন্তু স্রেফ একটা টিকটিকি? একটা টিকটিকি হলাম! নিজের এই পরিণতিতে তীব্র অট্টহাস্য জাগে৷ অট্টহাসির বদলে আমি এমন একটা শব্দ নিজের কানে শুনি যাকে অট্টহাসি নয় স্রেফ একটা ফুঁ বলা যায়৷ কোথাও আর মুখ দেখানোর জায়গা থাকলো না৷ কাউকে বলাও সম্ভব নয়, এক তন্দ্রার অবকাশে স্রেফ টিকটিকিতে পরিণত হয়েছি৷ বলা না-বলা পরের কথা, আপাতত ছাদ থেকে নামতে চাই আমি৷ মেঝেতে না নামলে, ঘরের অর্ডার অব থিংসটা আমার কাছে স্পষ্ট হচ্ছে না৷ মোটকথা, টিকটিকি হিসাবে আমার কোনো স্মৃতি নেই৷ থাকলে তার বয়স স্রেফ কয়েক মিনিট৷ ফলে আপাতত মানুষের স্মৃতিনির্ভর হয়েই আমাকে চলতে হবে৷ টিকটিকির চিন্তায় মানুষের চিন্তা ঢোকাতে হবে৷ একটা সমন্বয় স্থাপন করতে হবে৷ যেমন নামতে গিয়ে পড়ে যাবার মানবিক ভয়টা আমি পাচ্ছি বটে কিন্তু ছাদে যে স্রেফ ঝুলে আছি তাতে এক ধরনের টিকটিকীয় নির্ভরতাও জাগছে৷ দেখতে পাচ্ছি অল্প৷ তাতেই সই, বুক ধক ধক করে চলতে শুরু করলাম৷ সম্ভবত ঘন্টা তিনেকের মধ্যে একটা টিউব লাইটের পাশ দিয়ে, রবীন্দ্রনাথের পোস্টার হয়ে, মার্চ মাসের ক্যালেন্ডার পেরিয়ে নেমে এলাম মেঝেতে৷ টিকটিকিদেরকে বেশ দ্রুতই চলতে দেখা যায়৷ আমার বেলায় আতেটা সময় লাগায় অনুভব করি, আমার পূর্ণ রূপান্তর ঘটে নাই৷ অথবা স্বল্পায়ু প্রাণীর আয়ু লাভের কারণে সময় বিষয়ে আমার ভাবান্তর ঘটে গেছে৷ মেঝে থেকে রিডিং টেবিলের ওপর উঠে আমি প্রথমেই গোলমালটার উত্‍স সন্ধান করি৷ কোন দুঃখে যে মেটামরফসিস বইটা পড়তে ধরেছিলাম৷ মেটামরফোসিসের ওপর উঠে কয়েকটা লাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে আসি৷ গ্রেগর সামসা নামটা সহসাই মনে পড়ে৷ নিজের মনে হেসে উঠি৷ চিন্তাশুদ্ধ পুরো টিকটিকি হয়ে গেলে হয়তো এসব ভাবা সম্ভব হবে না৷ যতোক্ষণ ভাবা যাচ্ছে ভাবি৷ ভেবেছিলাম, হয়তো বা কাক হবো৷ কীসের কি টিকটিকি হয়ে পড়ে আছি৷ বাইরের দুটো দরজাই বন্ধ৷ টিকটিকি অবস্থায় দরজা খোলার সাধ্য আমার নেই৷ অবশ্য তাতে আমার বের হওয়ার অসুবিধা নেই৷ দরজার নিচ দিয়ে দিব্যি বের হতে পারি৷ কিন্তু যাবো কোথায়, অফিসে? কী করবো অফিসে গিয়ে? আমিই যে সেই গোয়েন্দা কর্মকর্তা সেটা কেউ বিশ্বাস করবে? না কি আমি তা বলতে পারবো? তাছাড়া রাস্তায় কারো ঠ্যাংয়ের নিচে চ্যাপ্টা হয়ে গেলে কিছু বলার থাকবে না৷ সব ভেবে চিন্তে ঘর থেকে বেরুবো না বলেই মনস্থ করলাম৷ পেটার বেকসেলের বইটা টেবিলের এক পাশে বন্ধ অবস্থায় আছে, আমার সাধ্য নেই উল্টিয়ে পড়বো৷ খোলা আছে শুধু মেটামরফসিস৷ পড়া যায়, চাইলে দুএকটা পাতা কসরত্‍ করে উল্টিয়ে দিতে পারি৷ এমন একটি মহান গ্রন্থ পড়া শেষ না করেই টিকটিকি জীবন শুরু করবো? তলস্তয় পড়লাম না, দস্তয়েভস্কি পড়লাম না৷ রবীন্দ্রনাথেরও কত কিছু বাকী৷ এই অবস্থায় আচানক এই টিকটিকি৷ নিঃসঙ্গ, একা৷ ভ্যান্টিলিটার বেয়ে পাশের বাসার ব্যক্তিগত জীবনে হানা দিতে পারি৷ নিজের টেলিভিশন তো ছাড়তে পারবো না৷ ওদের টেলিভিশন আছে, চাইকি দু'একটা খবর শোনা, অনুষ্ঠান দেখা যেতে পারে৷ ঘরে বসে দুনিয়ার হালচাল বোঝার একটাই উপায়, ভাবি আমি- মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখা৷ প্রতিবেশীদের ওপর চোখ রাখা৷ তারা কই যায়, কী করে, কী বলে৷ টিকটিকি সম্পর্কে সময় থাকতে পড়াশুনা না করায় পস্তাই খানিক৷ নিজে টিকটিকি হয়েও কত কম জানি এখন৷ অথচ মানুষ সম্পর্কে কত জ্ঞান আমার৷ টিকটিকির লেজ নড়বড়ে, কিন্তু এটা মূল্যবান অঙ্গ- এটুকুই আমার জ্ঞান৷ লেজ নেড়ে অনুভব করি৷ মানুষ নুনুর মতোই মহাঘর্্য এক বস্তু মনে হয় একে৷ কিন্তু স্পর্শকাতর অঙ্গটি নিশ্চয়তার বদলে খানিকটা ভয়ই ধরায়৷ অঙ্গটি বাঁচাবার প্রাণপণ চেষ্টায় আমার কর্তব্য নির্ধারিত হয় কোনো অবস্থাতেই মানুষের হাতের নাগালে চলে না যাওয়া৷ এ অবস্থায় বাইরে কি এ ধরনের প্রচারণা চলতে পারে যে, আমাকে খুন করে গুম করে দেয়া হয়েছে?
সি পেই
মাহবুব মোর্শেদ

যার কথা প্রায় ভুলতেই বসেছিল সকলে সেই বাবু হঠাত্‍ জাপান থেকে ফিরে এলো৷ বাবু লক্ষ্মী ছেলে৷ তাকে ফিটফাট, নির্বিরোধী, নিপাট ভদ্র ছেলে হিসেবে জানত সবাই৷ এ ধরনের ছেলেরা সাধারণত কারও ক্ষতি করে না, গায়ে পড়ে কারও উপকারও করতেও যায় না৷ সামনে থাকলে সবাই বলে ছেলেটা বড় ভাল, কিন্তু পেছনে গেলে কেউ আর বলে না, আহা অমুক সাহেবের ছেলেটাকে দেখি না অনেক দিন, গেল কোথায়? বাবু জাপান গেলে তাই কারও তার কথা সহসা মনে হয়নি৷ কিন্তু রফিক সাহেব, তার স্ত্রী ফাতেমা এবং পরিবারের সকলের ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়তো তার কথা৷ বাবু নিয়মিত চিঠি লেখে না, নিয়ম করে মেইলটা পর্যন্ত করে না, এই নিয়ে সব সময়ই তারা চিন্তায় থাকতো৷ ইমেইলের কথা সব থেকে বেশি মনে পড়তো নিতুর৷ বাবুর সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য ইমেইলের মতো কঠিন কাজটা অনেক যত্নে শিখে নিয়েছিল সে৷ কিন্ত বাবু মেইল করে না দেখে সে ভাবতো এখন যদি ভুলে যেতে পারতো বিদ্যাটা৷ কখনও কখনও পরিবারের সকলের মনে হতো, ছেলেটা কি তবে ভুলেই গেল তাদের৷ নিতু মাঝে মাঝে দুষ্টামি করে মাকে ক্ষেপানোর জন্য বলতো- দেখো তোমার ছেলে জাপানে কোনও মেয়েকে হয়তো বিয়ে করে সংসারি হয়ে গেছে৷ ফাতেমার মনে তখন একটা সংশয় দানা পাকিয়ে উঠতো৷ তিনি মেয়ের সাথে যুক্তি করতেন৷ নিজেকে নয়তো মেয়েকে বোঝানোর জন্য বলতেন, জাপানে মেয়ে পাবে কই? কেন সেখানে বাঙালি আছে না? পাল্টা প্রশ্ন করে মায়ের সন্দেহ ঘনীভূত করে তুলতো নিতু৷ অবশ্য এইসব বলা-কওয়া বা যুক্তি-তর্কই সার৷ নিতু নিজেই বিশ্বাস করতো না তাদের না জানিয়ে তার ঠাণ্ডা আলাভোলা ভাইটি বিদেশে গিয়ে একটা বিয়ে করে ফেলতে পারে৷ কথাবার্তা যা হতো সব মা-মেয়ের মধ্যে৷ রফিক সাহেবের চালচলন ভারিক্কি৷ তিনি সাংসারিক আলাপ-আলোচনায় ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করেন না৷ ছোটবেলা থেকে বাবু ও নিতুর মধ্যে তাকে নিয়ে একটা অজানা ভীতি ও রহস্য৷ তাদেরকে কোনও কথা বলতে চাইলে তিনি ফাতেমাকে মিডিয়া হিসাবে ব্যবহার করেন৷ কদাচিত্‍ বাবুর বেখেয়াল নিয়ে প্রশ্ন তার মধ্যে জাগে না এমন নয়৷ কিন্তু এ নিয়ে নিজের মতো করে ভাবেন তিনি৷ উত্তরও খুঁজে বের করেন সেভাবেই৷ সংসার তার কাছে সিরিয়াস ব্যাপার৷ তিনি চান, কথাবার্তা বলে একে হালকা না করতে৷ নিতু ভাইয়ের ফেরার অপেক্ষায় থাকতো সারাক্ষণ৷ ভাবতো, জাপান থেকে ভাই তার জন্য বড় মানুষের সমান কয়েকটা পুতুল আনবে৷ বড় একেটা কাগজের বাক্স খুলে বলবে, দেখ কী আনলাম তোর জন্য৷ জাপানিরা পুতুল খুব ভালোবাসে, বুুঝলি৷ এই কারণে তাদের সবার চেহারা পুতুলের মতো৷ ফাতেমার সাধ ছেলে কিছু জাপানি রান্না শিখে এসে তাকে রাঁধতে শেখাক৷ রান্নাবান্না তার কাছে প্রায় নেশার মতো৷ একেকটা তরকারি রান্না করতে করতে তিনি ভাবেন, কে জানে জাপানে এইটা কেমনে রাঁধে? ছেলেটাই বা কী খাচ্ছে? পরিবারের তিন সদস্যের ভাবনা, জল্পনা-কল্পনার ছেদ ঘটিয়ে নো মেইল নো চিঠি নো ফোন, একেবারে বিনা নোটিশে এক সন্ধ্যাবেলা বাবু হাজির৷ আর এই হাজির হওয়াটা স্রেফ হাজির হওয়াই নয়, রীতিমতো এক ঘটনা৷ বাড়ির সকলকে তো বটেই, পাড়া-প্রতিবেশীকেও অবাক করে দিল৷ তার ফেরা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকলো কয়েক মাস৷ সন্ধ্যায় সে এসে পেঁৗছালো আর রাত নটা নাগাদ বাড়ি লোকে লোকারণ্য৷ সবাই দেখলো বাবু, তার মা এবং নীতু একটা জাপানি মেয়েকে ঘিরে বসে আছে৷ রফিক সাহেবকে দেখা যাাচ্ছে না৷ সম্ভবত তিনি ঘরের মধ্যে গুম হয়ে আছেন৷ এত গুরুতর ঘটনাতেও তার প্রতিক্রিয়া নিশ্চুপ থাকার৷ অথবা উত্তেজিত হলেও যথাসম্ভব ব্যক্তিত্ব দিয়ে চাপা রাখছেন৷ প্রতিবেশীরা নিতুকে ডেকে নিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করছিল, জাপানি মেয়েটা কে? বাবু কেন তাকে বাড়ি নিয়ে এলো ইত্যাদি ইত্যাদি৷ নিতু ধৈর্যের সাথে তাদের বোঝাচ্ছিল, তার ভাই জাপান গেলে হঠাত্‍ একদিন এক মেলায় সি পেই অর্থাত্‍ এই মেয়েটার সাথে আলাপ-পরিচয় হয়৷ প্রথম দেখাতেই ভাল লেগে গেল, তারপর প্রেম-ভালাবাসা৷ তারপর আর কী? এবার ফেরার পথে একেবারে বিয়ে করে নিজের সঙ্গে নিয়ে ফিরল৷ এসব শুনতে শুনতে প্রতিবেশীরা বুঝতে পারে, সি পেইও বুঝতে পারছে তাকে নিয়েই কথা হচ্ছে৷ সি পেই তাদের উদ্দেশে হাসে, মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান দেখায়৷ সকলে তার এই কাণ্ড দেখে হেসে তালি দিয়ে রীতিমতো একটা মজমা তৈরি করে ফেলে৷ কেউ বলে, এতো দেখি একেবারে পুতুলের মতো৷ গাটা যেন ননীর তৈরি৷ কেউ বলে, নিতু তোমার ভাবীকে আমরা ছুঁয়ে দেখবো৷ নিতু ভাবে কী ঝামেলায় না পড়া গেল৷ এ কি জাপানি পুতুল? পুতুলের মতো দেখতে বটে কিন্তু এরে তো প্রাণ আছে৷ সবাই একবার করে ছুঁয়ে দেখলে এ তো পুরোটা ক্ষয়ে যাবে৷ সে দূর থেকে ভাবীকে আগলে রাখার ভান করে বলে- না না৷ মনে মনে অনেক দায়িত্ব বোধ করে৷ সি পেইকে রক্ষণাবেক্ষণের মূল দায়িত্ব যে তারই সেটা সে বুুঝে নেয়৷ মধ্যরাতে পাড়া-প্রতিবেশীর ভীড় কমে গেলে নিতু সি পেইকে পাহারা দেয় আর ফাতেমা বউ-ছেলের জন্য ঘর গোছাতে থাকেন৷ একেবারে ফিটফাট করে ঘর গুছিয়ে এত্তটুকু সি পেইকে প্রায় কোলে করে ঘরে নিয়ে যান৷ সি পেইকে ছুঁয়ে তিনি একেবারে মোহিত৷ তার মনে হয়, এ মেয়ে মাখনের তৈরি না হয়েই যায় না৷ না জানি তার ছোঁয়ায় সি পেইর গায়ে কোনও আঘাত লাগলো কিনা৷ সি পেই জাপানি হলেও ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলে, সামান্য বোঝেও৷ কিন্তু যতটা বোঝে তার চেয়ে বেশি সে অনুভব করে৷ অনুভূতি যা বলে তাতে খুশি হয়ে ওঠে আপন মনে৷ নিতু আর ফাতেমার আপ্যায়নে বোঝে তাকে তারা খুব আপন করে নিয়েছে৷ অনুভবের ভাষা দিয়ে সে কথা বলে ওঠে৷ ফাতেমা তার কাছে গেলে, তাকে নির্বাক বাচ্চা মেয়ের মতো অাঁকড়ে ধরে৷ এই স্পর্শে ফাতেমা কেঁদে ফেলেন৷ বাবু একটা বিশ্বসুন্দরীকে বিয়ে করলেও তিনি খুশি হতেন না, যতোটা খুশি সি পেইকে বিয়ে করে আনায়৷ মনে মনে তিনি জাপানি জাতটার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন- তারা এত সুন্দর পুতুলের মতো মেয়ে তৈরি করেছে বলে৷ আর বিরক্ত হন, বাবুর বাবার ওপর৷ যতটা খুশি হওয়া দরকার, ততোটা খুশি কেন হচ্ছেন না কেন তা ভেবে৷ বাবু সি পেইর সাথে মাঝে মাঝে ফিসফাস করে কথা বলে৷ তাকে এটাসেটা বুঝিয়ে দেয়৷ সি পেই হাসে৷ কথায় কথায় মাথা নোয়ায়৷ বিরামহীনভাবে সকলকে ধন্যবাদ দিতে থাকে৷ নতুন দেশটিতে সে যে খুব সুখী হবে বুঝতে পারে৷ চারদিকে ছোট ছোট জ্বলজ্বলে পুতুলের চোখ নিয়ে তাকায়৷ সবকিছু চিনে নিতে চায়৷ সব ভাল লাগে তার৷ নিতুকে ভালোবাসা জানায়৷ পরিবারের আর সকলের মতো রফিক সাহেবকে একটু দূরের মানুুষ হিসেবে অবাক হয়ে দেখে৷ বুঝতে চেষ্টা করে, তার আসাটাকে কীভাবে নিয়েছেন রফিক সাহেব৷ পরদিন থেকে সবার মুখে মুখে শুধু সি পেই৷ সি পেই কেমন করে হাসে, মাথা নোয়ায়, তার নাকটা কেমন বোঁচা, চোখ কেমন ছোট তারপরও কেমন সুুন্দর, বাড়িতে থাকলে কী পরে, কাঠি দিয়ে কেন ভাত খায়, ওদের প্রেম কভিাবে হলো, কীভাবে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে জাপান থেকে ভেগে এলো এইসব হয়ে ওঠে সবার আলোচনার বিষয়৷ মাথা নিচু করে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় পাড়ার মেয়েরা অবাক হয়ে বাবুর দিকে তাকায়, তাদের মনে হতে থাকে কেন যে আগে তার প্রেমে পড়লো না৷ বাবু জাপানি কেতা অনুসারে ফুলবাবু হয়ে ঘোরে৷ সবাইকে সালাম দেয় আর কেউ তাকে ভাল-মন্দ জিজ্ঞেস করলে মাথা নুইয়ে সম্মান দেখায়৷ পাড়া জুড়ে সবাই ধারণা করে জাপানি জাতটা হলো অমায়িক৷ মানুষকে সম্মান দেখাবার ক্ষেত্রে রীতিমতো ওস্তাদ৷ বিকাল হলে বাবু আর সি পেই ঘুরতে বের হয়৷ একটু দূর থেকে নিতু তাদের অনুসরণ করে৷ এরেকম হাঁটতে হাঁটতেই হঠাত্‍ সি পেই পিছন ফিরে নিতুকে জড়িয়ে ধরে৷ দেখে সবাই বলে, আহা পুতুলের মতো মেয়ে৷ সকলের সামনে এই আলিঙ্গনে নিতুর মনে হয়, জাপান দেশের সব থেকে দামী পুতুলটা আনলেও এতটা খুশি হতো না সে৷ ইতিমধ্যে সে তাকে ভাবী বলে ডাকতে শুরু করেছে৷ আর সি পেই বুুঝে নিয়েছে ভাবী হলো, ভাইয়ের বউ৷ অথবা আদর করে ভাইয়ের বউকে ভাবীই ডাকে এদেশের লোক৷ ফাতেমা রান্নার সময় সি পেইয়ের জন্য আলাদা পদ তৈরি করেন৷ জাপানিরা ঝাল একদম কম খায়, শাক-সব্জি প্রায় ভাপানোটা পছন্দ করে, সেই মতোই তিনি সি পেইয়ের জন্য রাঁধেন৷ সি পেই রাঁধতে চাইলে নিষেধ করেন৷ কারণ আগুনে তার সুন্দর গোলাপী ত্বকের ক্ষতি হতে পারে৷ দূরে উঁচু টুলের ওপর বসে সি পেই তাকে জাপানি রান্না শেখায়৷ তিনি রান্না পরখ করে যখন দেখেন ভাল হচ্ছে, স্বাদটা প্রায় বিদেশী খাবারের মতো, তখন রান্নার সাফল্যে সি পেইকে কোলে তুলে আদর করেন৷ মনে হয় সি পেই তার ছেলের বউ নয়, এ হলো রান্না শেখাবার জাপানি পুতুল৷ প্রতিবেশীরা বউ দেখার জন্য বারবার বাবুদের বাড়ি যেতে পারে না৷ বিকাল হলে তাকে দেখার জন্য বাড়ির বাইরে দাঁড়ায়৷ বাবু, নিতু আর সি পেইয়ের বের হওয়ার অপেক্ষা করে৷ বের হলে মরে হয় বিকালটা সার্থক৷ সবাই চায় সি পেইয়ের দৃষ্টি আকর্ষর্ণ করতে৷ সারাটা পথ সি পেই মাথা নোয়াতে নোয়াতে চলে৷ তাই দেখে ছেলে-বুড়ো সকলে হাসে৷ সবাই ভাবে তাদের বাড়ির সোমত্ত মেয়েটাকে জাপান ফেরতা বাবু বিয়ে করলেও তারা এতটা খুশি হতো না, যতটা খুশি তারা সি পেইয়ের আগমনে৷ জাপানি রান্নাগুলো আয়ত্ত করার পর ফাতেমা চান বাবুর বিয়ের অনুষ্ঠান হোক৷ জাপানি বউয়ের বউভাতের অনুষ্ঠানে তিনি সবাইকে জাপানি খাবার খাওয়াবেন৷ যেই ভাবা সেই কাজ৷ আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের দাওয়াত দিয়ে তিনি রাঁধতে বসেন৷ ছোট্ট সি পেই আর নিতু তাকে সাহায্য করে৷ প্রতিবেশী মেয়েদের সাহায্যে নিতু পুরো একতলা বাড়িটাকে রঙিন কাগজ আর ফুল দিয়ে সাজায়৷ পাড়ার ছেলেরা অনুষ্ঠানে সি পেই বসবে বলে একটা উঁচু মঞ্চ বানায়৷ বিকাল বেলা সবার আসার সময় হলে সি পেই জাপানি পোশাক পরে সেই মঞ্চের আসনে বসে৷ বাবু জাপান থেকে আনা সাউন্ড সিস্টেমে সি পেইয়ের প্রিয় একটা গান চালিয়ে দেয়৷ উপহারে উপহারে ভরে যায় মঞ্চ৷ উঁচু থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে কৃতজ্ঞতা জানায় সি পেই৷ ধন্যবাদ দেয়৷ বাবুর প্রতি তার প্রেম আরও বেড়ে যায়৷ জাপানে ফেলে আসা বাবা-মাকে ফিসফিস করে জানায়, দেখ বাবা-মা আমি কত সুখী৷ মনটা আনন্দে ভরে ওঠে৷ সি পেইয়ের দিনগুলো আর রাতগুলো ভালই কাটাচ্ছিল৷ সমস্যা নেই কিছুই, দেশটাকে নিজের ভাবতে মোটেও অসুবিধা নেই৷ মানুষগুলো সত্যিই তাকে আপন করে নিয়েছে৷ সামান্য সমস্যা আবহাওয়া৷ জাপান দেশটা ঠাণ্ডা৷ বাংলাদেশ হলো- গরম আর বৃষ্টির খনি৷ বৃষ্টি শুরু হলে কথাই নেই৷ জাপানেও বৃষ্টি প্রচুর হয়৷ তাই বৃষ্টিটা সয়ে গেলেও, গরম আর তার সয় না৷ একারণে যখন তখন ঘুমিয়ে পড়তো সে৷ বিশেষ করে বাড়ির ভেতরের বারান্দায় পাতা কাঠের চেয়ারে৷ ফাতেমার কাজ দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তো নিজেই জানতো না৷ অবশ্য বাড়ির লোকদের খারাপ লাগতো না ব্যাপারটা৷ সি পেই ঘুমাক আর জেগে থাকুক, তাকে সুন্দর দেখাতোই৷ ঘুম থেকে জাগলে তার শরীরের কাঠে লাগা অংশে দেখা যেত গভীর লাল দাগ৷ রফিক সাহেব একদিন সি পেইয়ের গালে এরকম লাল দাগ দেখে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন৷ কিন্তু কারও সাথেই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বললেন না৷ সন্ধ্যায় সোজা বাজারে গিয়ে ফোমের কুশন দেয়া একটা দোলনা কিনে আনলেন৷ নিজে দড়ি বেঁধে শক্ত করে বারান্দায় টাঙিয়ে সি পেইকে ডেকে তাতে বসালেন৷ বললেন, এখানে ঘুমাও মা৷ তার এই কাণ্ড দেখে তো ফাতেমা আর নিতু হেসেই খুন৷ কিন্তু সমস্যা হলো- তারা তো আর রফিক সাহেবের ব্যাপার নিয়ে প্রকাশ্যে হাসতে পারে না৷ তাদের চাপা হাসি অনেক সময় ধরে চলতে থাকলো৷ সি পেইয়ের হলো আরেক সমস্যা, বললেই তো আর ঘুমানো যায় না, তাই সে হাসি হাসি মুখ নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকলো৷ মনে মনে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো৷ পাড়ার সবাই কোনও না কোনও উপলক্ষে সি পেইয়ের প্রতি ভালোবাসা জানাবার পর রফিক সাহেবের ভালোবাসা প্রকাশিত হলো৷ তবুও সবাই খুশি, তাদের জানের জান সি পেই অবশেষে রফিক সাহেবের মতো রাশভারি লোকেরও মন পেল৷ কিন্তু এতো ভালোবাসা সি পেইয়ের সইলো না৷ অঘটন একটা ঘটলোই৷ সি পেইয়ের খুব সাইকেল চালাবার সখ ছিল৷ জাপানে তো সকলের সাইকেল আছে৷ কিন্তু আমাদের মফস্বল শহরেও সাইকেল চালানো খুব ঝক্কি৷ কিন্তু সি পেইয়ের এমনই শখ, কাউকে সাইকেল চালাতে দেখলে তার এক চক্কর চালানো চাই-ই চাই৷ এই দেখে রফিক সাহেব বাজার থেকে একটা সুন্দর সাইকেল কিনে আনলেন৷ সি পেই মহা খুশি৷ সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, তবু সে সাইকেলে চক্কর মারছে তো মারছেই৷ শেষ পর্যন্ত ভূতের ভয় দেখিয়ে তাকে ক্ষান্ত করা হলো৷ সেদিনই রাত দশটার কাহিনী৷ ছেলে-পুলে দু'একজনের চলাফেরা ছাড়া রাস্তায় কেউ নেই৷ হঠাত্‍ দুএকটা রিকশার টুংটাং৷ ব্যস এইটুকুই শব্দ৷ রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলো৷ এই নিরবতা খানখান করে হঠাত্‍ কয়েকটা গাড়ির শব্দ কানে এলো৷ রাস্তার ছেলেপুলেদের হুড়োহুড়িতে সজাগ হয়ে উঠলো সবাই৷ বাড়ি থেকে কেউ বের হলো না বটে কিন্তু নিঃশব্দ বেড়ালের মতো কান খাড়া করে রইলো৷ পুলিশ ঘিরে ফেলেছে পুরো পাড়া৷ কেউ ভেয়ে পাচ্ছে না, এ পাড়ায় কে এমন সন্ত্রাসী যে তাকে ধরতে পুরো পাড়াটাই ঘিরে ফেলতে হচ্ছে৷ হয়তো অন্য এলাকা থেকে আসা কোনো সন্ত্রাসী লুকিয়ে আছে, ভাবলো কেউ কেউ৷ কিন্তু পুলিশের একটা দল যখন বিদেশী কয়েকটা লোক ও একটা মহিলাসহ বাবুদের বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো তখন সবাই বুঝলো এ সন্ত্রাস-মন্ত্রাস নয়, রহস্য অন্যকিছু৷ একে একে সাহস করে একজন দু'জন এগিয়ে যেতে থাকলো বাবুদের বাড়ির দিকে৷ সে বাড়িতে ততক্ষণে কান্নার রোল৷ যেই গেল সেই কাঁদতে থাকলো বৃত্তান্ত শুনে৷ নিতু ফাতেমা তো বটেই, সি পেইও বাঙালিদের মতো শোর করে কাঁদছে৷ পুলিশসহ কয়েকটা জাপানি লোক আর জাপানি মহিলাটি ঘিরে আছে রফিক সাহেব আর বাবুকে৷ সি পেইয়ের বাবা-মা জাপান দূতাবাস আর বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করতে এসেছে৷ তাদের অভিযোগ, বাবু তাকে অপহরণ করে এদেশে নিয়ে এসেছে৷ রফিক সাহেব যতোই বোঝান ওরা ভালোবেসেই বিয়ে করেছে ততোই নাখোশ হয় পুলিশ৷ বলে, সরকার চায় না সি পেই এখানে থাকুক৷ জাপানি মেয়েটি জাপানে ফিরলেই শুধু সরকারের শান্তি৷ পুলিশ হুংকার ছাড়ে আর জাপানি লোকগুলো কিচির মিচির করতে থাকে৷ সি পেইয়ের বয়স আঠারো হয়নি৷ আঠারোর নিচের কোন মেয়েকে বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা মানে অপহরণ৷ ফোঁপাতে ফোঁপাতে সি পেই প্রতিবাদ করতে থাকলো৷ বললো, সে যথেষ্ট বড়৷ বুঝেশুনেই তাকে বিয়ে করেছে৷ এখানে থাকতে চায় সে৷ কোথাও যেতে চায না৷ বাবা-মা তার দিকে এলেই খামচে তাদের দূরে সরিয়ে দিতে থাকলো৷ সময় যাচ্ছিল, একটু একটু করে ভীড়ও বাড়ছিল৷ লোকসংখ্যা বাড়ায় ভড়কে গেল পুলিশ আর জাপানিরা৷ পাড়ার লোকজন সাফ জানিয়ে দিল, সি পেই যেহেতু চায় না তাই কোনো শক্তিই তাকে পাড়ার বাইরে নিয়ে যেতে পারবে না৷ অবস্থা খারাপ দেখে জাপানিরা ফিসফাস করে পুলিশের সাথে কথা বললো৷ তারপর পুলিশ, পাড়ার মুরুবি্ব এবং বাবুদের পরিবারকে নিয়ে মিটিং ডাকলো৷ মিটিং শুরুর আগে সিদ্ধান্ত যা হয় তা সবাইকে মেনে নিতে অনুরোধ করলো পুলিশ৷ শুরুতেই সি পেইয়ের বাবা-মা বাবুর সাথে তার বিয়ের ব্যাপারটা মেনে নিল৷ বললো, মেয়ে ভুল করলেও তার ভালোবাসা তো ভুল হতে পারে না৷ উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাাদ জানালো তারা তাদের মেয়ে এতটা আপন করে নিয়েছে বলে৷ রফিক সাহেব ও ফাতেমার প্রতি সম্মান দেখালো৷ বললো, সি পেইয়ের বয়স সামনের অক্টোবরে আঠারো হবে৷ তারা চায় নভেম্বরেই জাপানি রীতিতে আবার সি পেই ও বাবুর বিয়েটা সেরে ফেলতে৷ জাপানে তাদের বন্ধুরা নইলে খুবই নাখোশ হবে৷ তখন বাবুসহ পুরো পরিবারকেই জাপান গিয়ে সি পেইকে নিয়ে আসতে হবে৷ তবে তার আগের কয়েকটা মাস মেয়ে তাদের সঙ্গেই থাক৷ এই সময়টায় বাবা-মা তাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসতে চান৷ বাকী জীবন তো এখানেই থাকবে৷ ব্যাপারটার সহজ সমাধান পেয়ে সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচলো৷ বললো, আসলেই জাপানিরা ভদ্র জাতি৷ সি পেইও মেনে নিল৷ বাবুর মা-বাবা, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই অনুরোধ জানালো রাতটা তাদের সাথে কাটাতে৷ কিন্তু ভোরেই জাপানের ফ্লাইট বলে তারা সি পেইকে আদর করে গাড়িতে তুললেন৷ কেঁদে-কেটে সবার কাছে বিদায় নিয়ে জাপান চলে গেল সি পেই৷ ঘুম থেকে জেগে পাড়ার বাচ্চারও তাকে হাত নেড়ে বিদায় জানালো৷ সি পেই বললো ফিরবে সে আবার এই নভেম্বরেই৷ পাড়ায় ফিরে সাইকেল চালিয়ে বেড়াবে৷ তখন সবার সঙ্গে আবার দেখা হবে৷ সি পেই বিহীন পাড়ায় পরদিন থেকে একটা অদ্ভূত নিরবতা নেমে এলো৷ সব কিছুই এলোমেলো হয়ে যেতে থাকলো৷ দিন যেতে যেতে এক সময় পুুরো পাড়াটাই স্থবির নির্বাক হয়ে পড়লো৷ বাবু শুকাতে শুকাতে, চুপচাপ থাকতে থাকতে নিজের ভেতর সেঁধিয়ে গেল৷ অক্টোবর-নভেম্বর চলে গেলেও জাপান থেকে কোনো চিঠিপত্র বা দাওয়াত এলো না৷ পাড়ার বিষণ্ন ভাবটাই শেষ পর্যন্ত চিরস্থায়ী হয়ে গেল৷ প্রিয়, হাসিখুশি, পুতুল পতুল, নরম মাখন মাখন সি পেই আর কখনও ফিরে আসেনি৷

অক্টোবর, ২০০৫

Sunday, March 05, 2006