Tuesday, March 28, 2006

লোলিতা রিলোডেড
মাহবুব মোর্শেদ

ঘটনাক্রমে এক ট্রেন যাত্রায় এই গল্পটা আমার কাছে চলে আসে, অথবা আমি গল্পটার দিকে এগিয়ে যাই৷ ঘোর বর্ষার রাত৷ চারদিকে ঘন মেঘের ডাক৷ বৃষ্টি নামবে নামবে এমন ভাব৷ ট্রেনে সিলেটের পথে হঠাত্‍ একটি পোড় খাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলাম৷ পোড় খাওয়া বলতে কী বোঝায় আমি শিওর না৷ কেননা, গল্প-উপন্যাসে পোড় খাওয়া বলতে সেই লোকদের বোঝায় যাদের অনেক ফ্রন্টে লড়াই করার অভিজ্ঞতা আছে৷ আমার কাছে সিনেমার অভিজ্ঞতাই লোক বিচারের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়৷ বিশেষ করে সেই লোকদের আমার পোড় খাওয়া মনে হয়, যাদের মুখভরা গুটি বসন্তের দাগ৷ মুখে এবং শরীরে মেদ কম৷ চোয়াল মুখের সঙ্গে সেঁটে বসা৷ অাঁতিপাতি করে লোকটার সাথে কথা বলার উপায় খুঁজতে থাকি আমি৷ কিন্তু যা হয়, আধুুনিক দুনিয়া৷ পাশাপাশি বসলেও হঠাত্‍ করে কথা বলা যায় না৷ এই সেই করতে করতে সময় এগিয়ে যায়৷ হঠাত্‍ একটা ক্রসিং-এ অচেনা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়ে৷ জানালার গ্লাস তুলে বাইরের দিকে তাকাই আমি৷ ঝমঝম বৃষ্টির ছাঁট আমাকে ভিজিয়ে দেবার জোগাড়৷ সঙ্গে সঙ্গে গ্লাস নামিয়ে দিলাম৷ আহ কী বর্ষা- ভদ্রলোক মন্তব্য করে বসেন৷ তার পরিতৃপ্তির আনন্দ খেয়াল করে আমি বিস্ময়ে তাকাই৷ তিনি এর একটা ব্যাখ্যা দেবার অবকাশ পান৷ আর তাতেই বুঝি, উনিও আমার সঙ্গে গল্প করার ছুতা খুঁজছিলেন৷ বর্ষা আমার প্রিয়৷ খুব প্রিয়৷ আমি গল্পের ছলে, অনেকটা গল্পেরই ছলে বলি, শীত পছন্দ আমার৷ হাড় কাঁপানো শীতের বাতাস৷ আমারও এককালে পছন্দ ছিল৷ এখন বয়স বেশি, শীত কম বয়সে সয়৷ এই বয়সে আর শীত আর ভালো লাগে না৷ শীত আসলে মরা মুরগীর মতো হযে যাই৷ অ্যাজমার টান শুরু হয়৷ অনেক চিকিত্‍সার পর শেষে ইনহেলারে এসে ঠেকেছি৷ বিধাতা শীত দিয়েছে, কিন্তু শীতের তেজ সহ্য করার আনন্দ আমাকে দেয়নি৷ কী জানি, হয়তো অনেক পাপেরই ফল..৷ তার কন্ঠস্বর ক্রমাগত স্বগোতক্তির পর্যায়ে পেঁৗছালে আর পাঠোদ্ধার করতে পারি না৷ আলাপ চালাবার স্বার্থে বলি, আর বর্ষা? তিনি একটু চমকে ওঠেন৷ কেন চমকান তা বুঝতে আমার দুই ঘন্টা লেগে যায়৷ সে কি এক বসায় বলা সম্ভব ব্রাদার? কী নেই বর্ষায়? বর্ষাই জীবনচক্র৷ প্রজনন ঋতু৷ কত কী৷ কোথায় যাবেন? সিলেট৷ আমিও সিলেটেই যাব৷ রাতে জার্নির সময় ঘুমাবার অভ্যাস আছে? না৷ তবে গল্প চলুক৷ সায় জানিয়ে দুজনেই চুপ করে থাকি৷ পরস্পরকে পরখ করতে থাকি৷ কতটা বিশ্বাস করা যায় সহযাত্রীকে এই মাপামাপি চলতে থাকে৷ গভীর রাতের লেনদেন বড় ভয়ঙ্কর৷ অপরিচিত লোকের সাথে তো দূরের কথা পরিচিতদের সাথেও গভীর রাতে বেশি কথা লেনদেন করতে নাই৷ মধ্যরাত স্বীকারোক্তির সময়৷ এই সময়ে জায়গামতো আঘাত পড়লে ভেতরের গোপন কোটর থেকে বেরিয়ে আসে ঘুম পাড়িয়ে রাখা তথ্যগুলো৷ তাকে অভয় দেবার জন্য আমি একটু এ্যাগ্রেসিভ ভূমিকা নেই৷ তার মনে যে প্রশ্নের উদয় হতে পারে আপনা থেকেই তার উত্তর দিতে শুরু করি৷ সিলেটে আমার এক বোন থাকে৷ অনেক দিন যাওয়া হয় না৷ পত্রিকার অফিসের চাকরি, ছুটিও কম তাই প্রথম সুযোগেই বেরিয়ে পড়েছি৷ একদিন থেকে আমার ফিরতে হবে৷ ইত্যাদি ইত্যাদি৷ সাংবাদিক? হ্যাঁ ওইরকমই৷ সংবাদপত্র নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ চলে৷ উনি ধীরে ধীরে কথা বলার স্বস্তি খুঁজে পান৷ জানালার ধারের সিটে বসার জন্য আমার সঙ্গে আসন বদলিয়ে নেন৷ জানালার গ্লাস তুলে বাইরে তাকান৷ তুমুল বৃষ্টি৷ অন্ধকার৷ তারই মধ্য দিয়ে বৃষ্টির সাদা ছাঁট হালকা-পলকা ট্রেনের আলোর ভেতর দিয়েও আভাস দিচ্ছে৷ সম্ভবত একটা দীর্ঘ ধানের ক্ষেত পার হচ্ছি তখন৷ চারাগুলো কেবল পুরুষ্ট হয়ে উঠছে এমন বিশাল ক্ষেত৷ উনি অর্থাত্‍ মি. আসাদুুল্লাহ জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে হাত ভিজিয়ে ভেতরে আনেন৷ বৃষ্টি এত পছন্দ আপনার? তো কী বললাম আপনাকে? আই অ্যাম মোর দ্যান সিরিয়াস৷ বলতে পারেন এই যে সিলেট যাচ্ছি এর মূল কারণও ওই বৃষ্টি৷ সিলেটে আমার মেয়ে থাকে৷ অবশ্য মেয়ে আর সে নয় আমার৷ তাকে মেয়ে বলা যায় না৷ বিস্ময়কর এই দুনিয়া! অমিয়ভূষণ মজুমদারের নাম শুনেছেন? নবোকভ? এবার আমার বিস্ময়ের পালা৷ এমন কি সম্ভব যে অমিয়ভূষণকে চেনে এমন দুজন একই সঙ্গে ট্রেন যাত্রা করছে এবং দৈবাত্‍ তাদের মধ্যে অমিয়ভূষণ নিয়েই আলোচনা শুরু হয়ে যায়৷ আমিও তাকে চমকে দেবার জন্য বললাম, অমিয়ভূষণের সঙ্গে নভোকভের সম্পর্ক খুঁজতে গেলে তো বিশ্বমিত্তিরের পৃথিবীর কথাই...৷ ইয়েস মাই ব্রাদার৷ সমঝদার পেয়ে তিনি আহ্লাদিত হন৷ বিশ্বমিত্তিরের পৃথিবী নাকি বিশ্বমিত্তিরের টালমাটাল পৃথিবী? ভাবি আমি, কী অসম্ভব এ পৃথিবীতে? আর কোন জিনিসইবা পড়ে আছে মানুষের জানার বাইরে? জটিল কাহিনীর আভাস পেয়ে আমি আর তার ব্যক্তিগত তথ্যের দিকে যাই না৷ তিনি নিজেকে যথাসম্ভব গোপন করতে পারুন এই-ই চাই৷ শুধু বলি, সে-ই! তাকে সময় দেই৷ যতটা সময় লাগে একজন মানুষের হৃদয় খুলে বসতে, ততটা সময় তিনি নেনও৷ মধ্যরাত্রির ট্রেন যাত্রার সুস্বপ্নের মতো তার ব্যক্তিগত কাহিনী কেন এক সহযাত্রীকে তিনি বলে ফেলেন তা আজও আমি বিস্মিত হয়ে ভাবি৷ হয়তো তার গোপন কুটুরিতে আমি দৈবাত্‍ কড়া নেড়ে ফেলেছিলাম অথবা ঘোর বর্ষায় তার গোপন কুটুরির দরজা আলগা হয়ে গিয়েছিল৷ তুমি বয়সে আমার অনেক ছোটই হবে৷ তুমি করেই বলি৷ কী বলো? বলতে শুরু করেন৷ আশপাশের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে৷ জানালা খোলা৷ ঠাণ্ডা বাতাস শিউরে ওঠার মতো বৃষ্টির ছাঁট বয়ে নিয়ে আসছে৷ তুমি অপরিচিত৷ তবু বড় দুর্বল মুহূর্তে তোমার সঙ্গে দেখা হলো৷ অমিয়ভূষণকে জানো, লোলিতা সিনেমা হিসাবে দেখেছ৷ একটা কথা বলি? তোমার কি মনে হয় বিশ্বমিত্তিরের পৃথিবী সম্ভব? কিংবা লোলিতা? নিজের মেয়ের সঙ্গে? ধরো৷ নাহ আমি ভাবতে পারি না৷ আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে৷ আমাকে দেখ৷ হ্যাভ য়ু্য অ্যানি এক্সপেরিয়েন্স অফ ইওর ওন? ইয়েস দ্যাট কাইন্ড অফ৷ উইথ ইওর ওন ডটার? দ্যাট কাইন্ড অফ৷ এমনিই এক বর্ষার বিকাল ছিল৷ ছিল আকাশ জোড়া বজ্র-বিদু্যতের কৌতুক৷ জীবনে তো কিছুই গোছাতে পারিনি৷ যা-ই গোছাতে গিয়েছি আরও এলামেলো হয়ে গেছে৷ ভেবেছি অকৃতদার বলে আমার কাজই ছন্নছাড়া জীবনটাকে আরও অগোছালো করে তোলা৷ বয়স অনেক হলো৷ পঞ্চান্নর এপারে পেঁৗছে ঝাপসা ঝাপসা অপর তীরের দিকে তাকিয়ে আর কিছু দেখতে পাই না৷ জীবনে কিছু লেখাপড়ার অভিজ্ঞতা ছাড়া উজ্জ্বল কিছুই ছিল না৷ বলার মতো একটা ঘটনাও ছিল না৷ সংসার করা হয়নি৷ এমনিই৷ কোনও কারণ ছাড়াই৷ সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেবার পর মোটামুটি স্বচ্ছলতায় দিন চলে যাচ্ছে৷ অ্যাজমা ছাড়া আর কোনও উপদ্রব নেই শরীরে৷ ডায়াবেটিস নেই, প্রেসার নরমাল৷ ব্যায়াম করি, সকাল-বিকাল হাঁটি৷ ব্যস৷ মাঝে মাঝে একটা নিরাপত্তাহীনতা পেয়ে বসে না, এমন নয়৷ যখন চলাফেরার অবস্থা থাকবে না তখনকার কথা ভেবে ভয় হয়৷ মৃতু্য হয়তো নিকটবর্তী৷ যদি এই বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকো তবে বুঝবে৷ এই বয়সে স্ত্রী, সম্পদ, ভোগের চেয়ে সন্তানের কামনা অনেক বড় হয়ে ওঠে৷ অবিবাহিতের সন্তান থাকবার সম্ভাবনা নাই৷ তবু সে আকাঙ্ক্ষাই ক্রমে বেড়ে যেতে থাকলো৷ নিকটাত্মীয়দের সকলেই দেশের বাইরে৷ তাদের কারও সন্তানকে নিজের বলে দত্তক নেব সে উপায় নেই৷ একটা বিকল্পই ছিল, কানাডা বা স্টেটস-এ চলে যাওয়া৷ ভাইয়ের ছেলেদের কাছে কাটিয়ে দিতে পারি বাকীটা সময়৷ কিন্তু ভেতর থেকে সায় আসে না৷ দেখিই না কী হয়, করতে করতে সময় কেটে যায়৷ হঠাত্‍ এমনি এক বর্ষার দিনে মাথায় একটা আইডিয়া খেলে যায়৷ নিকট বন্ধুদের একজনের তিন কন্যা৷ একজনের এক পুত্র৷ এক পুত্রের দিকে তাকিয়ে লাভ নেই৷ তাই তিন কন্যার পিতার দারস্থ হলাম৷ আমার কথা শুনে বন্ধু এবং বন্ধুর বউ হেসে খুন৷ বলে, এই শেষকালে তোর বাবা হওয়ার শখ হলো? ধর তোকে আঙ্কল না ডেকে বাবাই ডাকলো তাতেই কি সন্তানের সাধ মিটবে? আমি গোঁ ধরে বসে থাকলাম৷ পিতৃত্ব অধিকারের ব্যাপার৷ আমি চাই না তোদের মেয়ে আজ থেকেই আমাকে বাবা ডাকুক৷ আমার ঘর দেখা-শোনা করে আমাকে উদ্ধার করুক৷ বরং তোদের একটি মেয়ের পড়াশোনা কি হাত খরচ আমাকে চালাতে দাও৷ তোমার ঘরেই থাকুক সে৷ আমাকে আঙ্কল ডাকলেও ক্ষতি নেই৷ কিন্তু সে এই মেসেজটা বহন করতে শিখুুক যে তোমাদের পাশাপাশি আমার প্রতিও তার কিছু দায়িত্ব আছে৷ ব্যস৷ সহজ শর্ত৷ বন্ধু খানিকটা করুণায়, খানিকটা সহমর্মিতায় রাজি হলো৷ তিন মেয়েকে ডাকার পর এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো৷ মেয়েরা প্রস্তাব শুনে চুপ৷ বাবা-মার দিকে সন্দেহের দিকে তাকাচ্ছে৷ এই অবস্থায় আমার কান্না পেতে শুরু করলো৷ একটা অসহায়ত্ব পেয়ে বসলো৷ বেশিক্ষণ বসে থাকতে না পেরে উঠে আসলাম৷ কান্নার বেগ দমাতে না পেরে হু হু করে কেঁদে ফেললাম৷ রাতে বর্ষার ফোন৷ বন্ধুর কনিষ্ঠ মেয়ে৷ আমি যে বাষ্পরুদ্ধ হয়ে ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম তা নিয়ে সমবেদনা জানাতেই৷ আঙ্কল তুমি যদি ভাবতে চাও তো আজ থেকেই আমি তোমার মেয়ে৷ কিন্তু একটা শর্ত৷ এখনই তোমাকে বাবা ডাকতে পারবো না৷ কেন? হঠাত্‍ আসবে না৷ যেদিন মনে হবে তোমাকে বাবা ডাকা যায় সেদিনই ডাকবো৷ হৃদয় আমার প্রশান্তিতে ভরে যায়৷ জানতাম না বাবা হতে হলে কী করতে হয়৷ সংসারে একটা মেয়ের কী ভূমিকা৷ কিছুই জানতাম না৷ বায়োলজিক্যালি একজন ফাদার বলতে কী বোঝায় আমি এখনও জানি না৷ জানতে পারিনি৷ তবু জানার চেষ্টা করে গিয়েছি৷ দিনের পর দিন ওদের বাসায় গিয়ে পড়ে থেকেছি, আড্ডা দিয়েছি, ঘুমিয়েছি৷ বন্ধু বলতো এখনও বল, তোর যদি বিয়ে করে সন্তান পালনের সখ থাকে তবে তোর বিয়ের ব্যবস্থাই করি৷ চাইলে সন্তানসহ কোন ডিভোর্সি পাত্রীও দেখতে পারি৷ ওর মজা করার ব্যাপারগুলো আমি পাত্তা দিতাম না৷ আই ওয়ান্টেড টু প্রুফ মি অ্যাজ আ ইডিওজিক্যাল ফাদার৷ আই কেয়ারড ফর দ্য ফ্যামিলি, দ্য গার্ল৷ একজন ফ্যামিলি মেম্বারের মতোই থাকতাম৷ মেয়েরা দেরিতে ফিরলে ওদের বাবা-মা'র মতোই রাগ করতাম৷ টেনশনে মরে যেতাম৷ তবু দুই বছরেও বর্ষা আমাকে বাবা ডাকেনি৷ রাগ করলে বাবা-মা'র বুকে যেভাবে লাফিয়ে পড়ে সেভাবে লাফিয়েও পড়েনি৷ আমার সঙ্গেও অভিমান করতো, ভালোবাসতো, রাগ-আবদার করতো- কিন্তু খানিকটা দূরে থেকে৷ বর্ষার বাবা ততোটা স্বচ্ছল ছিল না৷ তাই ওর লেখাপড়ার খরচপত্রের ভার সানন্দে আমিই নিয়ে নিলাম৷ বর্ষার ব্যাপারটা তুই আমার ওপর ছেড়ে দে৷ অন্য দুইটা মেয়েকে তুই ভালভাবে গড়ে তোল৷ আমারই চেষ্টায় বর্ষা শাহজালাল ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেল৷ ভর্তি করালাম৷ মাসের প্রথমে ব্যাংকে করে টাকা পাঠাই, নিয়ম করে মোবাইলে খোঁজ নেই৷ ঈদে-ছুটিতে এলে আমার কাজকর্ম আর থাকে না৷ ওকে নিয়ে ঘুরতে বের হওয়া৷ এটা সেটা প্রয়োজনীয় জিনিশ-পত্র কিনে দেয়া৷ কত কী? মেয়েরা যে খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে ভীষণ কেয়ারফুল এটা বুঝতে পারি৷ ও ফিরে গেলে আবার জীবন একঘেয়ে হয়ে পড়ে৷ মৃতু্যভয় তাড়া করে৷ একা থাকলেই জোরে চিত্‍কার করতে ইচ্ছা করে৷ ফিরে যাই ওর বাবার কাছে৷ কাছে আফসোস করি, মেয়ে আমাকে আজও বাবা ডাকলো না৷ বন্ধু হাসে৷ বলে, এটা পুরোপুরি একটা বায়োলজিক্যাল ব্যাপার৷ সিনেমায় যেমন দেখানো হয় তেমন নয়৷ ইটস ভেরি টাফ টু ট্রিট আ ম্যান অ্যাজ ফাদার, হু ইজ নট দ্যাট৷ যদি ও অঝুঝ থাকতো, যদি আর্লি স্টেজ থেকে তোকেই বাবা বলে জানতো তবে হয়তো সম্ভব হতো৷ আমি তো তোকে নিষেধই করেছিলাম৷ এতদিন পর আমাকে দোষ দিস না৷ তোর ডিভোশন তো দেখছি, ইন অল ফ্যাক্ট আমি ওর আসল বাবা হয়েও চাই জীবনে একবার যেন তোকে বাবা বলে ডাকে ও৷ ওর বাবার চাওয়া পূর্ণ হয়েছিল৷ সে বাবা বলেছিল আমকে৷ পলিটিক্যাল গ্যাঞ্জামে সায়নেডাই হলে ওকে নিতে এসেছিলাম৷ থার্ড ইয়ারে তখন৷ রাতে পেঁৗছে দেখি ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় দাঁড়ানো৷ পুলিশ গিজগিজ করছে চারদিকে৷ বর্ষা দিব্যি একটা ছেলের পাহারায় দাঁড়িয়ে৷ আমাকে দেখে ছেলেটাকে টানতে টানতে নিয়ে এলো৷ বললো, এসো পরিচয় করিয়ে দি, আমার বাবা৷ আর ও হলো সুমন৷ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড৷ ফিরতে ফিরতে শুধুই ভাবছিলাম, হোয়ট দ্য ওয়ার্ড মিন, বেস্ট ফ্রেন্ড? আর য়ু্য ইন লাভ উইথ দ্য বয়, সুমন? অনেক ভেবে জিজ্ঞাসা করলাম৷ অন্য বাবাদের কী অনুভূতি আমি জানি না৷ আমার রীতিমতো সুমনের প্রতি ঈর্ষা জন্মাতে শুরু করলো৷ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বর্ষা চুপ করে গেল৷ বহু সময় চুপ থাকার পর আবার মুখ খুললাম, ডু য়ু্য ওয়ান্ট টু মেরি হিম? এটা কেমন কথা আঙ্কল, ভালোবাসলেই বিয়ে করতে হবে? দেন ইটস সাম কাইন্ড অব ফ্রেন্ডশিপ? এমভাবে কথা বলছো যেন তুমি আমার বাবা বা আঙ্কল নও৷ যেন.. যেন কী? যেন তুমি আমার প্রেমিক? হোয়াট! আমার পৃথিবী নড়তে শুরু করলো৷ কাঁপতে থাকলো ক্রমাগত৷ নিজের বাবা হলে হয়তো সঙ্গে সঙ্গে চড় কষাতে পারতাম৷ কিন্তু তাও পারলাম না৷ কাঁপতে থাকা পৃথিবী আর দুলতে থাকা ট্রেনের সাথে সাথে নিশ্চুপ থেকে শহরে ফিরলাম৷ ওকে বাসায় পোঁছে দিয়ে ঘরে ফিরলাম৷ দুইদিন গুম হয়ে, নিজের জীবনচিত্রের হাস্যকর অবস্থার দিকে তাকিয়ে হাসলাম৷ বর্ষর্ার বাবা ফোন করলো, বললাম, একটু ব্যস্ত আছি, এখনই যেতে পারছি না৷ তৃতীয় দিনে বর্ষা এলো৷ শাড়ি পরে৷ সেজে৷ হোয়াটস দিস আঙ্কল? হোয়াট ডিড ইট মিন৷ আঅ্যাম নট অ্যাজ ম্যাচিউরড অ্যাজ য়ু্য আর৷ য়ু্য সুড নট রিঅ্যাক্ট অ্যাজ সাচ৷ সুমনকে দেখে তুমি কেমন করে তাকিয়েছিলে মনে আছে? ইউ ওয়্যার জেলাস৷ আমি তো মিথ্যা বলিনি৷ তুমি তো আমাকে একটা চড় মেরে ভুল ধরিয়ে দিতে পারতে৷ কিন্তু সিন ক্রিয়েট করছো কেন? ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে থাকলো সে৷ আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম৷ সে ঠিক যেমন করে বাবার কোলে লাফিয়ে পড়ে তেমনি করে লাফিয়ে পড়লো আমার বাহুবন্ধনে৷ ওই প্রথম৷ আমি কী করবো? আমার কী করা উচিত? যদি তোমার কাছে সত্য বলি তো,আই সুড কনফেস, আই ফেল্ট হার বডি৷ ব্যাপারটাকে এড়াতেই আমি ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে দূরে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করি৷ ওতেও ভারসাম্যের সমস্যা হয়ে যায়৷ কপালে চুমু খাওয়া বলতে কী বোঝায়? স্নেহ? কিন্তু, বর্ষা আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়৷ আলতো করে আমার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়েই সরে যায়৷ ওই মুহূূর্তেই আমি বুঝে যাই আমি ওর বাবা হতে ব্যর্থ হয়েছি৷ কোথাও সূক্ষ্ম করে পেতে রাখা জালে আটকা পড়ে গিয়েছি৷ আমরা সীমারেখা ছিন্ন করেছি৷ বর্ষা চোখ নাচাতে থাকে৷ আমি বলেছিলাম না? কী বলেছিলি? বর্ষা ঠোঁট ওল্টায়৷ কিছুই বলে না৷ বিশ্বমিত্তিরের টালমাটাল পৃথিবী সামলাতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়৷ অভিনয় করে, আর যতটা সম্ভব এড়িয়ে এড়িয়েই থাকি৷ ভার্সিটি খোলার পর ও চলে গেলে হাফ ছেড়ে বাঁচি৷ এবার ফোনে যে বর্ষা কথা বলে সে আর আগের বর্ষা নয়৷ বদলে গেছে৷ এতদিনে আমার ওপর দাবি নিয়ে কথা বলে৷ আব্দার করে৷ চেঞ্জটা ধরা পড়ে সহসাই৷ হঠাত্‍ একদিন বলে, সিলেটে আসো৷ কেন? তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করছে৷ কীসের টানে, কেন জানি না ওর বাবা-মা'র কাছে গোপন করে আমি সিলেট যাই৷ বন্ধুদের কাছে এবার সিরিয়াসলি বাবা বলে পরিচয় করায়৷ জাফলং যাওয়া হয় একদিন৷ আবার নিজ দায়িত্বে আমাকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়৷ আমি ফিরে আসি৷ প্রতি মুহূর্তে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকি৷ বর্ষার পরবতর্ী নির্দেষের অপেক্ষায়৷ একে কি প্রেম বলে? আমার বয়স আর প্রেমের নয়৷ আর কেনইবা আমাকে সে পছন্দ করবে৷ একে কি পিতা-সন্তান সম্পর্ক বলে? এইটুকু বুঝি, সে আর হবার নয়৷ তবু ওর প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ কাজ করে৷ তুমি হয়তো যৌনতার কথাও ভাববে৷ সবই বললাম, এও বলি চুমুর বেশি এগোবার বয়স আমার নেই৷ এবার? আজ ওর জন্মদিন৷ সারপ্রাইজ দিতে চললেন? অনেকটাই৷ ও ভেবেছে আমি ভুলে গেছি৷ সকালে যখন দেখবে... মি. আসাদুজ্জামান সম্বিত ফিরে পাওয়ার ভঙ্গিতে চুপ করেন৷ যেন ভুলে একটা কথা বলে ফেলে পস্তাচ্ছেন৷ চোখ বন্ধ করে থাকেন কিছুক্ষণ৷ আমি আমার ক্ষুদ্র জীবন অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারি তার আরও কিছু বলার আছে৷ সে কথাটি না বললে তার পুরো গল্পটাই একটা জৈবিক তাড়নার দ্যোতনা পায়৷ সত্যি বলতে কি জানো, ওইটুকু যৌনতার কারণেই আমার দায়িত্বশীলতা হাজারগুণ বেড়ে গেছে৷ এখন আমি ওকে বিয়ে দেবার কথা ভাবি৷ এমনকি সুমনের মতো পুচকে ছোড়াকেও মেনে নিতে সায় পাই মন থেকে৷ দেন আঅ্যাম বিকামিং আ ফাদার অ্যাট লাস্ট, অ্যাম আই? রাতে না ঘুমাবার ক্লান্তি আমাকে বিমনা করে দেয়৷ আমি মনে মনে কিংবা শব্দ করে বলি, মে বি৷ ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ি৷ ভোরে ঘুম ভাঙে, ট্রেন সিলেট স্টেশনে দাঁড়ানো৷ পাশে মি. আসাদুজ্জমান নেই৷ জানালার বাইরে তাকালাম৷ ঝমঝম বৃষ্টি নেমেছে৷ তাকে খুুঁজে দেখার চেয়ে জানালা বন্ধ করে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করা ভাল৷ আর গল্পটা শোনার পর আমার নৈতিক দায়িত্ব হয়ে পড়ে তাকে হারিয়ে ফেলার চেষ্টা করা৷ আমি তাকে চিরতরেই হারিয়ে ফেলি৷#

2 comments:

Anonymous said...

আপনার গল্পটা পড়ি নাই। এতো বড় পোস্ট করার সময় পান কই? কাম কাজ নাই আপনার?

mahbub morshed said...

eta convertorer sahajje post korechi. kam kaj ache. tai convertor use kori.