Wednesday, September 07, 2011

দিল্লিতে নাশতা, চট্টগ্রামে লাঞ্চ মান্দালয়ে রাতের খাবার


কয়েক বছর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আশা প্রকাশ করেছিলেন- দিল্লিতে নাশতা, লাহোরে লাঞ্চ আর কাবুলে রাতের খাবার খাবেন। ভারতের পশ্চিমের দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে মনমোহন এমন স্বপ্ন ব্যক্ত করেছিলেন। ভারত আশা করেছিল, শান্তি আলোচনার মাধ্যমে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে একটা চমৎকার সম্পর্কে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু মুম্বাইয়ে হোটেল তাজে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা তার সে আশার গুড়ে বালি ফেলে দেয়। এখন ঢাকা সফরের আগে ভারতের কয়েকজন সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী তার সে ইচ্ছার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য সি. রাজা মোহন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় দুটি কলাম লিখে এ বিষয়ে মনমোহন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন তিনি। বলেছেন, পশ্চিম সীমান্তে যা হয়নি পুবে তা হতে দোষ কি? মনমোহন দিল্লিতে নাশতা, চট্টগ্রামে লাঞ্চ আর মান্দালয় বা কুনমিংয়ে রাতের খাবারের কথা ভাবছেন না কেন? ভারতীয় বিশ্লেষকদের মধ্যে পূর্বদিকে সম্পর্কোন্নয়নের এই আইডিয়া আসার পেছনে বড় একটি কারণ চীন। বেশ কয়েক দশক ধরে প্রতিবেশীদের বেলায় চীন যে নীতি অনুসরণ করছে তা শুধু এশিয়াতে নয়, পুরো বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে প্রতিবেশীদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে চীন। তাদের সঙ্গে উন্নয়ন, অগ্রগতি ভাগ করে নিতে চেয়েছে। বিনিয়োগ, ব্যবসা, বাণিজ্য, যোগাযোগে তাদের সহায়তা করেছে। এর ফল হয়েছে দারুণ। দেখা গেছে, সীমান্তজুড়ে চীনের বন্ধুর শেষ নেই। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অগ্রগতি হয়েছে সত্য, কিন্তু প্রতিবেশীদের তাতে কোনো ভাগ নেই। ভারতের চারদিকে বিরোধিতাই মূল আবহসঙ্গীত হিসেবে বেজে চলেছে। বিশ্বে শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে গেলে এটা সুখকর কোনো অবস্থান হতে পারে না। তাই ক্ষীণ হলেও ভারতে এখন সমঝোতার কূটনীতি জায়গা করে নিয়েছে। চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তো আছেই। নিজেদের স্বার্থেও ভারতের এখন এটি দরকার। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে এ মনোভাবের ছাপ পড়তে পারে বলে আশা করছিলেন কেউ কেউ। সি. রাজা মোহন মনে করেন, এ সফরটি 'গেম চেঞ্জার' বা 'খেলার বদল ঘটানো' উদ্যোগ। রাজা মোহন বলেছেন, মনমোহনের এই সফর শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের জন্যই একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার এবং চীন পর্যন্ত এ সফরের প্রভাব পড়তে পারে। তার মতে, ভারতের জন্য এটি একটি সুযোগ। বাংলাদেশও মনে করে ট্রানজিটকে বাংলাদেশ- ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিস্তৃত করা দরকার। ট্রানজিট থেকে ভারত যেমন তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুবিধা পাবে তেমনি বাংলাদেশেরও উপযুক্ত ট্রানজিট মাশুল পাওয়া উচিত। দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের বাইরে নেপাল-ভুটান পর্যন্ত ট্রানজিট সুবিধা বিস্তৃত হওয়া উচিত। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই উপমহাদেশের পূর্বাংশের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে চীন উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সঙ্গে মিয়ানমার, বাংলাদেশ, নেপাল এবং পূর্ব ভারতের আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ইউনান থেকে মিয়ানমার-বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। ব্রিটিশরাজ যা পারেনি তা এবার সম্ভব হচ্ছে। মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে রেল ট্রানজিটের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। রাজা মোহন মনে করেন, এই সফরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর উচিত শেখ হাসিনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে দক্ষিণ এশীয় রেল নেটওয়ার্কে ভারতের যুক্ত হওয়ার পথে শক্ত অবস্থান নেওয়া। রাজা মোহনের মত যে খুব গৃহীত হচ্ছে তা নয়। বরং এখনও রক্ষণশীল প্রতিবেশী নীতিই ভারতে প্রধান। মনমোহন সেই রক্ষণশীলতা কাটিয়ে চীনের মতো ভারতকেও আঞ্চলিক নেতার মর্যাদায় নিয়ে যেতে পারবেন কি-না, প্রতিবেশীদের ছাড় দিয়ে, সুযোগ দিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন কি-না সেটি ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।

Thursday, June 17, 2010

ই বুক প্রসঙ্গে

Thursday, May 7, 2009 at 7:38pm on facebook
ই-বুক নিয়া লেখকরা কী ভাবেন এইটা জানার ইচ্ছা থেকে নোটটা লিখতেছি। লেখকদের মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণা হইলো, ই-বুক করলে বইয়ের বিক্রি কমে যাবে। ঘটনাটা আসলে কী? এইটা জানতে একদিন আনিস ভাইয়ের (আনিসুল হক) সাথে কথা বলছিলাম। উনি কইলেন, ই-বুক করার পর বইয়ের বিক্রি কমে না, বরং বাড়ে। আনিসুল হকের 'মা' বইটা বৈধভাবে ই-বুক হইছে। প্রচুর ডাউনলোড হইছে। তাতে বইটার পাঠক বাড়ছে বই কমে নাই।
আমি আসলে ই-বুক নিয়া জানতে বা বুঝতে শিখছি অল্প দিন হইছে। অল্পবুদ্ধি ভয়ংকর। হঠাৎ সেদিন মনে হইলো, সুব্রতদার 'পুলিপোলাও' বইটা ই-বুক আকারে থাকলে সুবিধা হইতো। পুলিপোলাও আসলে কিনছিল শুভাশিষ সিনহা। আমি ওর কাছ থেকে নিয়া পড়ছিলাম। এখন আবার পড়ার ইচ্ছা করতেছে। পাইতেছি না। ই-বুক থাকলে ডাউনলোড কইরা পড়তে পারতাম। এই রকম মেলা বইয়ের কথা বলা যায়, যেইগুলা বাজারে নাই, সহসা ছাপা হওয়ার সম্ভাবনাও নাই। আবার পড়াও দরকার। এরকম বইগুলা হাতের নাগালে থাকলে ভাল।
অদিতি ফাল্গুনীর 'ইমানুয়েলের গৃহপ্রবেশ' বইটার কথা মনে পড়তেছে। বইটা অনেকেই পড়তে চায়। কিন্তু পাওয়া যায় না। অনেক লেখকের প্রথম বইয়ের কথা বলা যায়, যেইগুলা মনে হয় ছাপা অবস্থায় লেখকের কাছেও নাই। যেমন কামরুজ্জামান কামুর 'কবি মুখপত্রহীন'। নতুন পাঠকের কাছে বইগুলা পৌঁছাইতেছে না।
কথা হইলো, কী করা যায়? আমাদের প্রকাশকরা বই ছাপে ৩০০-৫০০ কপি। প্রথমবার শেষ দিনে মেলায় বই আইনা কিছু বেচে। আজিজ মার্কেটে দোকানপ্রতি ৫ কপি দেয়। এরপর বাকী বই বাঁধাই হইলো না নীলক্ষেতে গেল খবর নাই। কারো ভাগ্য ভাল হইলে মেলার মাঝামাঝি বই আসতে পারে। তখন ৮০-১২০ কপি বেচা হয়। ধরা যাক ২০০ কপিই বেচা হইলো। পত্রিকা অফিসে ২০ কপি। লেখকের নিজের কাছে ৫ কপি থাকলো। এইতো হিসাব। তাইলে পাঠক তো পাইতেছে না। ই-বুক করলে অন্তত পাঠক চাইলে পাইতে পারে।
ভাল বইগুলার ই-বুক এক জায়গায় জড়ো করার জন্য একটা ওয়েবসাইট করার চিন্তা করতেছি। লেখকদের অনুমতি সাপেক্ষে বইগুলা সেইখানে থাকতে পারে। একটা জায়গা তৈরি করা যাইতে পারে যেইখানে গেলে ভাল কিছু বই পাওয়া যাইতে পারে। সেই বইগুলার প্রচারণাও করা যাইতে পারে।
যাই হউক, ফেসবুকে আমি একটা পেজ খুলছি। ই-বুক ও ই ম্যাগাজিন নামে। আপনাদের পরামর্শ পাইলে আগানো যাইতে পারে। কী বলেন?
Ireen Sultana

Mostofa Kamal Chowdhury

আসাদ ইকবাল শান্ত

Trivuz ত্রিভুজ

Nokshi নকশী

Salah Uddin Shuvro

Rokonuzzaman রোকন
Jahangirnagar University

Tanim Humayun

Sayeed Jubary

Mamunur Rahman
Bangladesh University of Eng and Tech

Salahuddin Ferdaus

Nafees Imtiaz Pial

Sujan সুজন

Jannatun Nahar Munnee

Kalo Kali Das


বৃষ্টির গান


liked this note.

দাবী-দাওয়া ও দখলদারির সাহিত্য

Thursday, April 23, 2009 at 1:23pm on face book
একবার এক লেখক বন্ধু আলাপ শুরু করলেন এমনে। কইতেছিলেন, তোমরা যেমনে লেখো...। আমি নিপ ইন দ্য বাড খেললাম। বললাম, আমার কোনো গল্প তো আপনে পড়েন নাই। আমি একেবারে অনুমানে কইছি। দেখি উনি একেবারে কাবু হয়া গেলেন। আমি কইলাম, শুনেন পড়তে হবে এমন আমি কইতেছি না। তলস্তয়ও তো আপনে পড়েন নাই। তাতে কী? কিন্তু না পইড়া কথা বলা ঠিক না।
চারদিকে এইরাম ঘটনা প্রচুর। কেউ হয়তো প্রশংসা কইরা বসলো। চাইপা ধরেন, দেখবেন পড়ে নাই। এমনেই কইতেছে। কোনো ধান্দা আছে। যারা নিন্দা করে তারা কিছু কিছু পড়ে বইলা আমার ধারণা। তবে ইদানিং অনেক নিন্দুক দেখতেছি, যারা না পইড়া নিন্দার মতো সিরিয়াস কাজটা করেন।
আরও ঘটনা ঘটে, যেমন ধরেন আমি গত দুই বছর লেখতেছি না তেমন গল্পগাছা। তো, কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী আছে। দেখা হইলে কইবে, মেলাদিন লেখতেছো না। আমি দুইএকজনরে চ্যালেঞ্জ কইরা দেখছি। আমার লেখা না লেখায় ওনাদের কিছু আসে যায় নাই। কথার কথা হিসাবে কয় এইগুলা। আসলে গল্প কিছু পড়ে নাই।
এইরাম এক শুভানুধ্যায়ীর সঙ্গে লাস্ট সপ্তায় দেখা। কয়, মেলাদিন তো লেখেন না মোর্শেদ। আমি বক্র হাসি দিয়া কইলাম, জাতিকে আর কত দিবো? ছেচল্লিশটা গল্প লেখলাম। জাতি এইগুলা বুইঝা সারুক। দেন আবার লেখায় হাত দিবো। সংখ্যা একটা ব্যাপার। উনি বিস্ময় প্রকাশ কইরা কন, ৪৬? এইগুলা কোথায় ছাপা হইছে?
লে হালুয়া। কোথায় ছাপা হইছে এখন ওনাকে বলতে হবে। অছাপা একটাও নাই, এইটা খালি কইলাম। সাথে কইলাম, এই যে আপনেরা যারা খালি নিজের লেখা মনোযোগ দিয়া পড়েন তাদের নিয়া সমস্যা। মনে করেন, ইতিহাসের সেন্টারে আপনেরা বইসা আছেন। গায়ের ওপর দিয়া হাতি হাঁইটা গেলেও মনে করেন মাছি বসছে। এমনে বাংলা সাহিত্যের সাড়ে সর্বনাশ করতেছেন। আত্মচোদনের একশেষ কইরা দিতেছেন। রেফারেন্স দিতে গেলেও নিজের সাহিত্য থেকে দেন। অশ্লীল কথা শুইনা উনি একটু সম্বিত ফিরে পাইলেন। যুক্তি দিতে চাইলেন, কইতে থাকলেন, উল্লেখযোগ্য পত্রিকায় যদি আপনের লেখা ছাপা না হয়........। আমি কইলাম, তাইলে আর আমারে নিয়া কথা কেন? আমি লিখি না লিখি সেইটা জানতে চায়া আমার শান্তি বিঘ্ন করেন ক্যান?
মুসলমানদের বাংলা সাহিত্য হইলো মামা-চাচাদের সাহিত্য। ভাইস্তা-ভাগ্নিদের সাহিত্যের খুব কদর। আপনে ভাইস্তা-ভাগ্নি হয়া যান সমস্যা হবে না। বাৎসল্য, প্রীতি আর প্রেমের দুনিয়ায় আপনেরও কিছু জায়গা হবে। আর আছে আত্মরতি সোজা বাংলায় যারে কয় আত্মচোদন। বাংলাদেশে যে কাউরে কইলে নিজের ওপর একটা বক্তৃতা দিতে পারবে, একটা পিএইচডি করতে পারবে। আর এই জ্ঞানীরে গরুর রচনা লিখতে কন, দেখবেন খালি মাঠে গরু খুঁজতেছে।
আমার কথা বিশ্বাস না করলে, কবি বন্ধু আপনের সবচেয়ে কাছের কবিবন্ধুরে আপনের সাহিত্য সম্পর্কে কইতে কন। অথবা তিনি আপনের অনুপস্থিতিতে আপনার সম্পর্কে কী বলেন সেইটা জাইনা নিন। বস্তুত আমি ছাড়া আর কিছু নাই। আমি একটা কবি আমি একটা গল্পকার, আমি একটা গোষ্ঠী, আমি একটা দশক। দৌড় তো ওই দশক পর্যন্তই। বেশ দশকে দশকে থাকো, জীযো যুগ যুগ।
আমি কটুভাষী না। মিহি মোলায়েম কইরা কথা কই। কিন্তু তারপরও কথাটা কই। মত জানাই। তাই আমারে কেউ পছন্দ করে না। সভাসমিতিতে ডাকে না। আড্ডা-আলোচনায় বাদ দেয়। পাঠ আয়োজনে অনুপস্থিত রাখে। তারপরও যাই। অনাহুত হিসাবে। দর্শকের বলার সুযোগ আইলে বলি। শুনলাম, আমাকে নাকি দর্শক হিসাবেও না রাখার প্লান করছে। বেশ।
একমতের সাহিত্য, সহমতের আড্ডা আর পিঠ চুলকানির গভীরতা দিয়া আর কী হইবে?
তবে কি জনাব সাহিত্য ছাইড়া দিবো? আপনে বলবেন দিছি। লেখি না, ছাপি না। মনে হয় ছাইড়াই দিছি। না জনাব, ছাড়ি নাই। মেলাই লিখছি, যে ভাইয়ের মনে প্রশ্ন উঠবে আওয়াজ দিয়েন। তবে জনাব আপনেদের মতো দাবি করতে পারবো না। আমি অমুক, অমুক দশকে অমুক পদ লইছি। তমুকদের মধ্যে অগ্রগণ্য হইছি এমন দাবি নিয়া আগায়ে আসতে পারবো না। পোষাইলে পোষাইলো না পোষাইলে নাই।
আপনের জন্য সত্যই আমি লেখি না। তবে জনাব আপনে বলবেন আপনি কার জন্য লেখেন? আমি বলবো আমি কার জন্যই লেখি।
হা হা হা।
সম্প্রতি দাবী-দাওয়া নিয়া মেলা আলোচনা হইতেছে। সেই প্রসঙ্গে এই প্রলাপ।
শেষে হুমায়ুন আজাদের একটা প্রবচন (যদ্দুর মনে পড়ে)। উনি কইছিলেন, এইদেশ হইলো মূর্খের দেশ। তুমি যদি কও ভাই আমি কিছু না। মূর্খরা না পইড়া তোমার মুখের কথায় তোমারে কিছু না বানায়ে দিবে। আর যদি কও আমি হেনা তেনা এটা সেটা অনেক কিছু। মূর্খরা না বুইঝা সেইটাই বিশ্বাস করবে।
Amzad Sujon

Jannatun Nahar Munnee

Muiz Mahfuz

Omar Sharif Pallab
Birmingham City University

Udisa Emon

Azhar Forhad

Nuruzzaman Manik

Sujan সুজন

Sayeed Jubary

liked this note.

Tuesday, June 15, 2010

খালেদা জিয়ার বাড়ি

Wednesday, April 15, 2009 at 3:05pm on facebook

মন্ত্রিসভা খালেদা জিয়ার মইনুল রোডের বাড়ির বরাদ্দ বাতিল করার সংবাদ গুরুত্ব সহকারে মিডিয়াগুলা প্রচার করলো, দেখলাম। তবে এই সংবাদ প্রচারে তারা বহুবার জেনারেল জিয়ার বিধবা স্ত্রী, তারেক-কোকোর দুর্নীতি এইসব বিষয় গুরুত্ব দিয়া উল্লেখ করছে। হরে দরে মিডিয়াগুলা খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্ট থিকা তাড়ানোর ব্যাপারে একমত হইছে এইটা বুঝা যায়। ভাল কথা। মিডিয়ার লোকেরা, বুদ্ধিজীবীরা কী কী যুক্তি দিতেছেন সেইটাও খিয়াল করলাম।
বাড়ির বরাদ্দ বাতিলের বিষয়টা জাতীয় রাজনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পরিণত হইছে। হ্ওয়ারই কথা। কারণ এই বাড়ি শুধু বাড়ি না, বরাদ্দ বাতিলও শুধু বরাদ্দ বাতিল না। খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাতিলের বিষয় এইটা আসলে না। এইটা আসলে কী?
সেনাবাহিনীর সাথে বাংলাদেশের অসামরিক রাজনীতির বুঝাপড়ার নতুন মাত্রা এই বাড়ি দিয়া নির্ধারিত হইতে যাইতেছে বইলা ধারণা করা যায়। জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রীকে দুইটি বাড়ি দিছিলেন জেনারেল এরশাদ। দুইটা বাড়ির একটা ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত। এরশাদ কইছেন, উনি জানতেন না যে খালেদা জিয়া রাজনীতি করবেন। এরশাদের জানার কথা না। কারণ এরশাদ নিশ্চিত আছিলেন যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের রাজনীতি জাতীয় পার্টি গঠনের মাধ্যমে বিএনপির হাত থিকা তার পকেটে গিয়া ঢুকবে। খালেদা জিয়া পলিটিক্যালি নিঃস্ব হয়া পড়বেন। তাই তিনি তৎকালে সেনাবাহিনী, দলত্যাগী বাংলাদেশী ন্যাশনালিস্ট ও ওই রাজনীতির লোকদের সহানুভূতি আকর্ষণের জন্য খালেদা জিয়াকে দুইটা বাড়ি দিছিলেন। বলা যায়, ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে খালেদা জিয়া সুখে আছিলেন। ওই বাড়িতেই তার রাজনৈতিক অভীপ্সার বিকাশ ঘটছিল। উনি এরশাদের দুর্বলতার সুযোগে আবারও বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী সমর্থিত ব্রিফকেস অভ্যস্ত স্যুট-টাই পরিহিত ভদ্রলোকদের জাতীয়তাবাদী ক্লাবটিকে মজবুত করেছিলেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদরে ব্রান্ডিং এরশাদের পকেট থেকে বের করে নিজের কবলে নিয়েছিলেন। সব মিলায়ে ৯০এর অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসছিলেন।
তখন ও পরে যে কোনো সময় বাংলাদেশের অপরাপর অসামরিক রাজনৈতিক শক্তিগুলা বিশ্বাস কইরা আসছে যে, মইনুল রোডের বাড়িটা খালেদা জিয়ার শক্তির অন্যতম খুঁটি। কিন্তু ওই বাড়ি থিকা তাকে বাইর কইরা দেওয়ার সাধ্য ও সাধ কারো হয় নাই। কথিত আছে, মহাপরাক্রমশালী তত্ত্বাবধায়ক সরকার খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করার আগে দশবার ভাবছিল শুধু ওই বাড়ির কারণে।
খালেদা জিয়া ওইখানে নিরাপদে থাকেন। সেনাবাহিনীর মনোভাব বুঝতে পারেন। রাস্তায় চলতে গিয়া অনেকের সাথে দেখাসাক্ষাৎ হয় এইটা অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলার চক্ষুশূল হয়া থাকতে পারে। সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে এইটারে তারা বাধা হিসাবেও দেখতে পারে। ফলে, সুযোগ পাইলে খালেদাকে সেনানিবাস ছাড়া করার সুযোগ তারা ছাড়বে না এইটা সহজবোধ্য। শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাইতে হয় যে, তিনি সঠিক সময়ে সঠিকভাবে খালেদা জিয়ার নিবাস কাইড়া নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। পিলখানায় শহীদ সেনাকর্মকর্তাদের পরিবারের বাসস্থানের জন্য শহীদ জিয়ার পরিবারের বাসভবন ছাড়তে হবে খালেদা জিয়াকে।
এর মধ্য দিয়া।
১. সেনাবাহিনীর দরদ কোন শহীদ/শহীদদের প্রতি বেশি সেটা পরীক্ষা হয়া যাবে।
২. পিলখানা শহীদদের ব্যাপারে খালেদা জিয়া কতটা স্যাক্রিফাইস করতে পারেন সেইটা বুঝা যাবে।
৩. এই বাড়ির আইনগত ভিত্তি কেমন মজবুত তা পরীক্ষা হয়ে যাবে।
৪. খালেদা জিয়াকে শেষ পর্যন্ত তাড়াতে না পারলেও আওয়ামী লীগ যে মরণ কামড় দিতে পারছিল সেইটার শক্তি পরীক্ষা হবে।
এখন প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ তথাকথিত প্রগতিশীল রাজনীতির জিম্মাদার হিসাবে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অধিকতর সমর্থন পাইতেছে সন্ত্রাসবিরোধী রাজনীতির নায়কদের কাছ থেকে। যে কালে যে আচার, বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো দেশে এই আচারে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বকে প্রগতিশীল আচরণ করতে হইতেছে। স্বাভাবিকভাবে বিএনপির সাথে তাদের মারিফতি ঐক্যের বদলে এখন আওয়ামী লীগের সাথে প্রাকৃতিক মৈত্রী তৈয়ার হইছে। কিছু ঝামেলাজনক এলিমেন্ট নাই তা না। কিন্তু সেনাবাহিনীকে মোটাদাগে প্রগতিশীল ভূমিকা এখন নিতেই হবে।
এই প্রাকৃতির মৈত্রীর সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে সরিয়ে সেই মারিফতি যোগাযোগ নষ্ট করতে চাইতেছে। রাজনীতির চাল হিসাবে এইটাও খারাপ না। কিন্তু এর মধ্য দিয়া আওয়ামী লীগ বিএনপির জায়গায় নিজেকে প্রতিস্থাপন করতে চাইতেছে, যে জিনিশটা খুবই খারাপ।
খালেদা জিয়া ক্যান্টনমেন্টে থাকতে পারবেন না কেন?
কারণ ওইখানে থাইকা উনি পলিটিক্স করেন। বেশ। ওনার ওইখানে থাকা অবৈধ। দুইটা বাড়ি নেয়া অবৈধ।
তাইলে ওইখানে বৈধভাবে থাইকা যারা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন তাদের ব্যাপারে সরকার কী বলেন?
ওইখানে না থাইকা যারা ওইখানকার চাওয়া পাওয়া রাজনীতিতে বাস্তবায়ন করেন তাদের ব্যাপারে শেখ হাসিনা কী বলেন?
দেশ সুরক্ষার জন্য যারা শপথ নিয়া অস্ত্র ধারণ করেন তারা রাজনৈতিক অভিলাষ প্রদর্শন করলে সেইটারে যে অন্যেরা উৎসাহ দেয় সেইটারে কী বলা যায়।
আমাদের সমাজে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের যে সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি তার উৎস কোথায়? সবাইরে তো এরশাদ বাড়ি দিয়া প্রতিষ্ঠা করে নাই। ধরলাম, সেনানিবাসে একা খালেদাই রিয়েল বাড়ি দখল কইরা আছেন কিন্তু যারা ভার্চুয়াল বাড়ি কইরা আছে? কবি এইখানেই নীরব।
কথা হলো আওয়ামী লীগ কোনো গণতান্ত্রিক উদ্দেশ্য থিকা খালেদা জিয়াকে উৎখাত করতে চাইতেছে না। ফলে, ছাগমাতার তৃতীয় সন্তানের মতো যারা আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্রকে বেসামরিকায়নের পদক্ষেপ হিসাবে দেখতেছেন তারা ভুল দেখতেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে চোখ বুলাইলে বুঝা যায়, ভুল শীঘ্রই ভাঙিবে।

Rifat Hasan

A.N.M. Mominul Islam Mukut

Sharmee Hossain
University of Dhaka

Tarik Saifullah

Nayeemul Hossain Choudhury
East West University

Irteja S. Ali

Abdullah Mahbub Sumon

Raafiq Hariri

Omar Sharif Pallab
Birmingham City University

Tasneem Khalil
North South University

Niaz Morshed Chowdhury
TCD

Apurbo Shohag

Angelica Lima

liked this note.

পিলখানা হত্যাকাণ্ড বিষয়ে

Monday, March 30, 2009 at 6:59pm on facebook
কন্সপিরেসি থিওরি যে কয়টা সামনে আসছে সবকয়টাই দেখলাম ঠিক। সবকয়টার পক্ষে যুক্তি প্রায় অকাট্য। আমি সবকয়টাই বিশ্বাস করছি। এই ঘটনা জামাত ঘটাইতে পারে। আবার নাও ঘটাইতে পারে। এই ঘটনা জেএমবি ঘটাইতে পারে আবার নাও ঘটাইতে পারে। হইতে পারে এই ঘটনা ইনডিয়া/পাকিস্তান/আফগানিস্তান/যুক্তরাষ্ট্র/যুক্তরাজ্য ঘটাইছে। হইতে পারে, আওয়ামী লীগ/বিএনপির নেতারা এই ঘটনার পিছনে আছে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ সম্প্রসারিত করার উদ্দেশে এই ঘটনা ঘটানো হইতে পারে। আবার সন্ত্রাসবাদীরাই এই ঘটনা ঘটাইতে পারে। বিডিআরের আভ্যন্তরীণ ক্ষোভ থিকা এই ঘটনা ঘটতে পারে। আবার সেনাবাহিনীর অন্তর্ন্দ্বন্দ্বের কারণে এই ঘটনা ঘটতে পারে। উলফা এই ঘটনা ঘটাইতে পারে। সন্দেহের বাইরে কেউ নাই। কাউরেই সন্দেহের বাইরে রাখা যাইতেছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, তদন্ত না আসলে গণভোটের আয়োজন কইরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হইছে।
এমনও হইতে পারে যে একটা জরিপের আয়োজন করা হইলো।
সন্দেহজনক সবার নাম লিস্টে থাকলো।
জনগণ যাকে বেশি সন্দেহ করবে তাকে ধরা হইলো।
কোর্টমার্শাল/বিডিআর আইন/প্রচলিত আইনে তাদের বিচার হইলো। কোন আইনে বিচার হবে এই নিয়াও একটা ভোটাভুটি হইতে পারে।
বহুধাবিভক্ত একটা সমাজে সিদ্ধান্তে পৌছানোর আর কোনো উপায় দেখতেছি না।
আবার ব্যাপারটাকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সামলানো দরকার। তাই ভেবেচিন্তে এই সমাধান বের করলাম।
কেউ পছন্দ না করলে বা মাইন্ড খাইলে আওয়াজ দিয়েন।
Nusrat Jahan Dipa

Rifat Hasan

Chondon চন্দন

Palash Basak

Faruk Wasif

Nuruzzaman Manik

Wahida Farzeen

Omar Sharif Pallab
Birmingham City University

Nayeemul Hossain Choudhury
East West University

Abdullah Mahbub Sumon

Puspo Kona


Goutam Roy গৌতম রায়


শরীফ খিয়াম আহমেদ ঈয়ন
liked this note.

জানি বিশ্বাস করবেন না তবু

Monday, March 23, 2009 at 9:15pm on facebook

মারা যাওয়ার বছর খানেক আগে সেলিম আল দীনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হইছিল। সে বার স্যার আমারে ফোন দিয়া প্রথম মহুয়া উৎসবের স্মৃতি রোমন্থন করার মানসে আমারে জাহাঙ্গীরনগর যাইতে কইছিলেন। আমিও বহুদিন পর স্যারের ফোন পায়া নরম মন নিয়া ক্যাম্পাসে গিয়া উপস্থিত হইছিলাম। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর স্যারের বাসায় বড় সাইজের কই মাছ দিয়া ভাত খায়া ঢাকার পথে রওনা হইছিলাম। স্যারের সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা।
মৃত্যুর আগে পরে আর দেখা হয় নাই। স্যারের ভুলে দুইবার ফোনে কথা হইছিল। দুইবারই স্যার কোনো এক ডক্টর মাহবুবকে খুঁজতেছিলেন। প্রথমবার জিগাইলেন, ড. মাহবুব বলছেন? আমি বললাম, স্যার আমারে তো আপনেরা ডক্টরেট দিলেন না। এমফিলেও আমি ভর্তি হই নাই। ভুল করে ফোন করলেও সেদিন স্যারের সাথে মেলা কথা হইছিল। কুশলাদি বিনিময় হইছিল। পরের বার একইভাবে ফোন কইরা স্যার ড. মাহবুবকে খোঁজ করার পর আমি আর কূটাভাস না করে বললাম, স্যার আমি মাহবুব মোর্শেদ। মনে হইলো আগের বারের ঘটনা উনি ভুলে গেছেন। বললেন, জরুরি দরকার ড. মাহবুবকে। এখন রাখি, পরে কথা হবে তোর সাথে। তাড়াহুড়ার মধ্যে আর ডক্টর মাহবুবের পরিচয় জানা হয় নাই। স্যারের সাথে আর কথাও হয় নাই। মাঝে ভাবছিলাম ফোন দিবো। আজ দেই কাল দেই করে করে আর দেয়া হয় নাই ফাইনালি। উনি যে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন এইটা আমি বুঝতে পারি নাই। অথচ আমার বুঝা উচিত আছিল।
সেলিম আল দীন মারা যাওয়ার পর ল্যাব এইডে গেছিলাম। শহীদ মিনার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ পর্যন্ত গিয়া ফিরে আসছিলাম। তার শুভানুধ্যায়ী বন্ধু অনেকের সাথে দেখা হইলেও তার সাথে আর সাক্ষাৎ হয় নাই। মাঝে মাঝে ভুল হয়। মনে হয় উনি মনে হয় বেঁচে আছেন। জাহাঙ্গীরনগরে গেলেই দেখা হবে। সময় করে একদিন গেলেই দেখা হবে। এইটা স্রেফ মনে হওয়ার বাইরে কিছু না। আমি নিশ্চিত সেলিম আল দীন আর বেঁচে নাই। তার স্মরণোৎসব হয়ে গেছে। তার নামে সেমিনার সিম্পোজিয়াম চলতেছে। এইগুলা দেখলে আর সন্দেহ থাকে না যে উনি নাই।
কাল রাতে হঠাৎ বালিশের নিচে রাখা ফোনের ভাইব্রেশনে অন্ধের মতো হাত বাড়িয়ে দিছিলাম অভ্যাসবশত। এরকমভাবে ফোন ধরার অভ্যাস আমার আছে। তবে ঘুমের মধ্যে নাম্বার দেখি না। ফোন ধরে কথা শুনে পরিচয় বোঝার চেষ্টা করি। এরকম একটা ফোন কালকেও আসছিল। আমি যথারীতি বালিশের নিচে হাত চালায়ে ফোনটা ধরে খুব অবাক হয়া গেলাম। স্মৃতি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। সেলিম স্যারের ফোন। উনি ফোনের শুরুতে হ্যালো বা এইরকম কোনো কথা বলতেন না। সেইরকমভাবেই সরসরি প্রসঙ্গে ঢুকে গেলেন। বললেন, লেখাটা তো ধরলি না?
কোন লেখা স্যার, আমি তার কণ্ঠস্বর শুনে কোনো সন্দেহ পোষণ না করেই বুঝলাম উনিই।
কোন লেখা সেটাও ভুলে গেলি? কাল সকালে উঠে ভেবে বের করে আমাকে ফোন দিস।
আমি ভাবলাম জিজ্ঞেস করি, উনি এত রাত পর্যন্ত জেগে আছেন কেন?
প্রশ্নটা ঠোঁটে আসার আগেই উনি লাইন কেটে দিলেন।
কমপ্লিট নীরবতা না হইলে স্যার ঘুমাইতে পারতেন না। আমার মনে হইলো হয় উনি লিখতেছেন নয়তো কোনো কারণে ঘুম আসতেছে না। কিন্তু স্বাভাবিক হিসাবে আমারে ফোন দেওয়ার কথা না।
বুঝতে পারলাম না, স্যার কোন লেখার কথা বুঝাইতে চাইলেন। ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমায়ে পড়লাম।
সকালে বউ অফিসে যাওয়া উপলক্ষে আমাকে ডেকে তুললে জেগে উঠলাম। তাকে বিদায় দিয়ে টুকিটাকি কিছু কাজ করে টিভির রিমোর্ট হাতে নিছি অমনি স্যারের কথা মনে পইড়া গেল।
অর্থাৎ প্রয়াত সেলিম আল দীন আমাকে ফোন করছিলেন রাতে। নিজে থেকে একটা হাসি আমার মুখে দেখা দিয়েই মিলায়ে গেল। মনে মনে বললাম, সেলিম স্যারের পক্ষেই এমনে স্বপ্নের মধ্যেও তদারকি জারি রাখা সম্ভব। কিন্তু উনি কোন লেখার কথা জিগাইলেন? ওনার জীবিত কালে আমি বলছিলাম, স্যার আপনার যথাযথ মূল্যায়ন যাতে হয় এইজন্য আমি একটা বই লিখবো। সেই বইটার কথা না তো?
অনেকেই তো লিখতেছে। এর মধ্যে আমার কথাই কেন ওনার মনে হইলো। বিশেষ কইরা। নাটকের আমি কী বুঝি।
এইসব ভাবতে ভাবতে ভয়ে ভয়ে ফোনটা হাতে নিয়া রিসিভড কল লিস্টটা দেখার জন্য বাটন চাপলাম। সেখানে সেলিম আল দীনের নাম্বার থাকবে না এইটা দুই দিনের শিশুও জানে। তাই না?
Muzib Mehdy মুজিব মেহদী

Gitiara Nasreen

Mamun M. Aziz

Niaz Morshed Chowdhury
TCD

Anika Shah

Omar Sharif Pallab
Birmingham City University

Azfar Hussain
Grand Valley State

Khaled Hossain

Bibek Xed

N.h. Sarja সার্জা

Nayeemul Hossain Choudhury
East West University

Puspo Kona


শরীফ খিয়াম আহমেদ ঈয়ন
liked this note.

জেএমবি

Wednesday, March 18, 2009 at 12:48pm on facebook
দেশ আজ গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার। মাত্র দু মাস আগে জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসছে। যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না। যারা গণতন্ত্রের শত্রু তারা এই নবীন সরকারটিকে দুর্বল করার চেষ্টায় লিপ্ত। বাংলাদেশ সন্ত্রাস বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করায় জঙ্গিবাদীরা এই সরকারকে বিপদে ফেলতে চাইতেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্নে এরা বাধা দিতে চাইতেছে। ভবিষ্যতে আরো নানা হামলার চেষ্টা করতেছে, বইলা পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হইতেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান বলেছেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ফেছনে আছে জেএমবি। জেএমবির নেতাদের ফাসি হইছে। কিন্তু তারা নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে নতুন হামলা করতেছে। জেএমবির হাত কতদূর বিস্তৃত তা জানতে তাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডগুলোর খতিয়ান দেখলে বুঝা যাবে।
১. পিলখানা হত্যাকাণ্ড। দেশের সুশৃংখল একটি বাহিনীতে ঢুকে জেএমবি সে বাহিনীর অফিসারদের নৃশংসভাবে হত্যা করলো। অথচ আমাদের র্যাব-পুলিশ তাদের প্রতিদিনই গ্রেফতার করে যাইতেছে। জঙ্গিরা দেশরক্ষা বাহিনীতে ঢুকে গেলেও কেউ বুঝলো না।
২. বসুন্ধরা অগ্নিকাণ্ড। নাশকতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে না। তার মানে কেউ যদি বলে, এটা জেএমবি ঘটাইছে তাহলে কেউ প্রতিবাদ করবে না।
৩. অর্থনৈতিক মন্দা, অসন্তোষ, সরকারের অদক্ষতা, আদম ব্যবসায়ীদের প্রতারণার কারণে মালেশিয়া সহ নানা দেশ থিকা শ্রমিক দেশে ফেরত আসেতেছে। খবরে জানলাম, এর পিছনের স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির মদদ পাওয়া যাইতেছে। আর একটু এগিয়ে বলা সম্ভব, এটা জেএমবির বৈদেশিক উইংয়ের কারসাজি।
৪.ছাত্রলীগের সন্ত্রাসে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রক্তাক্ত। অনেকগুলো বন্ধ, বাকীগুলা বন্ধ হওয়ার পথে। ধারণা করা যায়, জেএমবি ছাত্রলীগের মধ্যে ঢুকে নাশকতা ঘটিয়ে দেশকে পঙ্গু করে দেয়ার জন্য এরকম করতেছে।
৫. সচিবালয়ে সচিবরা কাজ করেতেছে না। দেশ পিছিয়ে পড়ছে, প্রশাসনিক কাজকর্মে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কেউ যদি একেও জেএমবির কাজ বলে তাইলে কিছু করার নাই।
এখন থেকে কেউ দোষ করলে নন্দঘোষের ওপর না চাপিয়ে জেএমবির ওপর চাপানো যাবে।
জেএমবির হাত থেকে দেশ রক্ষার কোনো বিকল্প নাই।
আসুন আমরা জেএমবিকে প্রতিরোধ করি। জেএমবির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলি।

Sayeed Jubary

Ojhor Srabon

Mohammad Arju
University of Dhaka

Rifat Hasan

Tamal Tml

Nuruzzaman Manik

Niaz Morshed Chowdhury
TCD

Sohel Hasan

Faruk Wasif

Puspo Kona


Kalo Kali Das

liked this

Monday, June 14, 2010

পাকিস্তান

Sunday, March 15, 2009 at 3:14pm on facebook
পাকিস্তানের প্রাক্তন এক সেনাকর্মকর্তা কইছিলেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নিজের দেশ দখলের ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত। কেমনে সহজে নিজের দেশ দখল করা যায়, সে দখলকে দীর্ঘস্থায়ী করা যায় তা যে কেউ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কাছ থিকা শিখতে পারে। ফৌজি কর্মকর্তারা দেশ শাসন করতে করতে পাকিস্তানকে হাটু গেড়ে হাটাইতে বাধ্য করতেছেন। যারা দেশ চালায় তাদের বুদ্ধি যদি হাটুতে থাকে তাইলে দেশ কেমনে দাড়ায়ে থাকবে?

পাকিস্তান হইলো একটা অগ্নিকুণ্ড যে কেউ সেখান থেকে আগুন নিয়া নতুন আগুন তৈয়ার করতে পারে। জেনারেলদের স্বল্পবুদ্ধিতে দেশটা একদা বড় খেলোয়াড়দের ক্রীড়াক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহৃত হইতো। স্নায়ুযুদ্ধে খেলে খেলে পাকিস্তান স্নায়ু শক্ত করছে। তালেবানদের দিয়া সোভিয়েত ঠেকাইতে গিয়া পাকিস্তান নিজেই তালেবান হয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিয়া সেই যুদ্ধরে নিজের ঘরে টাইনা আনছে।

কেউ যদি জিগায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কমান্ড কার হাতে তাইলে সে প্রশ্নের উত্তর হবে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নিজেই নিজেকে চালায়। বিচারবিভাগের চেয়ে শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীই পাকিস্তান, পাকিস্তানই সেনাবাহিনী। সরকার চলে সেনাবাহিনীর কমান্ডে। তবে মাঝে মাঝে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে কমান্ড করতে পারে। যে জওয়ানরা নিজের দেশের মুরুব্বীদের কথা শুনে না, বুঝতে হবে তাদের মুরুব্বী বাইরে থাকে।

পাকিস্তান কি ইহজন্মে এই সেনাচক্র থেকে বের হইতে পারবে? না। হাটুতে ভর দিয়া চলতে চলতে দেশটা শীঘ্রই শুয়া পড়বে। পাকিস্তানই হবে সামনের আফগানিস্তান। টুকরা টুকরা এই দেশটায় একসময় ন্যাটো আর জাতিসংঘ খেলা করবে।

আল্লাহতালার অশেষ নিয়ামতে আমরা পাকিস্তান হতে মুক্তি পাইছি। তবে, কেউ কেউ বলে বাংলাদেশ নাকি দেখতে পাকিস্তানের জমজ ভাইয়ের মতো।

আমি একজোড়া জমজ ভাইকে চিনি। যাদের একভাই কাইন্দা উঠলে অন্য ভাইও কান্দে। আজব ব্যাপার। বহু আগে উদয়ন পত্রিকায় এই ধরনের জমজদের ছবি দেখছিলাম। কার সাথে কার কী কারণে মিল সেইটা বুঝা বড় দায়। আসেন আমরা পাকিস্তানের জন্য খাস দিলে দোয়া করি।
Fatema Abedin Nazla

Sumon Rahman

Omar Sharif Pallab
Birmingham City University

Syed Amiruzzaman

Odhora Mira


Hasan Murshed

liked this note.

অদক্ষতা ও অযোগ্যতা

Saturday, March 14, 2009 at 8:28pm, Facebook
বাংলাদেশ অঞ্চলের অধিবাসীরা নাকি ১৯৭১ সালের আগে ইতিহাসে একবারও নিজেদের শাসন করার সুযোগ পায় নাই। বাইরে থেকে আইসা লোকেরা শাসন এনাদের কইরা দিয়া গেছে। এনারা খালি একের পর এক শাসক বদলাইছে। এই বিষয়ে অবশ্য সক্রিয় ভূমিকা নিছেন বইলা ইতিহাসে দেখা গেছে। বিধাতা কী কারণে এনাদের আত্মশাসনের তৌফিক দেন নাই তিনিই জানেন। জ্ঞানীরা বইলা থাকেন, ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলাদেশই নাকি প্রথম জাতিরাষ্ট্র। আরও বিস্ময়কর ঘটনা হইলো এই দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মে মুসলমান ভাষায় বাঙালি।

বাংলাদেশ বর্তমানে এই সংখ্যাগরিষ্ট বাঙালি আর মুসলমান মিলে শাসন করতেছেন। এনাদের নিয়া বিস্তর গবেষণা হইছে। বাঙালি ও মুসলমান শাসকশ্রেণীর ব্যবসা, শাসন, জনপ্রশাসন, বিদ্যাশিক্ষা, প্রতিষ্ঠান গঠন, রাষ্ট্রপরিচালনা, দেশরক্ষার কোনো ইতিহাস আছে কি না জানা যায় নাই। থাকলে ভাল। জানতে চাই।

সম্প্রতি আমার মনে হইতেছে বিগত ৩৮ বছরের স্বাধীনতায় এনারা এইসব বিষয়ে অদক্ষতা ছাড়া আর কিছুই তৈয়ার করতে পারেন নাই। বাঙালি ও মুসলমান শাসকশ্রেণী একাদিক্রমে সবক্ষেত্রেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়া বর্তমানে ধরা খাওয়ার পর্যায়ে চইলা যাইতে নিছে।

কিছু দিন ধইরা দেখতেছি।
১. সিভিল সমাজ আর মিলিটারি সমাজ মিলে সহমতের রেজিমে দেশ শাসন কইরাও দেশটার কোনো উন্নতি করতে পারলো না। দেশ পিছাইলো। গণতন্ত্র দূরের কথা, এত সহমতের মধ্যে এনারা স্টেট অফ এমারর্জেন্সি দিয়া শেষ দিন পর্যন্ত নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেন।
২. দাম বাড়লো, বাজারে আগুন লাগলো হেনা তেনা নানা কিছু প্যাঁচানো হইলো কিছুতেই কিছু করা গেল না।
৩. সিডর হইলো দেখা গেল এইসব মোকাবিলায় আমাদের অদক্ষতা প্রচণ্ড। অথচ মাইনষে কয় ঘূর্ণিঝড় বন্যা জ্বলোচ্ছাস এইখানে ধর্মপালের আমল থিকা চলতেছে। কিন্তু কোনো প্রস্তুতি এই দেশে রেওয়াজ হিসাবে দাঁড়ায় নাই।
৪. এনটিভি পুড়লো, বসুন্ধরা পুড়লো লোকে দাঁড়ায়া বইসা আগুন দেখলো। আমি দেখলাম অদক্ষতা আর অযোগ্যতা।
৫. বিডিআর-এ হত্যাকাণ্ড হইলো সবাই দেখলো ষড়যন্ত্র আমি দেখলাম অদক্ষতা আর অযোগ্যতা।
৬. দেশের বাইরে শ্রমিকরা বিপদে আছে। এইখানেও অদক্ষতা আর অযোগ্যতা।
লিস্ট বড়বে ছাড়া কমবে না।

ইনডিয়া করছে, পাকিস্তান করছে, আম্রিকা করছে, ব্রিটেন করছে বইলা আমরা উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপাইতে পারবো তাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু করছে যে আমাদের অদক্ষতা আর অযোগ্যতার কারণে এইটা কবে আলোচনার মধ্যে আসবে?

Omar Sharif Pallab
Birmingham City University

Rifat Hasan

Nurunnaby Hasive
BdOSN

Labanya Prava

A.N.M. Mominul Islam Mukut

Niaz Morshed Chowdhury
TCD

Mohammad Arju
University of Dhaka

Puspo Kona

liked this.

Thursday, July 24, 2008

এনজয় ডুয়িং নাথিং

যারা আমার ফেসবুকের বন্ধু তাদের উদ্দেশে আমার সাম্প্রতিক স্টেটাস হিসাবে আমি উপরের লাইনটা ঝুলায়ে দিছি।
ফেসবুক প্রশ্ন করে : হোয়াট আর ইউ ডুয়িং রাইট নাউ?
আমি এই লাইনটা লেখার পর আমার স্টেটাস দাঁড়ালো : মাহবুব ইজ এনজয়িং ডুয়িং নাথিং।
কথাটা লিখার পর একটু মজা লাগলো। শান্তি পাইলাম। তৎক্ষণাত মনে পড়লো না কথাটা আমি কই পাইছি। কিন্তু মনে হইলো কথাটা আমার নিজের না। কোথাও পাইছি। হঠাৎ কাল টিভি দেখতে গিয়া দেখি একটা বিজ্ঞাপনে কইতেছে, এনজয় ডুয়িং নাথিং। কীসের বিজ্ঞাপন তৎক্ষণাত বুঝতে পারলাম না। হবে কোনো ব্যাংক বা ইন্সু্রেন্স কোম্পানির বিজ্ঞাপন। কিছু না করাটাকে এনজয় করতে বলতেছে। যা কিছু করবে ওরা।
আপনি বসে থাকুন।
যাই হোক, কথাটা খুব মনে ধরে। কিছু না করার মধ্যেও তাইলে এনজয় করার কিছু আছে? হয়তো যে কাউকে কথাটা মুহূর্তে টেনে নেবে। আকৃষ্ট করবে। আমাকেও করছে।
এই আকর্ষণ করার একটা ইতিহাস আছে।
আমার প্রিয় কবি এমে সেজায়ারের দেশে ফেরার খাতার কথা বলছিলাম তার মৃত্যু প্রসঙ্গে। আমার খুব প্রিয় কবিতা। বহু মানুষের প্রিয় কবিতা। সেখানে উনি বলেছিলেন (হুবহু মনে নাই, বানায়া কইতেছি),
যারা জলকে বশ মানিয়ে তৈরি করেনি বিদ্যুত,
যারা আবিষ্কার করেনি কোনো গ্রহ
দিগন্তকে উন্মোচিত করেনি
নতুন মহাদেশের খোঁজে পরিচালনা করেনি কোনো অভিযান
পর্বতের সুউচ্চ শিখরে যারা বিজয়পতাকা ওড়ায়নি
আমি তাদের জয়গান গাইছি।

কথাগুলা খুব মনে ধরেছিল। যা কিছু নায়কোচিত, যা কিছু গর্বের বলে বিবেচিত তার বাইরের বিষয়গুলারও যে জয়গান গাওয়া সম্ভব তা আমার আইডিয়াতেই আছিল না। এমে সেজায়ারই প্রথম আইডিয়াটা মাথায় ঢোকান। বুঝতে পারি, জগতে কিছু আবিষ্কার না করা, কোনো নতুন অভিযান পরিচালনা না করা, কোনো জাতিকে পদানত না করার মধ্যেও মাহাত্ম্য আছে।
২০০৬ সালের পয়লা অক্টোবর নিউ ইয়র্ক টাইমস পড়তে আছিলাম। হঠাৎ একটা শিরোনামে চোখ আটকে গেল। টেন ডেজ উইথ অবলোমভ : এ জার্নি ইন মাই বেড। (Click This Link)অবলোমভ মানে জানি না, কিন্তু জার্নি ইন বেড কথাটা মনে ধরলো।
আসলে ইভান গনসারভের একটা উপন্যাসের নাম অবলোমবভ। সেই উপন্যাসের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই লেখক এই দশ দিনের বিছানা-সংগ্রামের কথা তুইলা ধরছেন। গ্রেইট আইডিয়া। পুরা টাসকি খায় গেলাম।
এখন আলস্যে কাটাবার মতো সময় খুব কম মেলে। কিন্তু মাঝে মাঝে কিচ্ছু করতে ইচ্ছা করে না। চোখ মেলে তাকানোর ইচ্ছা পর্যন্ত না। কিংবা চোখ মেললেও বিছানা থেকে নামতে ইচ্ছা করে না। খাবার গরম করে খেয়ে নেওয়ার ইচ্ছাও করে না। একটা সময়ের কথা খুব মনে পড়ে, যখন বাড়িতে বসে খেতাম আর শুয়ে অলস চিন্তা করতাম। কী চিন্তা সেটাও চিন্তা করতাম না। অর্ধ ঘুম অর্ধ জাগরণের একটা চমৎকার সময়ের কথা মনে হইলো নিউ ইয়র্ক টাইমসের লেখাটা পইড়া।
উইকিপিডিয়ায় সার্চ দিলাম। অবলোমভ সম্পর্কে ডিটেইল সংগ্রহের উদ্দেশে।
ইভান গনসারভের অবলোমভ উপন্যাসটি প্রথম প্র্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৯ সালে। উপন্যাসটি রাশিয়ায় ভীষণ জনপ্রিয় হইছিল। এর নায়কসহ বিভিন্ন চরিত্র রাশিয়ান সমাজে অহরহ উদ্ধৃত হইতো।
অবলোমভ উনিশ শতকের রাশিয়ার উচ্চমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি আলস্যভরা। দিনের সামান্য যে কাজ তাও সে বিছানায় শুয়া, সোফায় বইসা করে। জীবনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সে নিতে পারে না। জীবনের কোনো উদ্দেশ্য সম্পর্কে সে নিশ্চিত হতে পারে না। এমনকি আগের মুহূর্তে কী ভেবেছিল তাও মনে করতে পারে না।
আলস্যের এই বিপুল জয়গান সম্পর্কে আমি যে অনবহিত আছিলাম সেইটাই একটা দুঃখের কথা। যাই হউক উইকিপিডিয়ার এন্ট্রিতে (http://en.wikipedia.org/wiki/Oblomov) লেনিনের একটা উদ্ধৃতি পাইয়া যারপর নাই খুশ হইলাম।
১৯২২ সালে ভ. ই. লেনিন কইতেছেন, রাশিয়া তিনটা বিপ্লব করছে, লেকিন এখনও অবলোমভরা রয়া গেছে। নতুন কোনো চেতনা জাগার আগে এইগুলারে ঝাড়েবংশে ঝেটিয়ে বিদায় করতে হবে।

আমরা যারা বিপ্লবে বিশ্বাসী না, কোনো অভিযান, আবিষ্কার যাদের আকৃষ্ট করে না তাদের জন্য আদর্শ চরিত্র অবলোমভ। আশার কথা অবলোমভ শব্দ থিকা অবলোমোভিজম ও অবলোমোভিস্ট শব্দ তৈরি হইছে।
তাই কেউ যখন আমারে জিগায়, আমি কী করতেছি?
আমি কই এনজয়িং ডুয়িং নাথিং।

পুনশ্চ : গুগলে এনজয় ডুয়িং নাথিং সার্চ দিয়া দেখলাম জেনদর্শনেও নাকি জিনিশটা আছে। কেমনে আছে কী আছে কে জানে? অত জানার দরকার কী?

সচলায়তন সংকট : হোয়াট ইজ টু বি ডান?

আজ ২০ জুলাই। ১৫ জুলাই থেকে সচলায়তন সমস্যার উদ্ভব ঘটেছে। ১৫ তারিখ থেকে বাংলাদেশের ইউজার ও ভিজিটররা সচলায়তন সাইটটিতে সরাসরি ঢুকতে পারছেন না। এই ঢুকতে না পারা বাংলা ব্লগ কমিউনিটিতে একটি অভূতপূর্ব পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। নানা জল্পনা-কল্পনা পল্লবিত হয়েছে। বোঝা যায়, বাংলা ব্লগ কমিউনিটি এখন বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে থাকার বড় একটি কমিউনিটি। এ ইস্যুতে ব্লগার মুখ্যত ত্রিধাবিভক্ত হয়ে গেছেন।
১. একভাগ বিশ্বাস করেন সচলায়তন অঘোষিত কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অষোষিত ব্যানের শিকার হয়েছে।
২. একভাগ মনে করেন, বিটিসিএল এন্ড বা সার্ভার (ব্লু হোস্ট ) এন্ডে কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছে। (http://amarblog.com/sushantaa/2766)
৩. একভাগ মনে করেন সচলাতয়ন কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে পাবলিসিটি তৈরি করার জন্য এই ছদ্মব্যান পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
ব্লগাররা যাই মনে করুক, সত্য হলো, সচলায়তন ১৫ জুলাই থেকে বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি বিচার করে, সচলায়তন কর্তৃপক্ষের ভীত-সন্ত্রস্ত প্রতিক্রিয়া থেকে যা বোঝা যায় তাতে তারা পাবলিসিটি তৈরি করার জন্য এ কাজটি করেছে বলে মনে করা যায় না। মনে করা কষ্টকর। এবং আমাদের সকলের চিন্তাকে অবাক করে দিয়ে যদি তা ঘটে তবে বাংলা ব্লগের ইতিহাসে তা সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি হিসেবে উদ্ধৃত হবে।
সচলায়তন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সার্ভার এন্ডে কোনো সমস্যা নেই। আমার জানামতে, একাধিক বার তারা বিষয়টি কনফার্ম করেছে।
যদি সার্ভার এন্ডে সমস্যা না থাকে তাহলে বিটিসিএল এন্ডে কোনো কারিগরি ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। সুশান্তর পোস্টের যে লিঙ্ক ওপরে দিয়েছি তাতে সচলায়তনের মতো সমস্যায় পড়েছে এমন বহু সাইটের লিঙ্ক তিনি দিয়েছেন।
বিটিসিএল প্রান্তে কারিগরি সমস্যা এবং অঘোষিত ব্যান দুটি প্রসঙ্গের দিকে সকলের নজর এখন কেন্দ্রীভূত। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অসমর্থিত বা নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক যেসব সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাতে স্পষ্ট হয় না যে সচলায়তন ব্যান হয়েছে। কারণ, কোনো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উৎস যদি বলে সচলায়তন ব্যান হয়েছে। তাহলে ধরে নিতে হবে ব্যানের খবর তিনি শুনেছেন বা জেনেছেন। পাশাপাশি স্বাভাবিক কৌতুহল থেকে সবার মনে যে প্রশ্নটি আসে, কেন? সেটি তার মনে আসবে না, এটা বিস্ময়কর। কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলোর কেউই কারণ নির্দেশ করতে পারেননি। অন্তত একটি কারণও কেউ উল্লেখ করেননি। ফলে, খবরটির বর্তমান অবস্থা কী?
''নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, অজানা কারণে অজানা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সচলায়তন সহ জানা-অজানা একাধিক সাইট অঘোষিত ব্যানের শিকার হয়েছে।'' আর যাই হোক, খবর হিসেবে এটি কতটা আবেদন সৃষ্টিকারী তা যে কেউ বিবেচনা করতে পারবেন।
এছাড়া কিছু পরিস্থিতিগত কারণে ব্যানের বিষয়টি অনেকে বিশ্বাস করতে পারেননি। যেমন :
১. বাংলাদেশে বর্তমানে জরুরি অবস্থা জারি থাকলেও এবং জরুরি অবস্থার মধ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সহ কিছু মৌলিক মানবাধিকার স্থগিত থাকলেও কখনোই মিডিয়ার ওপর অল্প কিছু সময়ের জন্য ছাড়া সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয় নাই।
২. বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো আলাপ-আলোচনা ও আপোসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আপোস-আলোচনার পথটি অনেক প্রশস্ত। ফলে, মিডিয়া জরুরি অবস্থার প্রথম দিকের অবস্থার চেয়ে অধিকতর সাহসের সঙ্গে কথা বলছে।
৩. যেসব মিডিয়ার বেলায় বন্ধ করা হয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে আইনগত ঢালের আড়ালেই সরকার কাজ করেছে। বেআইনিভাবে কোনো মিডিয়াকে বন্ধ করা হয়নি। এক্ষেত্রে কৌশল করা হলেও আইনগত অজুহাত ছিল।
৪. বাংলা ব্লগ এখনও কমিউনিটি হিসেবে ছোট। সচলায়তন তার প্রায় ২০০ ইউজার ও এর ৩ থেকে ৫ গুন ভিজিটর নিয়ে ছোট পরিসরে কাজ করছিল। এই ছোট আকারের কমিউনিটির মতামতকে গ্রাহ্যের মধ্যে না নিয়ে আসাই সরকারের জন্য স্বাভাবিক।
৫. সচলায়তন যদি সরকার-বিরোধী কোনো কাজ করে থাকত তবে স্বাভাবিকভাবে তাদের সতর্ক করাকেই যথার্থ উদ্যোগ হিসেবে ধরা যেত।
৬. নিরুপায় হয়ে ব্যান করার মতো সিদ্ধান্তে উপনীত হলে, উপযুক্ত কারণ নির্দেশ করতে না পারার মতো দুর্বল অবস্থানে সরকার আছে বলে মনে হয় না।
৭. সরকার বা সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষ সচলায়তনের ভয়ে অঘোষিত ব্যান আরোপ করেছে এটা অধিক চিন্তা বলে মনে হয়।

তারপরও অনেকে মনে করেন, সচলায়তন অঘোষিত ব্যানের শিকার হয়েছে। তাদের কাছে প্রশ্ন সচলায়তন কেন ব্যান হবে? নানা পোস্টে ও আলোচনায় যেসব কারণ উঠে এসেছে সেগুলোকে এক সাথে দেখা যেতে পারে।
১. সচলায়তনের ব্যানারে হায়েনার ছবি ব্যবহার করে বলা হয়েছিল বাংলাদেশে আমরা ভাল আছি। নানা সময়ে ব্যানারে এ ধরনের কনটেন্ট ইউজ করা হয়েছিল।
২. টাকা তুলে রাজাকার মারার খুনি জোগাড় করার মতো উদ্যোগ নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে।
৩. সচলায়তন একটি ক্লোজড ফোরাম। খুব বিচার-বিবেচনা করে সেখানে ব্লগার নেয়া হয়। লেখার মানের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা এক্ষেত্রে বেশি কাজ করে। ফলে, সরকারি কর্তৃপক্ষের ধারণা হতে পারে যে, এটি একটি ক্লোজড ও রেজিমেন্টেড গ্রুপ।
৪. কাকতালীয়ভাবে সচলায়তনের মডারেটর, উদ্যোক্তা ও কর্তাব্যক্তিরা সবাই দেশের বাইরে থাকেন। সরকারি কর্তৃপক্ষ মনে করতে পারে নোটিশ দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।
৫. সেখানে জামাত ও রাজাকার বিরোধী লেখা প্রকাশ করা হয় নিয়মিত, ফলে কর্তৃপক্ষের জামাত-পছন্দ কেউ এটি প্রভাব খাটিয়ে বন্ধ করাতে পারেন।
৬. একই মতাদর্শের লোকজন একত্রিত হয়েছে বলে সেখানে সরকার-বিরোধী লেখা বেশি প্রকাশিত হয়। এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের লেখা ছাপা হয় না। বা, কোনো কর্তৃপক্ষ, ব্যক্তি সেখানে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পান না। ফলে, একতরফা এই মিডিয়া নিয়ে সরকারের মধ্যে সংশয় তৈরি হতে পারে।

কিন্তু আমার মতো ব্লগারদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, সচলাতনের মধ্যে ছেলেমানুষী আছে, ছেলেমানুষী আবেগ আছে, ম্যাচুরিটির অভাব আছে কিন্তু তারা কোনো রেজিমেন্টেড গ্রুপ না। কাকতালীয়ভাবে তারা সবাই বিদেশে অবস্থান করলেও দেশে তাদের শেকড় আছে। ফলে, দেশের আইন কর্তৃপক্ষের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতাও আছে। এ কয়দিনে তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে সেটি স্পষ্টভাবে বোঝা গেছে।
সচলায়তনের প্রতি ব্লগার হিসেবে আমাদের অভিযোগ অনেক। তাদের নীতি-পদ্ধতি আমাদের পছন্দ নয়। সেখানে যে মতপ্রকাশের পরিস্থিতি বিদ্যামান তাকে আমরা মতপ্রকাশ মনে করি না। তারপরও আমাদের মত হলো, সমাজে ভিন্নমতের অবস্থান আমরা চাই। সচলায়তন ভুলভাবে যে চর্চা করছে সেটা চালিয়ে যাওয়ার অধিকার তাদের আছে।
সরকার যদি সচলায়তনের কোনো ব্যাপারে আপত্তি করে, তবে সরকারের উচিত ফোরামটির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া। অথবা এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তাদের কাছে প্রকাশ করার জন্য পাঠানো।
যদি গুরুতর আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেটি নিষ্পন্ন করা।
কোনো ব্যানের ঘটনা বাস্তবায়ন করা হলে সেটি ঘোষণা দিয়ে করা। যথাযথ কারণটি উল্লেখ করা।
কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অঘোষিত ব্যান কাম্য নয়।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, মতপ্রকাশের অধিকার, ইন্টারনেট মাধ্যমে প্রসার ও সমাজে বহুমতের লালন-পালনের ব্যাপারে এই সরকার মনোযোগি এবং বর্তমান গ্লোবাল পরিস্থিতিতে তারা সংবাদ ও গণমাধ্যমের ওপর এমন কোনো সেন্সরশিপ আরোপ করতে চান না, যা আমাদের দেশকে একটি বদ্ধমতের দেশ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়।
ফলে, সরকারি কর্তৃপক্ষ অঘোষিত ব্যান উঠিয়ে নেবে বলেই আমাদের আবেদন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা বিশ্বাস করতে চাই, এটি কোনো অঘোষিত ব্যানের ঘটনা নয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো অঘোষিত ব্যানের পরিস্থিতি নয়। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, এটা একটা কারিগরি ত্রুটিমাত্র। শীঘ্রই এই ত্রুটি সারিয়ে ফেলা হোক। সচলায়তন নিয়ে যে অভূতপূর্ব ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে তা পল্লবিত হওয়ার আগেই মিটিয়ে ফেলা হোক।

Thursday, January 17, 2008

An interview with Selim Al Deen, recently passed Bangladeshi playright

১৪ জানুয়ারি ২০০৮ ঢাকার ল্যাবএইড হসপিটালে মারা গেলেন নাট্যকার, লেখক ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর সেলিম আল দীন। তার জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট, ফেনী জেলার সেনেরখিলে। তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। যৌবনে তিনি ঢাকা ও টাঙ্গাইলে ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেয়ার পর সেখানেই আমৃত্যু বসবাস করেছেন।
ইউনিভার্সিটি জীবন থেকে সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। পথনাটক আন্দোলনের মাধ্যমে নাটক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। নাটক লেখার পাশাপাশি গড়ে তোলেন নাটকের দল ঢাকা থিয়েটার। মূলত তার ও নাসির উদ্দিন ইউসুফের উদ্যোগে স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের বিখ্যাত নাট্যদল ঢাকা থিয়েটার। দেশীয় ধারার নাটক চর্চার উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ শুরু করে ঢাকা থিয়েটার বাংলাদেশের নাট্য জগতে নতুন একটি গতি তৈরি করেছিল। তৈরি করেছে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকুশলী। সেলিম আল দীন পরবর্তী নাট্যকারদের অনেকেই নাটকের বিষয় ও আঙ্গিকের দিক থেকে সচেতনভাবে তার অনুসারী হয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগটি প্রতিষ্ঠিত হয় তার উদ্যোগেই। বাংলাদেশে ইউনিভার্সিটি পর্যায়ে এটিই নাট্য শিক্ষার প্রথম উদ্যোগ। দেশীয় আঙ্গিকের নাটকের ধারা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে গঠন করা হয় গ্রাম থিয়েটার। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো নাট্য চর্চায় গ্রাম থিয়েটার বেশ প্রভাব ফেলেছিল। সেলিম আল দীনের প্রায় সব নাটক মঞ্চস্থ করেছে ঢাকা থিয়েটার। গ্রাম থিয়েটারের শাখাগুলোও তার বিভিন্ন নাটক মঞ্চায়িত করেছে। বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির নাট্য ল্যাবরেটরিতেও তার নাটক অভিনীত হয়েছে। কলকাতার বহুরূপী থিয়েটার তার একটি নাটক মঞ্চস্থ করেছে। নাটকগুলোর মধ্যে কীত্তনখোলা, চাকা, হাতহদাই, কেরামতমঙ্গল, যৈবতী কন্যার মন, মুনতাসীর, চাকা, প্রাচ্য, বনপাংশুল বিশেষভাবে আলোচিত। ঢাকা থিয়েটার সবশেষে মঞ্চস্থ করেছে তার নিমজ্জন নাটকটি। কথানাট্য, পাচালি প্রভৃতি আঙ্গিক চর্চার পাশাপাশি তিনি প্রবন্ধ, গবেষণা প্রবন্ধও লিখেছেন।
মঞ্চ নাটক ছাড়াও বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য প্রচুর টিভি নাটক লিখেছেন তিনি। মুভির জন্য চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন। তার নাটক চাকা ও কীত্তনখোলা থেকে মুভি তৈরি হয়েছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী ইউনিভার্সিটি, ইনডিয়ার বিশ্বভারতী ও যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে তার নাটক ও নাট্য বিষয়ক গবেষণা পড়ানো হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ সময়ের অপ্রতিরোধ্য নাট্য প্রতিভা সেলিম আল দীন। স্বদেশ, স্বকাল, ইতিহাস ও সময়ের নিরন্তর প্রবাহের ভেতর তার অন্বেষণকে সাহিত্যের মানুষেরা নিরন্তর শ্রদ্ধা করে এসেছে। জীবিত অবস্থায় লেখা, লেখার জন্য সাধনা ও সার্বক্ষণিক শিল্পবোধ তরুণ লেখকদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। নাট্য আঙ্গিকের ক্ষেত্রে, নাট্য গবেষণার মোড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এবং নাট্যের বিষয় ও ল্যান্ডস্কেপের বিশালত্বের ক্ষেত্রে তার কৃতি ও কৃতিত্ব ব্যাপক। মানব চরিত্রের গভীর ও ব্যাপক অনুসন্ধান তিনি লোকমানসের ভেতর করেছেন। কিন্তু গুটিকয়েক গতানুগতিক একাডেমিক গবেষণা ছাড়া সেলিম আল দীনকে মূল্যায়নের প্রচেষ্টা সচরাচর দেখা যায় না। মৃত্যুর পর লেখক সেলিম আল দীনের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিচয়কে তার লেখার মধ্য দিয়ে অন্বেষণ করার নতুন সম্ভাবনা হয়তো তৈরি হয়েছে। এতোদিন না হলেও আশা করা যায়, এখন সম্ভব হবে তার লেখার যথার্থ নান্দনিক বিচার।
২০০০ সালের আশ্বিনের রৌদ্র ঝলসিত এক দুপুরে সেলিম আল দীনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন কবি, গল্পকার ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির দর্শন বিভাগের শিক্ষক রায়হান রাইন, নাট্যকার ও গবেষক সাইমন জাকারিয়া এবং মাহবুব মোর্শেদ। এ সাক্ষাৎকারটি যখন নেয়া হয় তখন তিনি রুক্নবর্ণ নামে একটি নাটক লিখছিলেন। তিনি বলতেন এটি আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তিমূলক একটি লেখা। রুক্ন শব্দের অর্থ সোনা। প্রায় দেড়শ পৃষ্ঠা লেখার পর লেখা বন্ধ করে দেন তিনি। বছর খানেক পর সেই একই আইডিয়া নিয়ে নতুন আরেকটি নাটক লেখা শুরু করেন। নাটকটির নাম নিমজ্জন। নিমজ্জন লেখার আগে পরে তিনি আরেকটি নাটক লেখার কথা বলতেন। নাটকটির নাম দিয়েছিলেন ময়ূরযান। নিমজ্জন লেখার পরবর্তী সময়গুলোতে তিনি ধাবমান, স্বর্ণবোয়ালের মতো নাটক লিখলেও ময়ূরযান আর লেখেননি।
সাক্ষাৎকারটির বর্ণনা দিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ।


নিমজ্জন ও রুক্ণবর্ণ
‘রুক্ণবর্ণ লেখা সংক্রান্ত একটা প্রশ্ন দিয়েই শুরু করতে চাই। সে সময়ে আমি আপনার সঙ্গে ছিলাম। আমার প্রশ্ন হলো, একটা সময়ে এসে আপনি রুক্ণবর্ণ লেখা বন্ধ করলেন এটা কোন কারণে?’ আমি প্রশ্ন করি।
সেলিম আল দীন কথা শুরু করেন, ‘আমার মনে হয় লেখক জীবনের একেকটা পর্বে একজন লেখককে বাধ্য হতে হয়, এটা অনিবার্য, এটা লিখতে হবে আমাকে। সে তাগিদটা যখন প্রবল একটা আকাশের মতো হয়ে যায়, প্রবল হয়ে ওঠে তাগিদটা, তখন নিশ্চিতভাবে একজন লেখক লিখতে বাধ্য হন। রুক্ণবর্ণের ক্ষেত্রে বলা যায়, এটি আমার সবচেয়ে কাছাকাছি আত্মজৈবনিক লেখা। যে কোনো লেখাই এমনকি পৃথিবীতে যেসব লেখাকে ডিটাচড বাই ইমপারশিয়াল আর্টস যেগুলোকে আমরা বলি, সেগুলোও এক ধরনের আত্মজৈবনিকতা আচ্ছন্ন। সেটি বোঝার উপায় নেই। কারণ লেখক যা কিছু ভাবেন- সেটা তার জীবনের মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করেন বলেই ভাবেন, সে অর্থে এটা তার জীবনেরই অংশ। কাজেই ইডিপাস বলি বা আইসখলুসের নাটক যদি আমরা ধরি- যদিও তাকে ডিটাচড মনে হচ্ছে অন্যের কাহিনী তবু তা আত্মজৈবনিক।’
‘এটা কি চিন্তার কারণে হয়’ সাইমন জিজ্ঞেস করলেন।
'না। এটা হয় অংশগ্রহণের কারণে। ওটা এতো বেশি সত্য হয়ে যায়- যে বোধটা তার ভেতর উদ্ভূত হলো সে বোধটা সে এতোটা প্রচ- শেয়ার করে যে ওটি সে কারণে একটি প্রচ- লেখা হয়ে যায়। অসাধারণ লেখা হয়। অসাধারণভাবে শেয়ার করার কাজটি তার জীবনের অংশে পরিণত হয়। হতে পারে সেটা ইডিপাস, হতে পারে সেটা মিডিয়া, ইলেকট্রা, ওয়েস্তেস কিংবা হ্যামলেট। এভাবে এক ধরনের দূরবর্তী আত্মচারিতা কিন্তু ওর মধ্যে ঘটে। যদিও আমরা সেটা সহজে খুজে পাই না। রুক্নবর্ণ কিন্তু আমার অন্যান্য নাটকের তুলনায় অনেক বেশি কাছের। আমার ভেতরে শিল্পের উত্থান-পতন, আমার অগ্রসরমানতা, আমার কালের গহ্বরগুলো, আমার পতন, দুর্বলতা এগুলো মিলিয়ে একটা সম্পূর্ণ আমির দিকে যাত্রা শুরু। সেজন্য আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, অবিরল একটা ক্রুশ কাঠ কাধে নিয়ে চলেছে অগম্য পথে, কালের পথে, সময়ের পথে ভবিষ্যতের দিকে, কিংবা তার গন্তব্যে। সুতরাং অন্যান্য লেখার চাইতে রুক্নবর্ণ নিশ্চিতই আমার জীবনের কাছাকাছি লেখা হয়ে ওঠে।'
'রুক্নবর্ণে আপনার অনেক স্বীকারোক্তি আছে। লেখক হিসেবে মানুষ হিসেবে' আমি মন্তব্য করি।
'একটা আত্ম উপলব্ধির ব্যাপার ঘটে। আমার মনে হয় সব লেখকেরই নিজস্ব আত্মউপলব্ধির একটা চূড়ান্ত জায়গা তৈরি হয় সেটি বোধহয় চল্লিশের পরে পঞ্চাশের মধ্যে ঘটে কিংবা তারও খানিক পরে ঘটতে পারে। কিন্তু ঘটে যায়। এ আত্মউপলব্ধিটা কোনো না কোনো লেখায় ধরা পড়ে। আমরা টলস্টয় সম্পর্কে জানি যে, আত্মউপলব্ধির চূড়ান্তে তার উচ্চারণগুলো ঋষিতুল্য, সন্ততুল্য হয়ে যায়। আমরা এও জানি যে, রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলিতে এক বিশাল ঈশ্বরকে আবিষ্কার করেন, রৌদ্রে, শরতে, বর্ষায়, সভ্যতার সংঘাতে, নানাভাবে ঈশ্বরের লীলায় তার চিত্ত দোলে। দুলে ওঠে। সব লেখকেরই একটা আত্মজৈবনিকতার অংশ থাকে তার শিল্পের মধ্যে। চিত্রকলায়ও তাই।'
'এই লেখাটা তাহলে বন্ধ করলেন কেন?' বললেন রায়হান রাইন।
'প্রশ্নই ওঠে না। লেখাটি রাফলি শেষ হয়েছে, কমপ্লিট করার অপেক্ষায় আছি। ধরে নিচ্ছি, আমাদের শিক্ষার্থীরা তাদের কোনো একটি পরীক্ষায় রুক্নবর্ণের অংশবিশেষ অভিনয় করবে। আমার মনে হয় রুক্নবর্ণে আমার টোটাল নির্মিতি এখনো পেকে ওঠেনি। কিন্তু কাজটা শেষ হয়েছে। এটা অনেকটা দিওনুসিসের মতো যে, জিউসের থাইয়ের মধ্যে অপরিপক্ব ভ্রুণটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হচ্ছে। কাজেই এটা আমার থাইয়ের মধ্যে কেটে রেখে দিয়েছি এবং শিগগিরই সেটি ভূমিষ্ঠ হবে। আমার ঊরু থেকেই।
ভ্রুণ প্রসঙ্গটি ধরে সাইমন প্রশ্ন করলেন, 'ভ্রুণ প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল তখন আরেকটি প্রশ্ন করি। আপনার নাটকে ভ্রণ প্রসঙ্গটি একটি বিশাল বিস্তৃতি নিয়ে দেখা দেয়। কেরামতমঙ্গলে আমরা এটা দেখি, বনপাংশুলে দেখি। এটা কেন বারবার আসছে?'
'ভ্রণ তো জীবনের একেবারে সূচনা। আমাদের এই অভিশপ্ত পৃথিবীতে এই জন্মটাই অভিশপ্ত হয়ে ওঠে। সেটি হওয়ার কথা নয়। এটি বৃক্ষের মতো, নতুন সজীব কুড়ির মতো, একটা হিল্লোলিত সময়ের ফসল হওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে ভ্রণটা আমাদের এখানে অভিশপ্ত হয়ে ওঠে, আমাদের এই নরকবেষ্টিত সমাজ রাষ্ট্রব্যবস্থায়। সেই হিসেবে ভ্র'ণ তো যে কোনো কবিরই একটা অন্বেষণের বিষয় হতে পারে। উদ্দীপনার বিষয় হতে পারে। কারণ আমি যখন কবিতা লিখছি, সেটিও কিন্তু ভ্রণ অবস্থায় থাকছে, অঙ্কুর অবস্থায় থাকছে। মানবজন্মের ক্ষেত্রে এটি তো আরো দৃশ্যমান। আমার ব্যক্তিগত সাফারিংয়ের ব্যাপার হলো যে, আমার প্রথম সন্তানটি অপরিপুষ্ট ভ্রণ হিসেবে জন্মগ্রহণ করে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। এই সময় নাসির উদ্দিন ইউসুফেরও একটি বাচ্চা অকালে মারা যায়। এই সময়ে আমার হঠাৎ মনে হলো, এমন একটি ভ্রাম্যমাণ চরিত্র হতেই পারে, যে জীবনে এই ভ্রণ বিনষ্ট দেখছে আর আর্তনাদ করছে। সেখান থেকে সামাজিক-রাষ্ট্রিক বিষয়ের মধ্যে এটাকে স্থাপন করলাম। তদ্দিনে মাদার টেরেসা ভ্রণ বিনষ্টির বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন শুরু করেছেন সারা পৃথিবীতে। আন্তর্জাতিক এ ঘটনাটাও আমাকে ভাবিয়ে তোলে। আমার ইচ্ছা ছিল এটি মাদার টেরেসার সামনে অভিনীত হোক। দেখলে তিনি অবশ্যই খুশি হতেন। '

না লেখা নাটক ময়ূরযান
মানব ভ্রণ থেকে লেখা ভ্রণ প্রসঙ্গে আসি। আপনার সঙ্গে যখন প্রথম পরিচয় হয় তখন থেকে আপনি একটা লেখার প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন সেটা ‘ময়ূরযান’। ময়ূরযানের কথা আপনি ঘুরেফিরে অনেক সময় বলেছেন। লেখার ভ্রণ নিয়ে লেখক যখন তিন-চার বছর থাকেন সেই অনুভূতিটা কেমন? ময়ূরযান লেখার এই যে ভার, আইডিয়ার যে ভার, এই বিষয়টা ব্যাখ্যা করেন। বললাম আমি।
বিষয়টা আমি একটা প্রতিতুলন্যাস করতে পারি। ডেভিলস হাউস বলে একটা উপন্যাস আছে, দস্তয়েভস্কির। আলবেয়ার কামু এটা পড়েন এবং এতোটা পছন্দ করেন যে প্রতি মুহূর্তেই তিনি ভাবছিলেন এর একটা নাট্য রূপ দেবেন। বহু বছর পরে তিনি দি পজেসড বলে একটা নাটক লিখলেন। এখন এই লেখার ব্যাপারটি হলো যে আমি একটা ছাচ বা একটা বোধে উপনীত হয়েছি। ময়ূরযান নিয়ে আমার চিন্তাটা ৬-৭ বছর হয়ে গেল। যৈবতী কন্যার মন ও হরগজ লেখার পর আমার মনে হয়েছিল আমি দ্রুত এটা লিখে উঠবো। একদিন বৈশাখের রাতে অকান্ত বৃষ্টিতে একা একা ভিজেছি ইউনিভার্সিটির রাস্তায়। কেউ জানে না। ইউনিভার্সিটি তখন বন্ধ। এক সঙ্গী নিয়ে, হাতে ছাতা। যদি কেউ দেখে যে স্যার এভাবে বৃষ্টিতে রাতে হাটছেন। বিষয়টা বর্ষাকাব্য হবে। যেমন শরতের ওপর একটা নতুন লেখা লিখছি। শরৎ সম্ভোগ এই ধরনের বিষয় হবে। নামটা এখনো ঠিক করিনি। ঋতু নিয়ে আমার প্রচ- একটা আবেগ আছে। এবং সভ্যতা নিয়েও আমার একটা আবেগ আছে। সেটারই একটা ক্রিয়েটিভ রূপ আমি হয়তো ময়ূরযানে তুলে ধরবো। আমার লেখায় দেশকাল সচেতনতাটা থাকে কিন্তু তার মুখটা ফেরানো থাকে সভ্যতার দিকে। হরগজের কথা বলতি পারি, ওটি কোনো বিশেষ অঞ্চলের ঘটনা বটে, আবার একেবারে বিশেষ অঞ্চলের ঘটনাও নয়। সুইডিশ একটা পত্রিকায় এর অনুবাদ পড়ে সমালোচক লিখছেন যে, এটি কসোভোর গণহত্যা স্মারণ করিয়ে দেয়। লেখাটা (ময়ূরযান) লিখছি না, কিন্তু কখনো কখনো মনে হয় লেখাটা হয়ে গেছে। এ রকম একটা ইলিউশনেও আমি মাঝে মধ্যে ভুগি।
এই যে লেখাটা শেষ হলো না, লেখাই হয়নি আদৌ। এর একটা দহন আছে তো। লেখক হিসেবে সেই ফিলিংসটা কেমন? প্রশ্ন করলাম আমি।
দহন না রীতিমতো, কোনো একটা লেখা লিখতে যেটা করা, মনে হচ্ছে প্রতি মূহূর্তেই আমি একটা ব্যভিচারে লিপ্ত। আমি একটা ভয়ঙ্কর পাপ করছি। ভ্রণ হত্যার মতো ভয়ঙ্কর প্রচ- অপরাধ জন্মায়। লেখককে বোধহয় এটা তাড়িয়ে বেড়ায়, রবীন্দ্রনাথ একটা গানে এ রকম বলেন যে, সুর ভুলে যে ঘুরে বেড়াই কেবল কাজে/ তোমার চোখের ভর্ৎসনা যে বুকে বাজে। সুর ভোলাটা এ রকম যে থিম এলো, বোধটা এলো অথচ তুমি অগ্রসর হচ্ছো না। তখন ওই ভর্ৎসনা কিন্তু নিজের মধ্যে কাজ করে।

প্রাচ্য
‘প্রাচ্য’ নাটকটিকে আপনি বলেছেন স্ট্রাকচারাল এপিক। আমরা যতোটা বুঝেছি এপিক ... রাইন প্রশ্ন শেষ করার পূর্বেই সেলিম আল দীন বললেন,
‘যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে এ বিষয়ে মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, শিবাজি বন্দোপাধ্যায়, নবনীতা দেব সেন এদের সঙ্গে আমার একটা তুমুল বাগযুদ্ধ হয়েছিল। আমি খুব অ্যারোগেন্টলি বলেছিলাম যে আসলে রামায়ণকে আমাদের জাতীয় কাব্য রূপে গ্রহণ করার কোনো উপায় নেই। প্রয়োজনও নেই। তাহলে আমরা ‘বিষাদ সিন্ধু’ অথবা ‘পদ্মাবতী’কে আমাদের এপিক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ধর্ম একটি বিষয় বটে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বাঙালিমাত্রই পাচালি স্ট্রাকচারবটাতে কাব্য রচনা করেছে। সেখানে কিন্তু ধর্মবিভেদ নেই। কনটেন্ট পাল্টে যাচ্ছে, চরিত্রের নাম পাল্টাচ্ছে, ফর্ম কিন্তু পাচালির। কাজেই এই কমননেসটাকে যদি আমরা জাতি বর্ণ নির্বিশেষে গ্রহণ করি, স্ট্রাকচারটাকে যদি ধ্রুব ধরি তাহলে বাঙালির ক্ষেত্রে কৃত্তিবাস থেকে শাহ মুহম্মদ সগীর হয়ে আলাওল থেকে ভারতচন্দ্র পর্যন্ত একটা স্ট্রাকচার এর অধীনে কাজ হয়েছে। কথকতা যতোটা নয়, ততোটা পাচালি। পাচালির এই সর্বব্যাপ্ত রূপটা তাহলে আমরা অ্যাকসেপ্ট করতে পারি। এই স্ট্রাকচারটার অধীনে যেসব কাব্য লেখা হয়েছে সবগুলোরই এপিক ব্যপ্তি আছে। সে জন্যই আমি বলেছিলাম যে স্ট্রাকচারাল এপিক বিষয়টা ভাবা যায় কিনা। সেক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক হীনম্মন্যতায় আমরা ভুগি না আর। কিন্তু তারা বললেন এটার প্রয়োজন কি? তা ছাড়াই তো আমাদের সাহিত্য দাড়িয়ে গেছে নিজের পায়ে। সেটাও সত্যি কথা, কিন্তু কতোখানি নিজের পায়ে সেটা নিজের পায়ের দিকে না তাকালে তো আর বোঝা যায় না।’
‘এই স্ট্রাকচারটা পরিবর্তন না হওয়ার কারণ কি নিম্নবর্গের মানুষের জীবনে খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি এটাই?’ রায়হান রাইনের প্রশ্ন।
‘তুমি যেটা বলেছ সেটা একটা সত্যি ঘটনা। আরো বড় ঘটনা হলো, যখন হাজার হাজার বছর ধরে লাখ লাখ মানুষ তাদের জন্য এ বিষয়টিকে সৃষ্টিশীলতার ধ্রুব পদ্ধতি বলে মনে করছে তখন এটাকে সরায় কে?’
‘শিল্পের ফর্ম তো আবার সমাজের সঙ্গে কো-রিলেটেড। সমাজের যখন পরিবর্তন হয়ে গেছে তখন এটা কিভাবে দাড়াবে?’ বলেন রাইন।
‘বাঙালির টোটাল মানসিকতার ভেতরে এখনো যৌথ পরিবারের ধারণা আছে। ভাঙছে অনেক জায়গায় কিন্তু কতো পারসেন্ট ভাঙছে? কাজেই ইওরোপিয়ান স্টাইলে জীবনকে ভাবলে চলবে না। যৌথ পরিবার যতোদিন আছে পাচালির মতো যৌথ শিল্পের প্রেরণাটা আমাদের মধ্যে কাজ করতে পারে। রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও আমরা দেখছি বাঙালিরা একটা পরিবারের ভববষরহম নিয়ে দেশটা স্বাধীন করেছে। অর্থাৎ পুরো বাঙালি জাতিটাই একটা পরিবার। অবশ্য স্মল এথনিক গ্রুপ যারা তাদেরও আমরা অংশীদার করছি আমাদের ভূখণ্ডে, একই ঐতিহ্যের না হলেও আমরা তাদের ঐতিহ্যকে সম্মান করি, গ্রহণ করি। তারাও আমাদেরটা গ্রহণ করে। আমি এ বিবাদে যাচ্ছি না। আমি বলছি পুরো মানচিত্রটাই একটা বৃহৎ গৃহাঙ্গন। এটা থাকবে চিরস্থায়ী, আমি সেটা বলছি না। কিন্তু বাঙালি সহস্র বছর ধরে পরিবার সম্পর্কে মানুষ সম্পর্কে যে ভ্যালুজ লালন করছে, একজন গ্রিক যেমন হাজার হাজার বছর ধরে বহন করছে-আমরাও তেমনি হাজার হাজার বছর ধরে বহন করছি। আমাদের শিল্প যদি সেই নিরিখে হয় তো মন্দ কি?’

ভাষা
রায়হান রাইন প্রসঙ্গ পাল্টালেন সেলিম আল দীনের ভাষা প্রসঙ্গের উল্লেখ করে। ‘আমরা দেখছি আপনি সবসময় একটা নির্মিত ভাষার পক্ষে। সেটা করতে গিয়ে আপনি সংস্কৃত বহুল শব্দ ব্যবহার করেন এবং প্রচুর পুরনো, অপ্রচলিত শব্দও আপনি ব্যবহার করেন। সেটা সাধারণ যে প্রচলিত ভাষা কাঠামো তার সাথে কতোটা সঙ্গতিপূর্ণ? কিংবা আপনার এই লিখিত ভাষার পরিণতিটা কি?’
“এই ব্যাপারে আমি একেবারে শিল্পপন্থী। দৈনন্দিন ভাষা ব্যবহার করে আমি কাব্য করার পক্ষপাতী নই। সেটা মাত্র বিশ্বাসযোগ্যতার খাতিরে যতোটুকু আসতে পারে। শিল্পের ভাষা সবটাই হবে নির্মিতি। নির্মিতি মানেই কাব্য। গদ্যটা একটা ভান বটে। আমার লেখার গদ্যের যে রূপটা তোমরা দেখো এটি আসলে ছলনা, বেসিকালি আমি কবিতাই রচনা করি। কবিতার ছন্দ, মাপ, স্পন্দন, সব মিলিয়ে কিন্তু আমি গদ্যটা রচনা করি। গ্রামাঞ্চলে প্রচুর শব্দ আছে সেগুলো সংস্কৃত ভেঙে তৈরি। এক জেলায় ব্যবহৃত হয় অন্য জেলায় ব্যবহৃত হয় না। আবার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমি অত্যন্ত সচেতন, ‘হাত হদাই’র মতো লেখা বা আমার যে কোনো লেখাতে যখন আঞ্চলিক ভাষা আসছে, কথ্যভাষা যখন আসছে তখন অবশ্যই সে কথ্য। সেখানে নির্মিতিটা হলো, সেটাকে সম্ভাব্য আঞ্চলিকতার সীমায় রেখে কাব্যরূপ দান করা। সৎভাবে সেটা করা। প্রত্যেক ভাষাই চায় একটা সর্বজন বোধ্যতার দিকে যেতে। চট্টগ্রামের কোনো গায়ক কি আঞ্চলিক ভাষায় গান করে মাইজভাণ্ডার শরীফে। সে কথা বলছে এক ভাষায় কিন্তু এক্সপ্রেশন-এর বিষয়টি আসছে তখন যে সর্বজনমান্য প্রায় সবাই বুঝতে পারে এমন একটি ভাষাকেই সে আশ্রয় করছে।”
‘ভাষার মূল বিষয়টাতো কমিউনিকেশন?’ আমি বললাম।
‘তাহলে, কমিউনিকেশনই যদি বিষয় হয় তবে আমি নির্মিত ভাষায় কেন লিখবো না? যদি কমিউনিকেট করতে পারি প্রচণ্ডভাবে। কমিউনিকেশনের জন্য আমি কতোগুলো কৌশল ব্যবহার করি। আমি এক ধরনের রিদম তৈরি করি যাতে সেটি কানে ঢোকে। একটা স্পন্দন তৈরি করি যাতে এই আধুনিক লোকটি সেটি বুঝতে পারে। আমার মনে হয় আমি বাকি জীবনেও আমার তৈরি ভাষাতেই লিখবো। জনগণের ভাষাকে আমার ভাষা করে আমি লিখবো।’
‘ভাষা নির্মিতির বিষয়টা প্রথম লক্ষ্য করা যায় আপনার শকুন্তলা নাটকে।’ সাইমন মন্তব্য করলেন।
‘শিক্ষানবিসির কালে। লক্ষ্য করবে শকুন্তলার পরে আমি সোজা কীত্তনখোলায় নেমে গেছি। যখন আমি টের পাচ্ছি ভাষার কাসিকাল রূপটা নির্মাণের ব্যাপারে আমার আর কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই, স্বচ্ছন্দ। তখনই আমি কীত্তনখোলার আঞ্চলিক ভাষায় নেমে গেলাম। কীত্তনখোলার ভাষাটা কতোটুকু আঞ্চলিক, কতোটুকু কাসিকাল এ বিষয়টা নির্ধারিত হয়ে গেল। এ বিষয়ে এস এম সুলতানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। থিমের ব্যাপারে তার সঙ্গে আমার মতদ্বৈধতা হয়েছিল। কিন্তু ভাষার ব্যাপারে তার সাজেশনটাকে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলাম।’
‘হাত হদাই’কে আপনি আঞ্চলিক ভাষার কাজ বলছেন কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে এটা আসলে আঞ্চলিক ভাষা নয়। খুব টেকনিকালি কাজটা করা হয়েছে।’ সাইমন বললেন।
‘আমি কোন অঞ্চলের ভাষায় লিখবো? প্রতি তিন মাইল অন্তর ভাষা চেঞ্জ হচ্ছে। আমি আদর্শ ভাষা ধরবো কোনটাকে। এ ক্ষেত্রেও একে জনগণের ভাষা বলে প্রচার না করা ভালো। শিল্পিত ভাষা করতে হলে যদি আরোপিত ভাষা ব্যবহার করতে হয় তো ডু দ্যাট। আর হাত হদাই’তে গল্পগুলো, যেগুলো মঞ্চে ব্যবহার করা হবে সেগুলো বিশুদ্ধ মান্য ভাষায় লেখা হয়েছে বলে ওটি বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।’
রায়হান রাইন আবারো বিতর্কের সুর তুললেন, ‘কথা নাট্যে ভাষা বারবার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আপনার ভাষাকে আমাদের এতো বেশি বিচ্ছিন্ন মনে হয়, আলাদা মনে হয় যে, তাকে আমাদের সময়ের ল্যাঙ্গুয়েজ মনে হয় না।’
‘ভাষার একটা সময় তো আছেই। মেঘনাদ বধ কাব্যে আমি লক্ষ্য করেছি (সাম্প্রতিক প্রযোজনায়) অদ্ভুতভাবে চলতি ভাষার ব্যবহার আছে এবং আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার আছে। চলতি বাংলার ব্যবহারটি খুব অসাধারণ। কিন্তু মেঘনাদ বধের শব্দ বিষয় এগুলো কি সমকালীন? অর্থাৎ বিষয়ের সমকালীনতা না থাকা সত্ত্বেও ভাষার সমকালীনতার মধ্য দিয়ে বিষয় আত্মপ্রকাশ করতে পারে। আবার বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতা ভাষাকে যখন তৈরি করে তখন সেটা কালের অপেক্ষা করে না। এখন থেকে চল্লিশ বছর পর সবাই যখন ভুলে যাবে তার আগেই আমার বলে দেয়া উচিত- ডেকো না আমারে ডেকো না/চলে যে এসেছে মনে তারে রেখ না। বাংলা ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তিটা কালের বটে, কাল নিরপেক্ষও বটে। সহস্র বছরের সেই শক্তিটাকে আমি গদ্যের ছলে পদ্যে ব্যক্ত করেছি। সেটা করতে গিয়ে যদি সমকাল থেকে বিচ্যুতি ঘটে যায় তবে সেটা নিশ্চিন্তে ঘটুক।’
‘আপনি কি মনে করেন আপনার ভাষা কমিউনিকেট করতে পারে?’ প্রশ্ন করলেন সাইমন।
‘কমিউনিকেট যদি না করে তবে তোমরা বসেছো কেন এখানে?’

সময়
আমি প্রসঙ্গ ধরে খানিকটা অন্য দিকে গেলাম।
‘আমরা একটা সময়ে সাহিত্য চর্চা করছি আপনাদের সঙ্গে আমাদের সময়ের দূরত্ব প্রায় ২৫/৩০ বছর। আপনারা একটা বিশেষ সময়কে অতিক্রম করে এসেছেন, আপনাদের সময়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে সাহিত্য নাটক কবিতাকে নতুন স্থানে স্থাপন করতে হবে- এই প্রেরণা আপনাদের মধ্যে ছিল। একটা বিশেষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আপনারা এই স্থানে উপস্থিত হয়েছেন। আমাদের অভিজ্ঞতাটা ভিন্ন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি, মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। আমাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালিত্ব, নতুন দেশকে গড়া, নতুন দেশের শিল্প সাহিত্যকে গড়া ইত্যাদির যে তাড়না- সেটাও আমাদের মধ্যে নেই। এই জেনারেশন এবং আপনাদের জেনারেশন এ দুই জেনারেশনের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো কেমন হয়?
‘আমার মনে হয় যে, আমাদের জেনারেশনেও প্রচুর অনড়তা আছে, ভ্রান্তি আছে। অজ্ঞতা প্রচুর আছে। আবার বৃহৎ একটা গণযুদ্ধে আমরা অংশগ্রহণ করেছিলাম বলে পৃথিবীকে দেখার, বোঝার এবং স্বদেশের মাটিকে অন্বেষণ করার স্পৃহা আমাদের ছিল। পৃথিবীর সেই রুদ্র মূর্তিটা আমরা দেখেছি, যখন আমাদের মায়েরা, বোনেরা ধর্ষিত হচ্ছিল, কন্যারা ধর্ষিত হচ্ছিল তখন পুজিবাদী দেশগুলো নির্বিকার। আমরা দেখেছি হাসতে হাসতে একটা বাচ্চা ছেলেকে পাথরের ওপর আছড়ে মারা হচ্ছে। কি করে একটা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি আনসাকসেসফুল স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের কথা বলবো, সেখানে ফ্রাঙ্কোর সেনাবাহিনী ব্যাপক গণহত্যা করলো, সে সময়ে স্পানিশ লিটারেচারে, ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যে একটা তীব্র আলোড়ন এলো, যেমন নেরুদার একটি কাব্যগ্রন্থ বেরুলো মার্চেন্ট সোলজারদের জন্য কাগজের কারখানায় জুতা কাপড় যা ফেললো তা দিয়ে মণ্ড তৈরি হলো, কাগজে ছাপা হলো। মিগুয়েলের কথা বলতে পারি, সিভিল ওয়ারে সরাসরি অংশগ্রহণ করা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথা বলতে পারি, কল্ডওয়েলের কথা বলতে পারি। একটা নতুন জেনারেশন কিন্তু রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বহু বছর পর আবার নতুন করে চর্চিত হলো নতুন পথ খুজে পেল। কিন্তু আমাদেরটা সাকসেসফুল যুদ্ধ, প্রচুর রক্তক্ষয় এবং প্রচুর মূল্য দিয়ে আমরা স্বাধীন ভূমি অর্জন করেছি। আমাদের ভেতরে বোধটা একটু আলাদা। আমার তো মনে হয় না যে, আমাদের এ কাজ দেখে তোমাদের মনে করা উচিত যে তোমাদের দায়িত্ব নেই। ভেবে দেখা দরকার যে, আত্মতৃপ্তির অবকাশ আছে কিনা। কবিতার ক্ষেত্রেও তো ভয়ানক একটা নৈরাজ্য চলছে আমি কলকাতার কথা বলবো না, কেননা সেখানে উত্থান-পতন পরিবর্তনের সম্ভাবনা আরো কম। আমাদের এখানে প্রতি মুহূর্তেই আমাদের রাজনৈতিক মেঘ যেমন রঙ বদলাচ্ছে, আমাদের সমুদ্র যে রকম নতুন করে ফুসে উঠছে আমাদের ভেবে দেখা দরকার যে, কোন পর্যায়ে লিটারেচারকে নতুন করে রিনোভেট করতে হয়। নতুন করে নির্মিতি কিভাবে হবে এবং তোমাদের কাজ হবে রিলে রেসের মতো। আমরা এতোদূর এগুলোম তোমরা এতোদূর। তোমাদের কবিতার দিকে তাকালে আমি হতোদ্যম হয়ে পড়ি- প্রথমত বোধ এবং বিষয়ের একটা আইকোনোকাস্টিক অবস্থা দেখতে পাই। এখনকার কবিতা পড়ে আমি ঠিক কনভিন্সড হই না। জীবনানন্দ, বিষ্ণুদের কবিতা পড়ে যে প্রচণ্ড মোহ এবং আবর্তের তৈরি হয় এখনকার কবিতা পড়ে ক্বচিৎ আমার সেটা হয়। মনে হচ্ছে যেন ওদের ভেতরে বলার একটা প্রচণ্ড তাগিদ আছে। কিন্তু ভেতরে সেই পরিমাণ আর্জ নাই, কবিতাকে একটা শিল্পরূপ দেয়ার যে শ্রম সেই জায়গাটায় তারা খাটতে রাজি নয়। অবশ্য সেটা নির্বিশেষ মন্তব্য নয়। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে অনেক সম্ভাবনাময় কবি-লেখক আছেন বিশেষ করে ছোট কাগজগুলোতে, অফ দি ওয়ে ম্যাগাজিনগুলোতে, এ পত্রিকাগুলোকে কেন্দ্র করে অনেক কবি-গদ্যকার উঠে আসার চেষ্টা করছেন। আমি এ কথা মনে করি না যে, একজন তরুণ কবি বা তোমাদের জেনারেশন খারাপ লিখলেই আমাদের সম্ভাবনা বেড়ে যায় বড় হওয়ার এ রকম কোনো নেগেশন কিন্তু শিল্পে নেই। বরং তোমরা ইয়াংরা যতো প্রচণ্ড বড় হবে আমাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্র ততোটা স্পষ্ট হবে, আমাদের সঠিক মূল্যায়ন ইতিহাসে হবে। অন্ধকার যতো ঘনাবে ততোই অতীত আরো বেশি অন্ধকার হয়ে যাবে। আমরা এখন চলমান কিন্তু আমাদের জীবনের অধিকাংশ কাজ এখন অতীতের মধ্যে। বর্তমানে যেটুকু আছে সেটুকু আয়ুর জোরে; কলমের জোরে, কিন্তু তোমাদের ঘুরে দাড়াতে হবে একটা জায়গায়। সেটা হলো সৎভাবে খাটনি যেটা সেই খাটনিটা করতে হবে। আমি নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি, ‘কেরামত মঙ্গলের’র রাফ কপি দাড়িয়ে ছিল মোট পৌনে তিন হাজার পৃষ্ঠায়। অথচ নাটকটি ছিল দেড়শ পৃষ্ঠার। শকুন্তলা আমি লিখেছি আঠারবার। সব লেখকেরই তিন-চারটা যুগ থাকে লেখার প্রত্নপ্রস্তর যুগ, প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ তারপরে লৌহ যুগের লেখকের কবির ভাষাটা দাড়ায়। ইস্পাতের যুগে যে ঢুকতে পারবে সে অমর। মনে হয় আমি শকুন্তলায় ব্রোঞ্জ যুগে নিশ্চয়ই ছিলাম।’
‘কবিতার কথা যখন তুললেন এখানে আমি আপনার একটা কথা খুব ফিল করি সেটা হলো- অ্যাজ অ্যান আর্ট মিডিয়া কবিতা একটা ক্ষয়ীমান বিষয়। আমরা কবিতা লিখছি সেটা শুধুমাত্র আমি মাহবুব মোর্শেদ কবিতা লিখছি বিষয়টা এ রকম নয়। বিশ্ব কবিতার কিংবা বাংলা কবিতার ইতিহাসের মধ্যে বসে আমাকে লিখতে হচ্ছে। টোটাল বিষয়টা যখন আমি মাথায় রেখে লিখি- যে কোন আর্ট মিডিয়াতে কাজ করতে গিয়ে আমি তো চাই স্বকীয়তাকে তুলে আনতে। আমি আমার কথাটা কেন বলছি তার চেয়েও বড় কথা হলো আমি কিভাবে বলতে পারছি। কবিতার ক্ষেত্রে এই সমস্যাটা আমার ধারণা আমাদের সবারই আছে। আমরা দেখছি, নাটকে আপনি যেসব নতুন নতুন কাজগুলো করছেন এখানে ফর্ম হয়তো খুব চেঞ্জ হচ্ছে না, দুই-তিনটা ফর্মে এটা আবর্তিত হচ্ছে। এটাও বড় একটা পাওয়া। কিন্তু আপনার সাফল্যের পেছনে আরো একটা কারণ আছে। সেটা হলো ল্যান্ডস্কেপ পরিবর্তন। হয়তো দেখা যাচ্ছে- বাংলাদেশের টাঙ্গাইল অঞ্চলের একটা প্রেক্ষাপট আবার মানিকগঞ্জে আরেকটা প্রেক্ষাপট অথবা নোয়াখালীর একটা ঘটনা লিখছেন। পাশাপাশি এই যে আপনার মানুষের ভূমিরেখা ধরে আবর্তন এটা কিন্তু আপনার কাজকে বেশি নতুনত্ব দিয়েছে। কবিতার ক্ষেত্রে আমি সমস্যাটা বললাম যে সমস্যাটা আমি ফিল করি, আমাদের মুক্তিটা সম্ভবত কবিতায় আর নেই- আমি এটা ফিল করছি। সেটা হয়তো গদ্য অথবা অন্য কোনো আঙ্গিকে।
‘আসলে বিশ্বব্যাপী কবিতার ক্ষয় বা ধস নেমেছে। এটার কারণ কিন্তু পাশ্চাত্যের পুজিবাদী সভ্যতা। সে মানুষকে মানুষের জায়গায় আর তিষ্টোতে দিচ্ছে না। খুব হাস্যকর বিষয় এটাকে আমরা কমপিউটারের যুগ বলছি। তার মানে এখন মানুষ নেই। কমপিউটার ব্যবসায়ীদের বানানো কথায় যারা পা দিয়েছে তারা নিশ্চয়ই খুব বোকামি করেছে। মানুষকে অবমূল্যায়ন করেছে। মানুষকে কেটে ছেটে কমপিউটারের মাপ দিয়ে দিয়েছে। পৃথিবী সব সময় মানুষের। কবিতার ক্ষেত্রে ইওরোপিয়ান চিত্তের বিকাশটা যখন এমন স্থানে পৌছালো, একটা লোক ফ্রম ডন টু ডাস্ক মানি আর্নিং-এর কাজে ব্যস্ত। জীবনের কতো ডাইভারসিফাইড পণ্যের সঙ্গে তার উৎপাদন সংশ্লিষ্টতা রয়ে গেছে। গ্যেটের আমলে সেটা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের আমলে এটা ছিল না। এই জায়গাগুলো নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে পণ্য সভ্যতা। দিচ্ছে বলে বিত্তের ভারে চিত্তের অভাব ঘটছে। বিত্ত মানে পণ্য সভ্যতা। ধরো একটা ঘড়ি কিনতে বেরুলে- ইউ হ্যাভ এভরি রাইট টু সি দি ইচ অ্যান্ড এভরি ওয়াচ ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। ঘড়ি দেখতে দেখতেই একটা জীবন তুমি কাটিয়ে দিতে পারো। একটা কাঠ পেন্সিলের এতো ভেরিয়েশশন পৃথিবীতে তৈরি হয়েছে। পণ্য সভ্যতা তিলে তিলে মানুষকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে মানবীয় মূল্যবোধগুলোকে ছেটে সেখানে প্রোডাকশনের চিন্তাটাকে ভরে দেয়া হচ্ছে। আমার যে মেয়েটি যে কন্যাটি শত শত বছর আগে মসলিন বুনতো, একটা জাদুকরি মসলিন- কাপড়, বস্ত্র- সে এখন বিদেশিদের জন্য গার্মেন্ট সেলাই করছে। সেই হাত। মসলিন বুনতে বুনতে যেটুকু রূপকথা শুনতো তার সঙ্গে মসলিন বুনতে বুনতে সম্পর্কটা আরো নিকটতর হতো। এখন সেটি আর নেই। উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে, প্রোডাকশন সংখ্যার সঙ্গে জড়িয়ে সে কিন্তু আর ভাবে না সেভাবে। কাজেই কবিতার স্থান সংক্ষিপ্ত হওয়ার জন্য পৃথিবী দায়ী কবিতার কোনো দোষ নেই। এটাও ঠিক যে, পৃথিবীর সর্ব শিল্পেরই ক্ষয় আছে। কবিতারও ক্ষয় এসেছে। প্রথমত, ইওরোপে কবিতার যে আধুনিকতা-সে ইওরোপ এমন এক জায়গায় পৌছে গেছে সেখানে কবিতার কথা, চিত্তের কথা, মানুষের নানা ঐশ্বর্যের কথা ভাবা এটির প্রয়োজন সেখানে আর নেই। ফুরিয়ে আসছে। মানুষের তো অবসর লাগে অবসরটা কোথায় মানুষের? এটা উপন্যাসের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে না। নাটকের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে না। অ্যামেরিকানরা এখনো ৫ থেকে ৬ পারসেন্ট নাটক দেখে, অতো কোটি লোকের মধ্যে। জার্মানি, ইংল্যান্ডে আরো বেশি। আমার কথা হলো, কালের ক্ষয়ে কবিতা লোপ পাবে, নাটকও লোপ পাবে। নাটকও লোপ পেতে বসেছে। যে জন্য আঙ্গিককে আমি ঃৎধহংভড়ৎস করতে চাচ্ছি। বিশ্বব্যাপী ডিরেক্টরের প্রবল দৌরাত্ম্যে নাটক এখন ডিরেক্টরের খেলার বিষয় হয়ে গেছে। ডিরেক্টর নিজেই শিল্পীর জায়গা দখল করে নিচ্ছে। সে জন্য আমাকে স্ক্রিপ্ট এর জায়গায় এতোটা স্ট্রং হতে হচ্ছে। উপন্যাসেও, ইওরোপে কি উপন্যাস লেখা হচ্ছে, ভালো? বিশাল, সাংঘাতিক মহৎ কিছু। ল্যাটিন আমেরিকায় সেটা হচ্ছে।
‘কুন্ডেরা লিখছেন, উমবের্তো একো লিখছেন।’ বললেন রাইন।
‘লিখছেন। কিন্তু ল্যাটিন আমেরিকার মতো এতো বিশাল এতো ব্যাপ্তি সেখানে নেই। আফ্রিকান উপন্যাসেও এই বিশালত্ব আমরা দেখি। কবিতার আধুনিকতার জন্ম যেখানে সেখানটা রুদ্ধ হয়ে এসেছে। দ্বিতীয়ত, কালের ক্ষয় লেগেছে। আমি মনে করি যে, কবিতার মৃত্যু নেই। সে অন্য কর্মে টিকে থাকবে। এখন যদি কেউ কবিতার আকারে একটা বৃহৎ উপন্যাস লেখে, তাতে উপন্যাসের কোনো ক্ষতি হবে না। কবিতার লাভ হবে।’
‘প্রিন্টিং মিডিয়ার অস্তিত্বই তো সামনে আর থাকছে না। ভার্চুয়াল রিয়ালিটির জগতে প্রবেশ করছি আমরা।’ বললেন রাইন।
‘যখন টেলিভিশন বেরুলো তখন সকলে ভাবলো চলচ্চিত্র আর থাকছে না। এখন দেখা যাচ্ছে চলচ্চিত্রই শিল্প মাধ্যম। ৫০/৬০ বছরে টেলিভিশন সেখানে পৌছাতে পারেনি। কাজেই কমপিউটার যতো দৌরাত্ম্য করুক, মানুষই সেই শক্তি যে এটার বিরুদ্ধে দাড়াবে। মানুষ যখন দেখবে সে নিজেকে হত্যা করছে। শিল্পের স্থান যতো সঙ্কীর্ণ হবে এ পৃথিবীতে মানুষের স্থানও ততো বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’
সেলিম আলম দীন বললেন, পণ্য সভ্যতার বিরুদ্ধে দাড়াতে হবে ব্যক্তিকেই নিজের নিজের জায়গা থেকে। এই স্পন্দন প্রথমে ব্যক্তির মধ্যে জাগবে পরে ব্যক্তি এটা সমষ্টির মধ্যে ছড়িয়ে দেবে। ইনডিভিজুয়ালের প্রতিবাদটা ইউনিফায়েড প্রতিবাদে পরিণত হবে। তিনি বললেন, এই প্রতিবাদের ধরনটা কেমন হবে সেটা কারো পক্ষে নির্ধারণ করে দেয়া উচিত নয়। পণ্য সভ্যতার পাশাপাশি যে শিশ্ন সভ্যতার বিকাশ এ সম্বন্ধেও বললেন তিনি। শেষ পর্যন্ত মানুষই এর বিরুদ্ধে দাড়াবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করলেন।

মৃত্যু
সাক্ষাৎকারে লেখকের মৃত্যুবোধ প্রসঙ্গে কথা ওঠে। সে প্রসঙ্গেই আমি বললাম, ‘আমরা কামনা করি আপনি একশ’ বছর বাচুন। কিন্তু জীবন প্রতি মুহূর্তেই ক্ষয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষয় অর্থাৎ মৃত্যু বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
‘মৃত্যু বিষয়টা নিয়ে আগে খুব ভাবতাম এখন আর ভাবি না। বিশেষ করে ‘হরগজ’ লেখার পর আমার মনে হয় এ বিষয়ে আমার বলা হয়ে গেছে। ‘হরগজ’ অনেকটা আত্মজৈবনিকও বটে। ওর ভেতরে আমার নিজস্ব মৃত্যুভাবনাও আছে। মৃত্যু বিষয়টা আমাদের তাড়িত করে বলেই আমরা লিখছি, কাজ করছি। অনুপ্রাণিত হচ্ছি। তুমি যখন আমাকে দেখছ, সেলিম আল দীন বিশ বছর বাচবেন ম্যাক্সিমাম। তারপর তো তার সঙ্গে এই আড্ডাটা আর হচ্ছে না। আমি যদি অনন্তকাল বেচে থাকতাম তবে তোমরা আমার সাক্ষাৎকার নিতে আসতে না। আমাদের সমস্ত কাজকেই নির্ধারণ করে দিয়েছে মৃত্যু। অমরত্বের আকাক্সক্ষা তীব্র হয়ে মৃত্যুভয় লেখককে লেখক করে। এই দুটো থেকে লেখক তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথ যেমন শেষের দিকে বলেন- শিশুকাল থেকে প্রত্যেক মুহূর্তে আমি মৃত্যুভয়ে থেকেছি।
‘যারা আত্মহত্যা করে তারা মৃত্যুকে এক হাত দেখে নেয়ার চেষ্টা করে?’ বললেন রাইন।
‘হ্যা, তারা মৃত্যুকে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ করে। এটা এক ধরনের বোকামিও বটে। এ জন্য যে, তুমি না মরলেও তুমি এমনি মরবে। তুমি ভাবো যে, রবীন্দ্রনাথ আত্মহত্যা করেছেন, মৃত্যুভয়ে। তাহলে আমাদের মৃত্যুটা কতো কঠিন হয়ে যায়। আমরা দেখছি মৃত্যুর মুহূর্তে এক অসীম ধৈর্যের মধ্য দিয়ে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। গ্যেটের মৃত্যুও তাই। আমাদের প্রফেটের মৃত্যুও তাই।’
‘লালন সাই’র মৃত্যুও।’ যোগ করলেন সাইমন।
‘আমাদের এখানে বেচে থাকাই যেখানে সবচেয়ে কঠিন, সেখানে আত্মহত্যা করা অর্থহীন।’ রাইন বললেন।
‘হ্যা, রাইন চমৎকার বলেছো।’
‘লেখক জীবনের শুরুতে আপনিও আত্মহত্যা করতে গিয়েছেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘এটা সম্পূর্ণ সত্য। এটা আমি চেষ্টা করি ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে। পরে আমার কাছে মনে হলো, আমি আর কয়টা দিন বেচে লিখে দেখি না। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাও একই রকম অ্যাটেমপ্ট নিয়েছিলেন। হয় গান শিখবেন, নইলে আত্মহত্যা করবেন’। ‘আবার যখন টলস্টয়, গ্যেটে, রবীন্দ্রনাথের মানসিক প্রস্তুতি দেখি তাতে মনে হয় সম্মুখে শান্তির পারাবার। টলস্টয় তো বলেছেন, কে বললো যে মৃত্যু কষ্টের। মৃত্যু তো সুখেরও হতে পারে’।
‘তখন কি আপনার আত্মহত্যার বাসনা জেগেছিল এই কারণেই যে লিখতে পারছিলেন না?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘না আমার কাছে মনে হচ্ছিল যে আমি খুব বড় লেখক বোধহয় হতে পারবো না। বিশাল কিছু হতে পারবো না। আমি অষ্টম শ্রেণীতেই শান্তি নিকেতনে পালাতে চেয়েছিলাম। নবম-দশম শ্রেণীতে রবীন্দ্রনাথের মেজর লেখা আমি পড়ে ফেলেছি। গ্রামে বসে। ফলে জীবন সম্পর্কে, শিল্পকৃতি সম্পর্কে আমার যে কৈশোরক ধারণা- যৌবনের শুরুতে সেটা তুঙ্গে পৌছেছিল। আমি দেখলাম আমি এটার একেবারেই উপযুক্ত না। তখন থিয়েটার আমাকে বাচিয়েছে। নাটক আমাকে বাচিয়েছে। ধীরে ধীরে আমি দেখলাম নাটক আমার অঙ্গীভূত হয়ে গেছে। আমার নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মতো। অর্থাৎ আমি জীবন সম্পর্কে যা বলতে চাই সবই বলা যায় নাটকের মধ্য দিয়ে। আমার আঙ্গিকে বলা যায়।
‘সফলতা আপনাকে বাচিয়ে দিল?’ বললাম আবার।
‘সফলতা আসলে কি? সফলতা সম্পর্কে জীবনানন্দের একটা কথা আছে। সফলতা কি আসলে সফলতা? এটা হয়তো এই জন্য যে, আঙ্গিকের দিক থেকে আমি আমার দেশের মানুষকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চেয়ে কিছুটা হয়তো সফল হয়েছি। সেটাকে আমি ভাবছি সফলতা। কিন্তু আমার লেখা সফল নাও তো হতে পারে। সময় কোনগুলো নেবে না নেবে। রুক্নবর্ণে তো সে কথাই বলা হলো যে, আমার অমরত্বের আকাঙ্ক্ষাটাকে আমি খুব ঘৃণার সঙ্গে দেখি। খুব উপহাস করেছি নিজেকে।’ বললেন সেলিম আল দীন।

Thursday, July 26, 2007

An Interview with Nasir Uddin Yusuf


After 50th Staging of Binodini eminent Bangladeshi director Nasir Uddin Yusuf staged a new drama called Nimajjan written by Selim Al Deen. After the first show many called it as a new experience on the stge of Dhaka. I and Saymon Zakaria Talked with him about this drma and his thoughts about dramatics. Syeem Rana was present on the event. Snapshot of yusuf was taken by Hasan Bipul.
ঢাকার মঞ্চে বিনোদিনী নাটকের ৫০তম প্রদর্শনীর পর নাসির উদ্দিন ইউসুফ মঞ্চে নিয়ে এলেন নতুন নাটক নিমজ্জন। এটি ঢাকা থিয়েটারের ৩২তম প্রযোজনা। প্রথম মঞ্চায়নের পর নাটকটি দর্শকের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের মঞ্চে নাসির উদ্দিন ইউসুফ বরাবরই নতুন ও বিস্ময়কর ধারার জন্ম দিয়েছেন। এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এবার তিনি মঞ্চায়িত করলেন স্থান-কাল নিরপেক্ষ একটি নাটক। নাটকটি লিখেছেন সেলিম আল দীন।
বিশ্বের নানা অঞ্চলে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, সামরিক শাসন, অপঘাতের বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে লেখা হয়েছে নাটকটি। এতে আছে মানুষের অসহায়তা, প্রতিরোধ ও যুদ্ধের প্রতি ঘৃণার কাহিনীও। বহু বিস্তারি এ নাটকটিকে আশ্চর্য দক্ষতায় নাট্যরূপ দিয়েছেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। মঞ্চায়নের পর দর্শকরা একে বিশ্ব মানের একটি পরিবেশনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ নাটক ও তার নাট্য চিন্তা নিয়ে কথা বলেছেন যায়যায়দিনের সঙ্গে। কথা বলেছেন সাইমন জাকারিয়া ও মাহবুব মোর্শেদ। উপস্থিত ছিলেন সাইম রানা। ছবি তুলেছেন হাসান বিপুল।

আপনার নাটকের জার্নিটা আমরা জানি, সংবাদ কার্টুন থেকে মুনতাসির, শকুন্তলা, কেরামতমঙ্গল, কীর্তনখোলা, হাতহদাই। একেকটা পদক্ষেপের মধ্যে বিস্তর ফারাক। সর্বশেষ বিনোদিনী থেকে নিমজ্জন। এ দুটি নাটকের মধ্যেও বিস্তর পার্থক্য। একটা নাটক থেকে আপনার আরেকটা নাটক আলাদা হয় কিভাবে? চিন্তাগুলো কিভাবে আসে?

প্রথমত টেক্সট একটা জায়গা নির্ধারণ করে দেয়। টেক্সট একভাবে দাবি করে। নির্দেশককে টেক্সটই বলে দেয়, এটা আমি চাই। আর সময়টাও বলে। সময় একটা জায়গা তৈরি করে। কথার কথা হিসেবে বলছি, বিনোদিনী একটা সিম্পল, লিনিয়ার একটা কাজ। কিন্তু তার মধ্যেও অনেক বুনন আছে। সাধারণ একটা লিনিয়ার টেক্সটকে সুন্দর ঝকঝকে একটা প্রযোজনা করা এবং তাতে অভিনয় দক্ষতার প্রয়োগ ঘটানো।
অভিনয় দক্ষতাটা ছিল বিনোদিনীতে আমার মূল লক্ষ্য। দেখাতে চেয়েছিলাম পাওয়ার অফ অ্যাক্টিং কিভাবে একটা টেক্সটকে নাটক হিসেবে শৈল্পিক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে নিমজ্জন বা অন্য যে কোনো জটিল নাটকে লক্ষ্য থাকে জটিল নাটকটিকে কতো সহজভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা যায়। এগুলোতে দেখা যাবে প্রচুর কাজ আছে, প্রচুর অ্যাকশন বা মঞ্চ ক্রিয়া আছে এবং সেগুলোর সমন্বয় করতে হয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় কাজটা করি সেটা বলা মুশকিল। এমনকি সাইমনের বিনোদিনীর যে এ রকম প্রডাকশন হবে সেটা আমি বা সাইমন কেউই ভাবিনি। এখানেও তাই। প্রথমত একটা চেষ্টা ছিল। আমার একটা ভাবনা ছিল। একটা থেকে আরেকটার ফারাক ঘটে সময়, অভিজ্ঞতা, টেক্সটের একটা দাবি এগুলোর ফলে।

মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে আপনি কখনো প্রসেনিয়াম ব্যবহার করছেন। কখনো নাটককে মেঝেতে নামিয়ে আনছেন। নিমজ্জনের ক্ষেত্রে আমরা প্রসেনিয়ামের ব্যবহার দেখলাম।

আমার সব নাটকই বাইরে করার মতো। এ প্রযোজনাটি বাইরে অসম্ভব ভালো লাগবে। আমি বলে দিতে পারি, যদি গ্যালারিতে দর্শক বসে এবং ফোরে নাটকটি হয় তাহলে এটি আরেকটি মাত্রা পাবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ আমরা যখন রিহার্সাল করেছি সেটা ফোরে করেছি এবং আমরা সেটা গ্যালারি থেকে দেখেছি।

দর্শকের কথা কি আপনি মাথায় রাখেন?

না, দর্শকের কথা আমার মাথায় থাকে না। থাকলে মনে হয় না যে, আমি নিমজ্জন করতাম। আমি প্রথমত আমার শিল্পকর্মটাই করি। আমি নিজেকে নিজে এন্টারটেইন করি। আসলে মানুষের প্রথম কাজ হচ্ছে, বাচার জন্য নিজেকে নিজে এন্টারটেইন করা। কেউ যখন লেখেন, তিনি লিখতে লিখতেই কিন্তু এন্টারটেইন হন। আমি কোনো লঘু এন্টারটেইনমেন্টের কথা বলছি না। শৈল্পিক প্রক্রিয়ার মধ্যে যে এন্টারটেইনমেন্ট থাকে আমি সেটার কথা বলছি। পরিশ্রমের মধ্যে এন্টারটেইনমেন্ট থাকে। কেউ যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হাটছে বা লিখছে সে প্রক্রিয়ার মধ্যেই তার এন্টারটেইনমেন্ট থাকে। এটা মানে তো শুধু দুটি নাচ-গান না বা ওয়েস্টার্ন মিউজিক নয়। যদি দর্শকের কথা বলি তবে দর্শক লঘু সঙ্গীতেও আনন্দ পায়, ইনডিয়ান কাসিক শুনেও আনন্দ পায়, নজরুল সঙ্গীতেও পায়, রবীন্দ্র সঙ্গীতেও পায়। প্রশ্নটা খুবই প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে, আমার নির্দেশিত বিভিন্ন নাটক বিভিন্ন চরিত্র ধারণ করেছে।

থিয়েটারে খুব কম নির্দেশকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় তার একটা নাটক থেকে আরেকটা নাটক আলাদা হয়।

সেটা মনে হয় ডিজাইনের কারণে ঘটে। ওরা যে প্রডাকশন ডিজাইন করে সেখানে আমার মনে হয় সবারই ভাবার অবকাশ আছে। আমরা যখন একটা প্রডাকশন থেকে আরেকটা প্রডাকশনের দিকে যাবো তখন সেই মধ্যবর্তী সময়ে আগের শেখা কিছু জিনিস আনলার্ন করবো। নতুন কিছু জিনিস জানবো। নতুন কিছু ভাষা শিখবো। শিল্পের ভাষা আমাকে আয়ত্ত করতে হবে। সে প্রক্রিয়াটা আছে কি না আমি জানি না। কিন্তু আমার মধ্যে ব্যাপারটা আছে। আমি সাংঘাতিক রকমভাবে মিউজিক পেইন্টিং এগুলো শিখেছি। বিনোদিনী পর্যন্ত যা শিখেছি তারপর গত আড়াই বছরে অনেক কিছু ভুলে গিয়ে নতুন কিছু বিষয় শিখেছি। এমনকি বিনোদিনী নাটকটি আমি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। তা না হলে নতুন কিছু আমি করতে পারবো না। প্রডাকশনের ব্যাপারে, বিশেষ করে নাটকের প্রডাকশনের ব্যাপারে নাটকের ভাষার দক্ষতা বাড়ানো উচিত। যদি এটা বাড়ে তবে এর প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে।
নিমজ্জনের মতো জটিল টেক্সট নিয়ে আমি যখন কাজ করতে গিয়েছি তখন নাটকের ভাষা নিয়ে অসম্ভব রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে। নিমজ্জনের স্ট্রাকচারের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বাংলাদেশে প্রচলিত স্বাভাবিক নাট্য ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ নাটকে আমি এগোনোর চেষ্টা করিনি। তাহলে এটা সাদামাটা একটি নাটক হতো, স্টেটমেন্ট ধর্মী কাজ হতো। গল্পের কাঠামোর মধ্যে থিয়েটার ঢুকে যেতো। যদি গল্পের কাঠামোর মধ্যে ঢুকে যায় তবে সেখান থেকে বের করার উপায়টা কি? উপায় হচ্ছে, প্রথমেই গল্পটাকে অস্বীকার করা। তারপরও কিন্তু একটা স্ট্রাকচার তৈরি হয়। ঘর কতো রকমে বানানো যায়? ঘর তো ঘরই। লালন যেমন বলেছেন, শরীরের ভেতরে একটা অসীমতা আছে। তেমনি করে স্ট্রাকচারের ভেতরেও একটা অসীমতা আছে।
যেহেতু নিমজ্জন আমার শেষের দিকের কাজ। এতে আগের কাজগুলোর চেয়ে অনেক বেশি দুঃসাহসী হওয়া সম্ভব হয়েছে। আমি মনে করি, নাটক যদি নাটকের ভাষায় মঞ্চে নির্মিত হয়, যেটা বিনোদিনীতেও দেখা যাবে বা যে কোনো নাটকে। বিনোদিনীতে দেখা যাবে, নাটকের টেক্সটের প্রভাবের চেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নাটকীয় মুহূর্ত তৈরির জন্য নানাভাবে ভাষা প্রয়োগের একটা সাধারণ প্রবণতা আছে।

নাটকের ভাষা নিয়ে বলুন।

প্রত্যেকটা শিল্পমাধ্যমের আলাদা ভাষা আছে। পেইন্টিং যে আকা হয় তাতে রঙ, তুলি, ভাবনা, রেখা, বিন্দু এগুলো হচ্ছে তার ভাষা ও উপকরণ। সেটা দিয়ে পেইন্টিং তৈরি করতে হয়। মিউজিকে যেমন সা রে গা মা পা ধা নি সা। তারপর রাগের ব্যাপারগুলো আছে। সেগুলো আমাদের অ, আ বা এ বি সি ডির মতো নয়। কিন্তু সেগুলোও ভাষা। থিয়েটারে তেমনি করে এর অভিনয়, দেহ, টেক্সট, আলো মিউজিক সব মিলিয়ে একটা ভাষা নির্মিত হয়। এগুলো ঠিক আক্ষরিক অর্থে বলা যাবে না। এগুলো বোধ থেকে, অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয়।
এখন স্টানিস্লাভস্কি, পিটার ব্রুক বা মায়ারহোল্ডের কথা যখন বলি বা ব্রেখটের কথা বলি তখন থিয়েটার ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করার প্রবণতা থেকে কিংবা থিয়েটার ব্যবহার করার প্রবণতা থেকেই কিন্তু একজন আরেকজনের থেকে আলাদা হয়ে ওঠেন। কেউ এগিয়েছেন বা কেউ ভিন্ন রকম কাজ করেছেন। সবাই এক রকম হননি। ব্রেখট যখন এলিয়েনেশন তৈরি করার কথা ভেবেছেন তখন স্টানিস্লাভস্কি সে রকম করে ভাবেননি। আবার এখন পিটার ব্রুক তার অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করে অন্য রকম গভীরতায় চলে গেছেন।
তারা মনেই করছেন, থিয়েটার হলো ইমিডিয়েট থিয়েটার। এ মুহূর্তের থিয়েটার। এখনই হচ্ছে, এখনই শেষ। তারা মনে করছে, এম্পটি স্পেসের থিয়েটারের কোনো বিকল্প নেই। আমার মনে হয়, তারা সব সময়ই চেষ্টা করেছেন থিয়েটারকে গল্পের আড়ষ্ট কাঠামো থেকে বের করে নিয়ে যেতে। থিয়েটারকে আলাদা জায়গায় দাড় করাতে চেয়েছেন।
ছোট গল্প, বড় গল্প বা উপন্যাসের নিজস্ব ভাষারীতি আছে। ওই ছন্দ ও ভাষারীতিতে কি থিয়েটার এগুবে? না। আমরা চ্যালেঞ্জ করেছিলাম এ জায়গাটায়। এটা করতে গিয়ে অন্য ভাষা থেকে নেয়ার কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু সেটাকে অবলম্বন করে যদি কাজ করি তবে আমার থিয়েটার আলাদা হবে না। থিয়েটার আলাদা শিল্প মাধ্যম হিসেবে দাড়াবে না। বাংলা থিয়েটারের জটিলতা এখানেই। সে তার ভাষা ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছে।

আপনি যে টেক্সট ব্যবহার করেছেন তার ভাষাও কিন্তু আলাদা। সেটা কি নাটকের ভাষা রীতিকে দাড় করাচ্ছে?

না। সেটা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। নিমজ্জন কি শুধু ভাষারীতির ওপর দাড়িয়ে থাকছে? লেখ্য ভাষার ওপর আমরা নির্ভরশীল ছিলাম না। সব মানুষ কি বুঝেছে ইনকা মায়া থেকে, ইজিপশিয়ান সিভিলাইজেশন থেকে এ পর্যন্ত আসার পরিভ্রমণটা? এটা তাদের জানার প্রয়োজন নেই।
আমরা যারা নাটক করবো তাদের জানার প্রয়োজন আছে। আমাকে অনেকে বলেছে, দর্শক বুঝবে না। কিন্তু আমার আরেক বন্ধু বলেছে, দর্শক সব থেকে বেশি বুঝবে। আমি তার সঙ্গে একমত। আমি শোর আগে বলেছি, রমনার বটমূলের সেই হত্যাকা-ের দৃশ্য বা একুশে আগস্টের সেই ছিন্নভিন্ন পা আমাদের সবার অভিজ্ঞতায় আছে। যে ভূমিতে দাড়িয়ে আছি সে ভূমি কিন্তু রক্তাক্ত। তাহলে গণহত্যার চিত্র কঠিন হলে আমি কমিউনিকেট করতে পারবো না এটা ঠিক নয়।

নিমজ্জনে বহুদিন পর আপনি সিনিয়র কর্মীদের বাইরে গিয়ে নতুন কর্মীদের নিয়ে কাজ করলেন। কেন?

প্রথমত নিমজ্জন একটা কঠিন টেক্সট। সেলিমের ল্যাঙ্গুয়েজ আরো বেশি জটিল হয়েছে। সে আকড়ে ধরতে চাচ্ছে পৃথিবীর সব বিস্ময়গুলোকে। সব বিস্ময় ও ঘটনাগুলোকে সে আকড়ে ধরতে চাচ্ছে, আকড়ে ধরতে চাচ্ছে। ভাষার কারুকাজ করতে গিয়ে সেলিম টেক্সটটাকে কঠিন করে ফেলছে।
দ্বিতীয়ত সেলিমের কাব্যগত একটা কৌশল আছে। এটা সেলিমের একটা জাদুকরি ব্যাপার। এটা বুঝে থিয়েটারটা করতে হবে। যদি তাই করতে হয় তাহলে সেলিম যেমন এক হাজার বই পড়ে এ নাটকটা লিখেছে তখন আমাকে তো একশটা বই পড়তে হবে। ওই জার্নিটা আমাকে বুঝতে হবে, জানতে হবে। আমার দলের ছেলেমেয়েদের সেটা জানতে হবে। সেই জানার সময়টা আমাদের সিনিয়র আর্টিস্টদের নেই।
এছাড়া আমি প্রয়োগরীতি নিয়ে প্রথমে নিশ্চিত ছিলাম না যে, কোন প্রয়োগরীতি দিয়ে থিয়েটারটা করবো। কিন্তু আমার এটা মনে হচ্ছিল যে, যেহেতু নাটকের ভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের একটা সম্ভাবনা আমার এ নাটকে আছে সেহেতু আমি শারীরিকভাবে সমর্থ মানুষগুলোকে নির্বাচন করি। এখানে মনে হয়েছে, যৌবনের কোনো বিকল্প নেই। তারুণ্যের কোনো বিকল্প নেই। শরীরের দিক থেকে তারুণ্য নেয়ার দিক থেকে তারুণ্য।
তাদের শুধু অভিজ্ঞতাটা কম। এদের দিয়ে যদি আমি থিয়েটার করি তবে একদিকে আমি ফেইল করতে পারি। সে চ্যালেঞ্জটা আমাকে নিতেই হবে। কিন্তু যদি সাকসেসফুল হই তবে বাংলা থিয়েটারের একটা মোড় ঘুরে যাবে। প্রতিটা দলে এ সমস্যা আছে। তারুণ্যের প্রতিভা, তারুণ্যের সম্ভাবনাকে এক্সপ্লোর করা হচ্ছে না। প্রাচ্য নাটকটিতেও কিন্তু তরুণদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পুরনোদের মধ্যে যারা নিয়মিত তাদের আমি তরুণই মনে করি। আমার বয়স এখন ৫৭। আমি নিজেকে তরুণ মনে করি। আমার প্রতিদিনই জন্ম হয়, কারণ আমি থিয়েটার করি।

অনেক কাজ ও ব্যস্ততার মধ্যে আপনি সার্বক্ষণিকভাবে থিয়েটার করেন, এটা কিভাবে সম্ভব হলো?

মাথার মধ্যে অনেক চেম্বার থাকে। অনেক চেম্বার আমি শাট ডাউন করি। শাট ডাউন করি তারপর সে একা কাজ করে। আমার থিয়েটারের চেম্বারটা সব সময় খোলা থাকে। শুধু থিয়েটার নয়, শিল্প। কোনো গান শুনলেও আমি তাৎক্ষণিকভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠি।

বিশ্ব নাট্যদর্শনের অভিজ্ঞতা নিমজ্জনে কিভাবে যুক্ত হয়েছে?

আমার ও শিমূলের বড় একটা আগ্রহ আছে বিশ্বের নানা দেশের পেইন্টিং ও সঙ্গীত নিয়ে। আমি পৃথিবীর সব দেশ না ঘুরলেও অনেক দেশ ঘুরেছি। সেলিম অনেক সময় বলে, নিমজ্জনের দুই বন্ধু আমি আর সেলিম। সেলিম হচ্ছে অসুস্থ বন্ধুটা আর আমি হচ্ছি বিশ্ব ভ্রমণকারী। এটা ঠিক নয়। সেলিম আমাকে বলেছে। আমাকে যখন নাটকটা দেয় তখনই বলেছে। আমি বিভিন্ন দেশ ঘুরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সেলিমকে বলেছি। ইতিহাস, আর্কিওলজি গণহত্যা ইত্যাদি নানা বিষয়ে আলাপ হয়েছে।
সেলিমের দুর্দান্ত একটা পড়ালেখা আছে। আসলে সেলিমের চোখ দিয়ে আমরা অনেক কিছু দেখি। প্রয়োগের দিক থেকে যদি প্রশ্ন আসে যে, কি করে এ প্রয়োগটা করতে পারলাম? সেখানে এখনকার টেকনলজিকে বুঝতে পারার ব্যাপারটা কাজে লেগেছে। প্রসেনিয়ামকে বুঝতে পারার ব্যাপারটাও আছে। শুধু প্রসেনিয়াম না অঙ্গন থিয়েটার হিসেবেও নাটকটা ভালো লাগবে। মঞ্চে শেডিউল সমস্যার কারণেই এ নাটকটা প্রসেনিয়ামে করতে হয়েছে। কিন্তু আমার প্রসেনিয়াম ভালো লাগে না। আমি এখনো মনে করি, আমি এটা এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে বা মহিলা সমিতিতে মাটিতে করবো। করবোই। তখন কালো ভূমির কালো রঙটা দর্শকের চোখে লেগে থাকবে। তার ওপর শাদা ফিগারগুলো চলাফেরা করবে। অথবা কালোর ওপর কালো ফিগারগুলো চলাফেরা করবে।
আমি স্বাধীন। কিন্তু যেহেতু সমস্যাগুলো আছে সেহেতু প্রসেনিয়ামের ভেতর আমাকে ঢুকতে হচ্ছে। আমার রাজনৈতিক একটা এক্সপোজার বহুদিন ধরে আছে। ছাত্রজীবন থেকে আমরা মার্কস-অ্যাঙ্গেলস, লেনিন থেকে গ্রামসি, চার্চিল কিংবা পরবর্তী পর্যায়ে আঁদ্রে মারলো থেকে শুরু করে এখনকার দেরিদা বা অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ কেউ বাদ যাচ্ছেন না।
আমাদের কিন্তু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে। আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখিনি কিন্তু আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ভিয়েতনাম ওয়ার পেয়েছি। প্যালেস্টাইন হয়ে আমরা যেভাবে ইরাক ও আফগানিস্তানে পৌছেছি সেখানে আমাদের ধ্বংস ও হিংসার অভিজ্ঞতা আছে। আমাদের বিশ্ব অভিজ্ঞতা ইতিহাস থেকে নেয়া। এ অভিজ্ঞতা আছে আমাদের উপস্থিতির মধ্যে। কাব্যগতভাবে আমার যে ট্রেজারটা আছে বাংলা বা ইংরেজি সাহিত্যে। যেহেতু এ দুটি ভাষাতেই আমি পড়তে পারছি। সেটার ভেতর দিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। ওয়ার অ্যান্ড পিস ও আনা কারেনিনা থেকে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। গ্যেটের ফাউস্ট থেকে যে অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে তাতে মেফিস্টোফেলিসের সঙ্গে বুশের বা লাদেনের তুলনা করতে আমার খুব একটা অসুবিধা হয় না। এ অভিজ্ঞতা শিল্পে কিভাবে এলো সেটা একটা জটিল প্রশ্ন।
আমাকে অনেকেই গত তিনদিন ধরে প্রশ্ন করছে যে, আপনি এ নাটকটা কিভাবে করলেন? আমি আসলে জানি না। জানলে বলে দিতাম কি করে করেছি।

নাটকের টেক্সট থেকে আমাদের আশঙ্কা ছিল এ নাটকের বীভৎসতা ও ভয়াবহতা হয়তো দর্শক গ্রহণ করতে পারবে না। কিন্তু যখন নাটকটা দাড়ালো তখন আমরা দেখলাম, বীভৎসতাকে ছাপিয়ে অদ্ভুত এক সৌন্দর্য সামনে এলো। কোরিওগ্রাফি, লাইট, আলো ইত্যাদির মাধ্যমে।

আমার যে কোনো কাজের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে আমি একটা সৌন্দর্য ধরার চেষ্টা করি। বনপাংশুলের প্রদর্শনীতে বলেছি, আপনারা আদিবাসীদের যে সংগ্রামের কথা বলেন আমিও সেটা বলেছি। এগুলোর চেয়ে বেশি আমি যে মেসেজটা আপনাদের দিতে চাই সেটা হলো এরা সুন্দর মানুষ। এদের ধ্বংস করবেন না। আমি যদি স্টাবলিস করতে পারি আদিবাসীরা সুন্দর মানুষ আমরা যেভাবে বলি সে রকম জংলি নয়। ওর ভেতরের বিউটি যখন আবিষ্কৃত হবে তখন ওকে আমার চেয়েও ভালো মানুষ বলে মনে হবে। আমার মনে হয়, বনপাংশুল সে কাজটা করতে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং আমার নাটকের মূল লক্ষ্য সুন্দর একটা ভূমিতে ল্যান্ড করা।
নিমজ্জনে রবীন্দ্র সঙ্গীতের ব্যবহার যেভাবে করেছি সুর-তাল ঠিক রেখে লয়টা চেঞ্জ করে দিয়েছি। ইনডিয়ার প্রফেসর অরুণ সেন আমাকে বলেছিলেন ঋত্বিক ঘটকের ছাপ আমার ভেতর আছে। ঋত্বিক ঘটকের চেয়ে ভালো রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার কেউ করেছেন বলে আমার জানা নেই। এ নাটকে রবীন্দ্র সঙ্গীতের যে ব্যবহার হয়েছে তা আর কোথাও এভাবে হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
আরেকটা হলো কস্টিউম। সাদা ও কালো স্টকিং শুধু ব্যবহার করা হয়েছে। সেলাই বিহীন কাপড়। নিউট্রালিটি নিয়ে আসা হয়েছে। ছেলেমেয়েদের সাদা আর কালো কাপড়ের মাধ্যমে আদি মানুষের মতো করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ডিজাইন শিমূল করেছে। এই কস্টিউমের মাধ্যমে আমরা সময় ও জাতি নিরপেক্ষতার ব্যাপারটা দেখাতে চেয়েছি। এ পোশাকে কুশীলবরা প্রতিবাদ করার জন্য বা স্টেটমেন্ট দেয়ার জন্য দাড়িয়েছে এটা সহজেই মনে হবে।
যেহেতু নাটকে কোথাও লেখা নেই এটা কোথায় হচ্ছে, বাংলাদেশ, নিকারাগুয়া, কায়রো নাকি টোকিও। কোনো স্পেসের উল্লেখ নেই। যেন একটা স্পেসে একটা টেবিলে সব গণহত্যাকে এনে হাজির করা হয়েছে। সেখানে কোন কস্টিউম ব্যবহার করা হবে। যে কস্টিউম মানুষের কস্টিউম, কোনো জাতির কস্টিউম নয়। এ আন্তর্জাতিকতাটাকে আমরা অ্যাচিভ করতে চেয়েছিলাম।
আমি বলছি না শেকড়কে অস্বীকার করে আন্তর্জাতিকতা। আমার শিল্পের ভূমিতে আছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথকে ভিত্তি ধরে হাত বাড়িয়েছি ওপরের দিকে। তাকে বুকের মধ্যে রেখেই হাত বাড়িয়েছি। সিম্পলিসিটি অফ স্টালাইজেশন অফ কস্টিউম, মিউজিক অ্যান্ড অ্যাকশন। প্রক্রিয়াটা কিন্তু জটিল। ঢালী আল মামুনের অসাধারণ সেট এটাকে সহজ করেছে। এই প্রথম ভিডিও প্রজেক্টর ব্যবহার করা হয়। এটা ব্যবহার করা হয়েছে, বিমূর্ততা থেকে বেরিয়ে শিল্পের অভিজ্ঞতাকে সঞ্চারিত করার কাজে।
আরেকটা জায়গায় গুয়ের্নিকার ইমেজ ব্যবহার করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে গুয়ের্নিকা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। এটা করা হয়েছে। কারণ গুয়ের্নিকার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। আমি কিন্তু বাস্তবে কোনো বাস্তব চিত্রের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি না। প্যারালাল শিল্প অভিজ্ঞতা তৈরির জন্য এটা করছি।

নিমজ্জন থেকে মনে হচ্ছে, কনভেনশনাল নির্দেশকের জায়গা থেকে সরে এসে ফিল্মের ডিরেক্টরের অবস্থানের কাছাকাছি অবস্থান করছেন আপনি।

ডেফিনেটলি ফিল্ম ও নাটক দুটিই কিন্তু ডিরেক্টরস মিডিয়া। গান কিন্তু সিঙ্গার্স মিডিয়া। যতো ভালো গান কেউ লিখুক বা সুর করুক সেটা কিন্তু শিল্পীরই। বাংলাদেশের মঞ্চে নির্দেশকের ভূমিকা গৌণ ছিল বলেই কিন্তু থিয়েটার দাড়াচ্ছিল না। বহুমাত্রিক ভাবনা ছাড়া এটা সম্ভব নয়। আমার তিন যুগের অভিজ্ঞতা ও হাজার বছরের থিয়েটারের একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে আমার উপলব্ধি এমন যে, থিয়েটার নব আবিষ্কৃত মাধ্যম দ্বারা চ্যালেঞ্জনড হয়েছে। কিন্তু মানব জীবন প্রবাহের সঙ্গে নিগূঢ়ভাবে সম্পৃক্ত এ শিল্প মাধ্যম এক জাদুকরি কৌশলে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং আত্মীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নব জীবন লাভ করেছে।
টেকনলজির এ যুগে থিয়েটার তার ভাষার সঠিক ও সুচারু প্রয়োগ ঘটাতে টেকনলজিকে আত্মীকরণ করবে এটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবন যখন এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে থিয়েটারকেও এগিয়ে যেতে হবে। অনেক শিল্পমাধ্যম কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়েছে। হারিয়ে গেছে অনেক অভিনয় রীতি। আজকের মধ্যবিত্ত কিন্তু টেকনলজির ভেতর বসেও শেকড়কে অনুভব করে। কিন্তু আমরা শিল্পীরা সংযোগটা ঘটাই না। আমাদের ব্যর্থতা এখানে। আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের কোনো সংঘাত নেই। নিমজ্জন যে বাকটা ফেরাতে চেয়েছে আমাদের নাট্য ও শিল্প জগৎ যদি সেটাকে গ্রহণ করে। যদি বাকটা সঠিকভাবে ফেরানো যায় তবে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।

Wednesday, June 06, 2007

জিসম # মাহবুব মোর্শেদ

শরীর বিষয়টি শুরু থেকে আমার জীবনে ভীষণ আলোচ্য একটি প্রসঙ্গ হয়ে থাকলো। এ বিষয়ে অবশ্য আমার গুরু সৈয়দ আমাকে মাঝে মধ্যে বকাবাদ্য করেন। তিনি তরুণদের বিশাল অংশের মেয়েদের উরুতে হাত রেখে জীবন অতিবাহনের বেদনায় ব্যথিত। এদের যে সমাজ-সভ্যতায় কোনো অবদানই রইলো না এ নিয়ে তার আফসোসের কমতি নাই। আমি তর্কের খাতিরে গুরুর সাথে তর্ক করি। নইলে গুরু-শিষ্যের সম্পর্কটা অধীনতামূলক মিত্রতা হয়ে পড়ে। সম্পর্কের ডায়ালেকটিকসটা ফোটে না। বলি, কী কও গুরু, আমি তো দেখি শরীরেই আরাম। সব শাস্ত্র ঘেঁটে এসে হে পণ্ডিত, নারীতে আরাম। গুরু কয়, এইটা কী কইলি? জীবনের অভিজ্ঞতার কথা যদি ধরিস, তবে বলি, তোদের বয়সে নারীর শরীরকে মনে হইতো শরাবান তহুরা, বেহেশতের শরাবের নদী; সে শরাব আমি গেলাসে গেলাসে পান করেছি। এখন কী মনে হয় জানিস? স্রেফ একটা চকলেট-লজেন্সও যদি মনে হইতো, তাহলেও হইতো। আমি বলি, তবে তো সেই একই ঘটনা ঘটলো গুরু। যুগে যুগে গুরুরা শিষ্যকে একই কথা বইলা আসলো আর শিষ্যরাও থোড় বড়ি খাড়া... গুরুর যৌবনকালের দিকে ধাবিত হইলো। আমি একটা কথা কই গুরু, যদি কিছু মনে না নেও তবে সত্য হইলো ওইটা তোমার প্রৌঢ়ত্বের সত্য আর এইটা আমার যৌবনের সত্য। যুগে যুগে গুরুরা ওই এক কথা কইয়া গেল। আর শিষ্যরাও উল্টাপথে মদন রসে মন মজালো। গুরু বুঝে, আমি যা বলি তাই করি। তাই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কন এই কারণেই পৃথিবীটা এইখানে আইসা পৌঁছাইলো। আমি দেখলাম গুরু হতাশ। এটা সহ্য হওয়ার নয়। তাই এইবার গুরু-শিষ্য মিলে পৃথিবীর বর্তমান ভোগবাদীতাকে গালাগাল করতে থাকি। এই ফাঁকে পাঠিকাদের উদ্দেশ্যে বলে রাখি আমার নাম রাকেশ, গুরু বলেন রাস। আর গুরুর নাম সৈয়দ, আমি কিছু বলি না। গুরু গৌরবর্ণ, চক্ষু বড় গোলগোল চকচকে, হাইট ভালো, আমি আর গুরু যখন রাস্তায় হাঁটি তখন মনে হয় গুরু দোতলা বাসের ছাদ থেকে কথা বলছে। এই নিয়ে লোকে রঙ্গ-তামাশা করে। তা করুক, তথাপি গুরুর একটা জিনিস কিন্তু লোকে তেমন একটা জানে না। সবাই ভাবে তিনি আমার অ্যাবনরমাল ফ্রেন্ড, উনি বিদ্বান ব্যক্তি, অমায়িক, মিশুক। আর পারতপে যৌন বিষয়ে হয়তো একটা কথাই তাদের মনে হয় যে, আমার গুরুর ধোন নাই। বন্ধু-বান্ধব জিজ্ঞেস করে তোর সৈয়দের বয়স কত? সঠিক বয়স বলতে গুরুর নিষেধ। এমন কি সাল-বিহীন জন্ম-তারিখও বলা চলে না, তাই বলি এ্যারাউন্ড ফিফটি। তবে তো ওনার খাড়ায় না, কি বলিস? এই কথার সদুত্তর হয় না। কিন্তু মোম একটা উত্তর দিতে হয়, তাই বলি ‘যাইও’। গুরুর যেসব বিষয় লোকে জানে না সেগুলো একে একে বলি।
তারও আগে বলা দরকার এই গল্পের ভূমিকাটা কী। অর্থাৎ কী বিষয় নিয়ে এই গল্প তৈরি। সে ২০০৩ সালের জুন মাসের কথা। আমার জীবনে একটা ভয়ানক প্রলয় উপস্থিত হলো। সামান্য একটা ভুলের জন্য সমস্ত বন্ধু আমাকে ছেড়ে দিলো। ঘটনা কিছুই না, এক পার্টি-ফার্টি কিছু হবে। জেলা শহরেও আজকাল এগুলো হয়। ড্রিঙ্কস কিছু ছিল। ড্রিঙ্কস করলে আমি একটু জ্ঞানী-জ্ঞানী কথা বলি, তাই বন্ধুরা আমাকে ওভারডোজ করে দিলো। আমার তখন হঠাৎ একটা হিন্দি গান মনে পড়ে। সবলোগ পিতে হ্যায় শরাব পানি মিলাকে, ম্যায় তো পিতে হুঁ শরাব জওয়ানি মিলাকে। বন্ধুরা ওয়াহ ওয়াহ করে উঠলে আমার উৎসাহ বেড়ে যায়। প্রাসঙ্গিকভাবে বলে রাখি, পার্টিতে বন্ধু-স্ত্রীরাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উপস্থিত ছিল। মফস্বলের মেয়েরা এইসব ব্যাপারে একটু বেশি ফাস্ট। ওই হিহি হো হো আর খোলামেলা পোশাক-আশাকে। আসরটাকে আমি হিন্দি সিনেমা নাকি হলিউডি সিনেমাই ভাবলাম জানি না। একে তো মদের ঘোর অন্যদিকে মহিলাদের সেক্সি আউটলুক। মরার ওপর খাড়ার ঘা। হাতের কাছে এক বন্ধু পতœীকে পেয়ে কিস বসিয়ে দিলাম। আর যাবে কোথায়? ওই ঝাকানাকা ফাস্ট মেয়েও ফোঁস করে কেঁদে দিলো, তার স্বামী মদের বোতল বাগিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসলো। পার্টি ফার্টি লাটে উঠে বিচার সভা বসলো। আমার গরম মাথা হিম হয়ে আসলো। এই মুহূর্তে সেটা অসঙ্গত বিধায় আমি যারপর নাই মাতলামি করতে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত আমাকে মাতাল অবস্থায় মাফ চাইতে হলো, আর আমি যেহেতু অবিবাহিত, তাই এইসব আসরে আমাকে নিষিদ্ধ করা হলো। সেই থেকে আমি বন্ধুবিহীন। এবং সবার অলে গা ঢাকা দিয়ে শহরে থাকি। বেনাপোল থেকে একটা ইন্ডিয়ান ভিসিডি প্লেয়ার আনিয়ে সারাদিন হিন্দি-বাংলা-ইংরেজি ছবি দেখি, গান শুনি। টিভিতে ডিশের লাইন আছে। সারাদিন চ্যানেল ঘুরাই আর বিড়ি-সিগারেট ফুঁকি। সেক্সের ধান্দা বাদ, তলে তলে বয়স তো আর কম হলো না। এই বয়সে এত ঝক্কি আর সইতে পারি না। তাই হাত মেরে যা হয় তাতেই সই। এইভাবে জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বর গেল।
আমি জ্ঞান পিপাসু। যা হওয়ার তাই হলো বর্তমান সিনেমা-বাজার নিয়া আমার বিস্তর জ্ঞান জমলো। জ্ঞানের একটা নিজস্ব ধর্ম আছে একটুখানি জমলেই তা পেটের বাহির হওয়ার জন্য আকুপাকু করে। কী করি কী করি। কেউ আমার দিকে ফিরে তাকায় না। হয়তো ভাবে, লোকসমে যদি তুমি চুমু খাইতে পারো তোমার কাছে আড়ালে ভদ্রলোকের বউ ছেড়ে দিলে কী হবে? আমি এইটুকু বলার অবকাশ পাই না যে ভাই আমি অতো খারাপ লোক না।
এই খারাপ সময়ে আমার জীবনে সৈয়দের আবির্ভাব। কোন বংশের সৈয়দ কে জানে। সন্ধ্যাবেলা মনটা এমনিই একটু আকুপাকু করে তাই মাঠের মধ্যে বসে ছিলাম। চারদিকে হালকা অন্ধকার। গোধূলির আলো মিলিয়ে যাবে যাবে। এমন সময় ফাঁকা মাঠে আমার সামনে অপরিচিতি এক ব্যক্তির আবির্ভাব। বলে, আপনার মধ্যে তীব্র যৌন আতৃপ্তিবোধ আছে। আমি ভাবলাম, কে এই ব্যক্তি যে একেবারে চিন্তার গভীরে সেঁধিয়ে যায়? হতচকিত হয়ে তার দিকে তাকাতে চাইলাম কিন্তু অন্ধকারে মুখ দেখা গেল না। রবীন্দ্রনাথের মণিহারা গল্পটির কথা মনে পড়ে গেল। আমিও তাকে পরখ করে নিতে চাইলাম। কোনো কথা বলে চুপচাপ তার দিকে তাকালাম, তারপর আবার আগের মতো উদাস বসে থাকলাম। জীবনে এত ঘাট মাড়িয়েও এত বন্ধু এত প্রেম তবু তৃপ্তি এলো না তো? ভেবেছিলেন আপনার মতোই আশপাশের দুনিয়া দেখলেন তা নয় এখন একা এই মাঠে বসে ভাবছেন জীবনের তবে কী মানে আছে? গা ঝাড়া দিয়ে উঠুন। শিড়দাঁড়া টানটান করে দাঁড়িয়ে পড়–ন। সত্যি বলতে কী, একটা বল পেলাম যেন তার কথায়। বললাম, আপনি কে? কী আপনার পরিচয়? উনি বললেন, আগে আলোয় চলুন। সেই পরিচয় সৈয়দের সাথে।
প্রথম দিনেই গুরু মানলাম। সম্বোধনে সে দুই ধাপ আমি একধাপ নিচে নামলাম। তুই-তুমি। মাঝে-মধ্যে অবশ্য ফাকচুয়েট করে। তুই-তুমি। তুমি তুই। হাজার হলেও গুরু বলে কথা। সৈয়দের মানসকাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সে ২৫% আইডিয়ালিস্ট + ১৫% লিবারেল ডেমোক্রেট + ১০% উপযোগবাদী + ৩০% বন্ধু অন্তপ্রাণ + ১০% অলস + ৫% শরীরী + ৫% স্বার্থপর। পড়াশুনায় ভয়াবহ সামন্ততান্ত্রিক। আমার ব্যাপারে সৈয়দের মূল্যায়ন হলো আমি ৫০% শরীরী + ২৫% অশরীরী + ২৫% মার্কসবাদী।
মার্কসবাদ কী জিনিস আমি জানতাম না। সৈয়দই প্রথম আমাকে মার্কসবাদ বিষয়ে জানালো। এরকম একজন আধা-বুর্জোয়া আধা-সামন্তবাদী কিভাবে আমাকে মার্কসবাদের মতো বিধ্বংসী দর্শনের খোঁজ দিতে পারলো এখন আমি ভেবে অবাক হই। পরিচয়ের সপ্তাহ কি পকাল পরে একদিন গুরুর বাড়িতে গেলাম। বাড়ি দেখে তো আমার চু চড়কগাছ। গ্রন্থময় এক বাড়ি। দান্তে, তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, গ্যাটে, শেক্সপীয়র, রবীন্দ্রনাথ এইসব লেখকের খণ্ড খণ্ড ভরা। টীকাভাষ্য, উপনিষদ, বাইবেল এগুলাও আছে। এক কথায় বলা যায় সমাজের আধুনিক যুগে প্রবেশের পরের আর কোনো বই তার বাড়িতে ঢোকেনি। যাই হোক, আমি বিস্মিত এবং খানিকটা হতোদ্যম হয়ে পড়লাম। লাঞ্চের পর তাকে ধরলাম, গুরু কাসিক পড়ো ভালো কথা, কিন্তু এত হাজার হাজার বইয়ের মধ্যে আধুনিক যুগের সাহিত্যের ছিটেফোঁটাও নাই এইটা কেমনে হয়? গুরু বলে, সবটা এতেই আছে। অর্থাৎ কিনা আধুনিক সাহিত্যে যা আছে, এগুলোর মধ্যেও তাই আছে। সত্যি কথা বলতে কি, শিল্প বিপ্লবের পর পৃথিবীতে ক্রিয়েশন বলতে কিছু হয়নি। সবই এন্টারপ্রেটেশন। আমি খোঁচানোর জন্য বললাম তুমি ভীষণ সামন্তীয়। এইটুকু বলে আমি থামলাম কেননা এইতো তার সাথে শেষ কথা নয়। আর একটা কথা। একটু পড়াশোনা না থাকলে আলাপ ঘন হয় না।
যাই হোক, সৈয়দের মাধ্যমে আমার সিনেমা-জগতে দাসযুগ আর সামন্তযুগের কিছু বইয়ের অনুপ্রবেশ ঘটলো। রীতি অনুযায়ী আমার বাড়িতেও সে এক দুপুরে লাঞ্চে আসলো। আমার সংগ্রহে অসংখ্য সিডি দেখে তারও চু চড়কগাছ। বয়স হয়েছে। তবু যৌবন, যৌনতা ও ফ্যান্টাসির এই অসামান্য উৎসার কার না ভালো লাগে। তাকে আমি জিসম ছবির কথা বলি। বলি যে, জিসম মানে হলো শরীর। এ ছবিটা সামনে মুক্তি পাবে। এতে অভিনয় করবেন বোম্বের টপ মডেল বিপাশা বসু। ধারণা করা হয় শি ইজ ওয়ান অফ দ্য সেক্সিয়েস্ট এ্যান্ড মোস্ট সেনসুয়াস গার্ল ইন দ্য অরিয়েন্ট। উই আর ওয়েটিং ফর হার লেটেস্ট আউট-বার্স্ট। সৈয়দ বলে তুমি আছ পুঁজিবাদের প্রোডাক্টের রিয়েলিটির জগতে। ইট ইজ সাম শর্ট অফ হাইপার-রিয়েলিটি। এখন তোমার আর আমার বন্ধুত্ব হইতে হইলে দরকার মার্কস আর এ্যাঙ্গেলস। প্রোডাকশন রিলেশন বুঝতে সেই থেকে আমার প্রগতি প্রকাশনীর বই পড়া শুরু। আমি বই আনি, গুরু সিডি নিয়ে যায়। এইভাবে আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়ে ওঠে। একদিন আমি ভাবি এই যে অসম বন্ধুত্ব, এইটা কেন? সৈয়দকে একটা পরীা করা যাক তো। তো, একদিন আমি রাত্রে তার বাসায় থাকি। পরীা করি ছেলে ছোকরার পাছা মারার তাল আছে কিনা। এই বয়সে এমন ভীমরতি দেখা দিতেই পারে। বলাবাহুল্য সৈয়দ পরীায় উত্তীর্ণ হলো। এখানেও সে আইডিয়ালিস্ট। মেয়ে ছাড়া লাগায় না। এরপর তার সাথে আমার যৌন বিষয়ে খোলামেলা কথাবার্তা হতে শুরু করলো। আমি আমার হিস্ট্রি বললাম। সে বললো, আমি তোমারে আর হিস্ট্রি আর বলি না। বরং আসো আমরা একটা সাইকোলজিক্যাল গেম খেলি। তোমারে আমি আমার এক পুরানা বন্ধুর কাছে নিয়া যাই। তুমি ওর কাছ থেকে আমার হিস্ট্রির একটা অংশ জাইনা নাও। তবে শর্ত থাকে, তুমি জেলাস হইতে পারবা না। এই কথা হয়ে থাকলো। তথাপি আজ যাই কাল যাই করে করে তার বন্ধুর বাড়ি আর যাওয়া হয় না। আমিও সৈয়দকে ভরসা রেখে এদিক সেদিক একটু ভাগ্য টেস্ট করতে থাকি। গুরু মধ্যযুগ থেকে এক নায়ককে ধরে এনে আমার সাথে তুলনা দেয়। বলে, এই খাই-খাইপনার নাম হলো ডন জুয়ানপনা। গুরুর ভর্ৎসনায় আমার মন কঠিন হয় না। মেয়ে দেখলে মাল মাথায় ওঠে। ভদ্রলোকের স্ত্রী-কন্যা কেউই বাদ যায় না। এই দেখে ভদ্রলোকেরা আমার কাছ থেকে ১০০ হাত দূরে থাকে। পারতপে আমার সাথে তাদের স্ত্রী-কন্যার পরিচয় করায় না। আমার এই গতিক দেখে গুরু ব্যথা পায়। বলে, রোসো। এইভাবে ক্রিয়েটিভিটির বারোটা বাজানোর অধিকার তোমার নাই। একটা উদ্বেগবিহীন সেক্সুয়াল লাইফ দরকার তোমার। চলো, কালকেই তোমারে আমার বন্ধুর বাড়ি নিয়া যাই। উদ্বেগবিহীন যৌনজীবনের সাথে বন্ধুর বাড়ির সম্পর্ক কী। গুরু বলে, রোসো।
গুরুর পীড়াপীড়িতে একদিন তার সঙ্গে শহরের দণি দিকে রওনা হলাম। ধরা যাক, তার বন্ধুর নাম রেবেকা বা লতা। আসল নাম এখানে উহ্য থাক। অবশ্য তাতেও কিছু আসে যায় না। পাঠিকারা অবগত যে গল্প গল্পই। যথারীতি পুরানা ধাঁচের বাড়িটিতে আমরা ঢুকে পড়লাম, বসবার ঘরে বসেও পড়লাম। ততোদিনে জিসম ছবিটি আমার দেখা হয়ে গেছে। দেখলাম সাাৎ বিপাশা বসু হেঁটে আসছেন।
আমার নাম লতা।
সৈয়দ বলল, ও বন্ধু; আমি বললাম, রাকেশ।
সৈয়দ প্রথমেই একটা গভীর পাঁচ মিনিটের চুমু এবং আমার সামনেই লতার দুধ থেকে নিয়ে পাছা পর্যন্ত হাতিয়ে ফেললো।
এরাউন্ড ফোর্টি। বোঝার উপায় নাই। ঈষৎ কৃষ্ণবর্ণ। আমার অবস্থা বলার মতো নয়। লতা না রেবেকা না বিপাশা আমাকে ইঙ্গিতে বসতে বললেন এবং সৈয়দের গাল কামড়ে একেবারে লাল করে ফেললেন। হঠাৎ তাকে ছেড়ে আমার দিকে নজর দিলেন। ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলেন। কোথায় থাকি কী করি ইত্যাদি। সৈয়দ ততোণে দাঁড়ানো থেকে সোফায় বসে পড়েছে, লতা না বিপাশা না রেবেকা দাঁড়িয়েই ছিলেন আলুথালু বস্ত্রে। গুরু তাকে হোতকা টান মেরে কোলে বসালেন। একটানে ব্লাউজ খুলে নিপল চুষতে আরম্ভ করলেন। উনিও খুব সিরিয়াসলি আমার সাথে কথা চালিয়ে যেতে থাকলেন। আমার তখন মৃত্যুময় অবস্থা। এর চেয়ে আমাকে উলঙ্গ করে রডের বাড়ি দিলেও হতো। আমি জানুয়ারি কি ফেব্র“য়ারির শীতে ঘামছিলাম আর কাঁপছিলাম। ভেতরে শ্বাসকষ্ট টের পাচ্ছিলাম এবং মনে হচ্ছিল আমি তুনি মারা যাব। তারা যখন আরও ব্যস্ত হয়ে পড়লো তখন আমি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। বিশাল ফাঁকা বাড়িটিকে আমার একটা ডাইনির বাড়ি বলে মনে হলো। যে ডাইনি শুধু পুরুষের রক্তই পান করে চলে ক্রমাগত। আমি স্তম্ভিত, নির্বাক ও স্মৃতিশক্তি বিলুপ্ত হয়ে কতণ দাঁড়িয়েছিলাম জানি না। সৈয়দ আমার ঘাড়ে হাত রাখলে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। তার দিকে তাকাতে পারলাম না। ফিরতে ফিরতে বলেছিল, এতো আধুনিক ছেলে তুমি। সিনেমা দেখ, এক্স-ফেক্স কিছু বাদ দেও না। দেখলা তো সইতে পারলা না। জেলাস হইলা। শোনো, তোমারে তিনটা কথা বলি
ক. শরীরের বাস্তব ও অধিবাস্তব এক ব্যাপার নয়। তোমার শত-সহস্র হাইপার-রিয়েল চর্চা তোমাকে শরীরী মূল্যবোধের বাইরে টেনে আনতে পারে না।
খ. শরীর এমন এক দুর্গ যা সব সময় মরচে পড়া তালা দিয়ে বদ্ধ থাকে। যার চাবি কখনোই তুমি খুঁজে পাও না। দুর্গে ঢুকতে হলে তালা ভাঙতেই হয়। এ এমন এক দুর্গ কেউ নিয়মিত যাতায়াত করলেও তা তালাবদ্ধই থাকে অন্য সবার কাছে। অন্য কেউ পুনরায় তালা ভেঙে ঢুকে পড়লে দুর্গ কিছুতেই আর তোমার থাকে না।
গ. শরীর সব সময়ই ঈর্ষা, ক্রোধ, হিংসা, জিঘাংসা আর জুগুপ্সার বসতি।
আমি তর্ক করার মতো অবস্থায় ছিলাম না। সত্যি কথা বলতে কি তার কথার প্রতিবাদে আমি কেঁদে ফেললাম।
সৈয়দ বলল, আমার সাথে চল। তোকে আজ এক অদ্ভূত জিনিস পড়তে দেব। ভেবেছিলাম সে আমাকে মার্ক্যুইস দ্য সাদ পড়তে দেবে। কিন্তু খাওয়ার পর রাত্তিরে তার রিডিংরুমে সে যে গল্পটা আমাকে পড়তে দিলো তা হলো ক্রোয়েটজার সোনাটা। গুরু ওষুধ জানে। আমার মাথা এক্কেবারে ঠাণ্ডা হয়ে এলো।
পরদিন ভোরবেলা সৈয়দ আমাকে জাগিয়ে তুললো। অত্যধিক শীতের সকাল ছিল সেটা। সৈয়দ পথ্যও জানে ভালো। গরম কফিতে একটু ব্রান্ডি মিশিয়ে খেতে দিল। তাতে আমার চেতনা ভেতর থেকে সাড়া দিলো। আমি গুরুর দিকে তাকালাম। সে ইতিমধ্যে স্নান সেরে নিয়েছে। বললো, রাকেশ আসো আমরা একটা গেম তৈরি করি। খেলাটা এই যে তুমি জীবনের যে জায়গায় আছে সেখানে আমি পৌঁছাবো আর আমি যেখানে আছি সেখানে তুমি আসবা। ধরা যাক, মাঝখানে একটা দেয়াল আছে, এইটা রেবেকার শরীর। আমি সেখানে পৌঁছে গেছি। তুমিও পৌঁছাও। আসো আমরা পরস্পরকে ক্রস করে স্থান বদল করি।
আমি বুঝি গুরু কী বলতে চায়। আমার সেক্সুয়াল লাইফে এটা নতুন ঘটনা। গুরু কি দেবতা নাকি? একবার পজিটিভলি ভাবি আবার পিছিয়ে আসি। নৈতিকতায় আঘাত লাগে। শেষমেষ বলি, এইটা কী কইলা গুরু। উনি তোমার বন্ধু। আমার শ্রদ্ধার পাত্র, তুমি পাগল হইয়া গেছ। আমার সামনে আর এই ধরনের কথা বলবা না। তুমি বরং এক কাজ করো, আমারে কিছুদিন মার্কসবাদ শেখাও। কম্যুনিজমে দীা দেও।
দেখলাম গুরু রাজি। তাই পরবর্তী তিনমাস আমরা কম্যুনিজম চর্চায় ব্যস্ত থাকলাম। গুরু মার্কস-এঙ্গেলসের নির্বাচিত কিছু বই আমাকে পড়তে দিলো আর সপ্তাহে সপ্তাহে পাঠচক্র শুরু হলো দু’জনের। আমরা যথাক্রমে পুঁজির বিকাশ, প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা, উদ্বৃত্ত-মূল্য, সর্বহারারা একনায়কত্ব, জগৎ পরিবর্তনের উপায়, তত্ত্ব ও চর্চা, পার্টি ও ব্যক্তি, বিপ্লবী লড়াইয়ের আবশ্যিক শর্ত ইত্যকার বিষয়ে আলোচনা করলাম। সৈয়দকে দেখলাম এই আলোচনার ফাঁকে তরুণ সমাজের উপর মহাবিরক্ত। এরা দুনিয়াটাকে চেঞ্জ করতে চায় না বুঝলা? এরা চায় শরীর। মেয়ে মানুষের উরুতে হাত রাইখা তিন তিনটা জেনারেশন চইলা গেল। কিছুই হইলো না। সব আফিমে ডুইবা রইলো। শরীরের বাইরে এরা দুনিয়াটাকে দেখলো না। তুইও তাই। বলি, সময় থাকতে শরীরটাকে ছাপায়ে ওঠ। আমি বুঝি, গুরু আমাকে আড়ালে আবডালে নেগেশান অব নেগেশান দিয়া রেবেকার শরীরের দিকেই টানে। কিন্তু আমার নৈতিকতা সায় দেয় না।
একদিন আমি সৈয়দকে বলি অনেক তত্ত্ব তো বুঝলাম। আসো এবার প্রাকটিস শুরু করি। পার্টি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করি।
ভালো কথা। পার্টি কী?
বিপ্লবের অগ্রগামী অংশ। শ্রমিক শ্রেণীর সহযোগী একটি পাতিবুর্জোয়া দল। শ্রেণীগতভাবে যারা নিজ শ্রেণীকে খারিজ কইরা আসে।
হইলো না। পার্টি হইলো একটা সম্পর্ক। অসংখ্য মানুষের সম্পর্কের সূত্র হইলো পার্টি। দুইজনে পার্টি হয় না। গঠন করলেই পার্টি হয় না। দুই থেকে তিন তিন থেকে বহুতে যাইতে হয়। এখন কথা হইলো তুই দুই থেকে তিনে যাইতে রাজি কিনা।
হ রাজি।
তাইলে রেবেকারে রিক্রুট কর। দেখা যাক, আমাদের তিনজনের পার্টি কেমন জমে?
এ কথায় আমার হাড়গোড়সহ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। আমি ভেবেছিলাম আমার প্রসঙ্গে গুরু রেবেকার কথা ভুলে গেছে। কিন্তু এই কথায় আমি নতুন করে অস্বস্তিতে পড়ে যাই। সে বলে
তুই আছস কনসেপচ্যুয়ালি পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পণ্যতাড়িত অবস্থায়। আমি আছি আধাসামন্তীয় আধাপুঁজিবাদি অবস্থায়। রেবেকা নারী। অবশ্যই নিপীড়িত গোষ্ঠীর সদস্য। তাকে আমাদের সঙ্গে আনতে হবে। আমাদের তিনজনের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
আমি কেমনে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাই? মনু বলেছেন, কুত্রাপি গুরুপতœীর সাথে প্রেম করবা না। এ অবস্থা হলে তো সৈয়দ আমার গুরু থাকে না। সে আমার মার্কসবাদের গুরু।
পরের এক সপ্তাহ আমি গুরুর সাথে দেখা করিনি। আমার ব্যক্তিগত গুহার মধ্যে আত্মরতিতে মগ্ন হয়েছিলাম। সারা দিন টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে এক সপ্তাহ পার করে দিলাম। হঠাৎ এক সকালে সৈয়দের বাড়ির সামনের চায়ের দোকানদার আমার বাড়িতে এসে হাজির। কী ঘটনা? সৈয়দ সাহেব ভীষণ অসুস্থ, আপনাকে যেতে বলেছে। সাথে সাথে বেরিয়ে পড়লাম। দেখলাম সে সত্যি অসুস্থ এবং মৃত্যুশয্যায় শায়িত। মুখ তার রক্তশূন্য, চোখগুলো কোটরে পৌঁছে গেছে। তার শীর্ণ একটা হাত হাতে নিয়ে মুঠোর মধ্যে ভরে ফেললাম। এতো তাজা লোকটার এই হাল? তবে কি ভিতরে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ভয়াবহ অসুখ ছিল?
গুরু ইশারায় আমাকে তার আরো কাছে সরে যেতে বললো। ফিসফিস করে বললো যা রেবেকাকে নিয়ে আয়। ওর বাড়িটা চিনতে পারবি? আমি তার কথায় সায় দিয়ে উঠলাম। এতটাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম যে ওখান থেকে যে কোনো মূল্যে উঠতেই চাচ্ছিলাম। পথ চিনে চিনে রেবেকার বাড়ি পৌঁছালাম দুপুরে। তিনি বাড়িতেই ছিলেন। আমাকে দেখে হাসলেন এবং চিনতে পারলেন। তার মধ্যে অসাধারণ সৌন্দর্যের পাশাপাশি একটা পবিত্রভাব দেখতে পেলাম। সংবাদ শুনে তাড়াতাড়ি নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বের হলেন।
রিকশায় ওঠার পর তিনি কথা শুরু করলেন।
দুঃখিত, সেদিন আপনার প্রতি সুবিচার করা হয়নি।
আমার একটা প্রশ্ন আছে।
বলুন। এই বলুন উচ্চারণেই তীব্র একটা ব্যক্তিত্বের ছটা টের পেলাম।
নারী হিসেবে এটা কী আপনার জন্য অবমাননাকর নয়?
কোনটা অবৈধ যৌন সম্পর্ক, সৈয়দের সাথে সম্পর্ক নাকি তোমার সামনে যৌনতা?
আমি চুপ থাকলাম।
জেনে রেখ। এটা যৌনতা নয় এটা একটা যুদ্ধ।
কেমন?
সৈয়দ কি তোমাকে কিছুই বলেনি?
না। আপনার কাছে শুনতে বলেছিল।
শোনোনি কেন এতদিন?
ভয় ছিল।
পাছে জড়িয়ে যাও। সৈয়দ জড়াতে বলেছে, তাই না?
রেবেকো না লতা না বিপাশা তারপর আমাকে সৈয়দের জীবনের গল্পের একটি অংশ বলেছিলেন। তখন রেবেকার সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল একটা ইউজি পার্টি করার দৌলতে। সেভেনটিজের এক বিুব্ধ সময় ছিল সেটা। হত্যা, বদলা হত্যা, গুমখুন, জেল-জরিমানা। সৈয়দ ছিলেন পার্টির নিচের সারির সদস্য। এদের মৃত্যুর খবরই বা কে রাখে আর জেলেই বা কার কী আসে যায়? আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা অবস্থায় তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং পাক্কা দশবছর পর জেলে থেকে বের হন। আগেই বলেছি, সৈয়দ ছিলেন নিচের সারির অনুল্লেখযোগ্য একজন নেতা। ফলে তার এই জেলজীবন কারো নজরে পড়েনি। যেমন এমন আরও অনেক মৃত্যুর কথা কেউ কোনোদিন জানতে পারবে না। তেমনিই ছিল তার গোপন জেলজীবন। তার উপর অবর্ণনীয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। ফলে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। অধিকাংশ সময় নির্যাতন-ভীতিতে থাকতেন। তিনি যখন জেল থেকে বেরোন তখন আণ্ডারগ্রাউন্ড ওভারগ্রাউন্ড কিছুই খুঁজে পাননি। নিজের শহরে ফিরে দেখেছিলেন, তার জন্যে পর্যাপ্ত সম্পদ রেখে তার বাবা মরে গেছেন। এরপর রেবেকাকে খুঁজতে থাকেন। রেবেকাকে খুঁজে পান তার শ্বশুর বাড়িতে তার স্বামীকেও চিনতে পারেন। বলাবাহুল্য সব গল্পের মতোই তার স্বামীটিও ছিল সৈয়দের শত্র“পরে লোক। রেবেকার স্বামীর শহর থেকে রেবেকাকে তিনি নিজ শহরে নিয়ে আসেন তার আরও পাঁচ বছর পর, যখন তার স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। তাকে এনে রাখেন নিজের পুরানা পৈত্রিক বাড়িতে।
শোনো ও যখন যৌন সম্পর্ক করে তখন নিজের জীবনের ব্যর্থতা, আমার মৃত স্বামীর প্রতি ােভ, এই ব্যবস্থা সকল কিছুর বিরুদ্ধে তার শারীরিক প্রতিবাদ জানায়। আই এনজয় ইট।
এতকিছু জানার পর আর সৈয়দের সামনে যাওয়া যায় না। শ্রদ্ধা, অবসাদ ও বেদনায় আমি নুয়ে পড়ি। তার এই সংগ্রামমুখরতার সামনে নিজেকে অনেক ুদ্র মনে হয়। রেবেকাকে পৌঁছে দিয়ে আমি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং ওষুধ কিনতে বাজারে যাই। রেবেকা তার দায়িত্ব নিলে কিছুটা ভারহীন বোধ করি। ডাক্তার এসে দেখে যায়। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট ফুঁকতে থাকি। মানুষের জীবন, জীবন-অভিজ্ঞতা, উত্থান, পতন, গোপন বেদনা আমাকে জীবন সম্পর্কে এমন একটি আবিষ্কারের মুখোমুখি দাঁড় করায় যাকে স্বচে দেখতে গেলেও আমি ভয় পেতে থাকি। পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে থাকে। দুই কি একদিন এভাবেই গেল। তৃতীয় দিনে একটু স্বাভাবিক হয়ে এলাম। সৈয়দের বাড়িতে চলাফেরায় স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠলাম আবার। এমনকি তার সামনে যেতেও। দেখলাম মৃত্যু তার দিকে ঘনিয়ে আসছে। গালের দু’পাশ বেয়ে সাদা কষ পড়ছে। পুরাতন নির্যাতনের বেদনা ফিরে আসছে তার শরীরে। তাকে আরও গরম কাপড়ে ঢেকে দেয়া হলো। আমি আর রেবেকা সারারাত শিয়রে বসে থাকলাম। তার কপালের রেখাগুলো দপদপ করছিল আর চোখ থেকে পানি ঝরে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছিলো। বিকেলের দিকে শ্বাসকষ্ট আর কাশির গমক উঠতে শুরু করলো। ওই সন্ধ্যায় বিপাশা আমাকে সৈয়দের অদ্ভূত অনুজ্ঞার কথা শোনালেন রিডিংরুমে ডেকে নিয়ে। বললেন, সে চায় তুমি আমাকে তার সামনে চুমু খাও। হি লস্ট এভরিথিং বাট মি। সে দেখে যেতে চায় তার অনুপস্থিতিতে তুমি আমার জন্য আছ। হি হ্যাজ সিলেকটেড ইউ ফর মি।
আমি চুপ করে থাকলাম। বিপাশাও। অনেক পরে বললো, অনেস্টলি বললে সৈয়দের পরে আমি তোমাকে ভালোবাসি। ওর কাছে তোমার পুরোটা শুনেছি। অবশ্য একান্তই যদি তুমি না চাও...। যদি কোনো অনুভূতিই না জাগে তোমার। উঠে দাঁড়ালেন তিনি। আমি বললাম, একটু বসুন। আমি তার শরীরের দিকে তাকালাম। প্রথম দিনের ঘটনাটি নিমেষে চোখের সম্মুখ দিয়ে ভেসে গেল। কী অবাক, তার সেদিনের সেই যৌনকাতরতা এই প্রথম আমার সংবেদনে এসে ঘা মারলো। তার স্তনের কথা মনে পড়লো। অনুভব করলাম হয়তো আমি তাকে ভালো বাসতেও পারি। আমি তার চুল মুঠো করে ধরে এক পলকা একটা চুমো খেয়ে বসলাম। ওইটুকুতেই তার শারীরিক সম্মতি টের পেলাম।
রেবেকা না লতা না বিপাশা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সৈয়দের বিছানার কাছে গিয়ে হয়তো বললো, হ্যাঁ সে রাজি হয়েছে। এবার তুমি নিশ্চিন্তে মরতে পারো। তারপর আমাকে ডাকতে এলো। হাত ধরে টেনে নিয়ে সৈয়দের বিছানার কাছে দাঁড় করলো। সৈয়দ চোখ মেলে দেখলো আমরা পরস্পর চুমু খাচ্ছি। খুব গাঢ়, অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে। সে জানলো এই প্রথম। তাঁর খুশির জন্যই। কিন্তু, এ দ্বিতীয়বারের ঘটনা। শরীর এভাবেই দূরে সরে যায়। অবশ্য খুব বেশি দূর যেতে পারে কি? তার কষ্ট দেখেই কিনা জানি না আমি ও রেবেকা না বিপাশা না লতা তার আশু মৃত্যু কামনা করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হলো। খুবই কষ্টকর এবং বেদনাদায়ক এক মৃত্যু। আমাদের গোপন পার্টির একজন কমরেডের প্রস্থানে আমরা শোকাহত হলাম।